৫ আগস্ট ২০২৬, ৬:৩১ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

মানুষ কি স্বাধীন নাকি তকদিরের অধীন

ভাগ্যের লিখন যাকে বলে ‘তকদির’, তা নিয়ে মানুষের ভাবনা বহু প্রাচীন—জীবনের প্রতিটি ঘটনা কি আগে থেকেই নির্ধারিত, নাকি আমাদের সিদ্ধান্ত ও কাজের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা আছে? যদি সবকিছু আগে থেকেই ঠিক করা থাকে, তবে ভালো বা মন্দ কাজের জন্য মানুষকে কেন দায়ী করা হবে?ভাগ্যে বিশ্বাস কি মানুষকে অলস ও কর্মবিমুখ করে তোলে, নাকি তা তাকে নিশ্চিন্ত মনে কাজ করে যাওয়ার প্রেরণা দেয়?ইসলামি চিন্তাধারায় ভাগ্যের বিষয়টি মোটেও জটিল বা হতাশাজনক নয়। মুসলিম মনীষীগণ দেখিয়েছেন যে মূল সমস্যা ভাগ্যে বিশ্বাস করায় নয়; বরং আল্লাহর সার্বিক জ্ঞান আর মানুষের নৈতিক স্বাধীনতার সম্পর্কটি সঠিকভাবে অনুধাবন করতে না পারায়।তকদিরকে যদি দায়িত্ব এড়ানোর অজুহাত বানানো হয়, কিংবা মানুষকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ভেবে আল্লাহর সর্বব্যাপী অভিপ্রায়কে অস্বীকার করা হয়—তখনই নানা বিভ্রান্তির জন্ম হয়।.যে কাজের ওপর বেহেশতের পুরস্কার বা বা দোজখের শাস্তি নির্ভর করে, তা কখনো অন্ধ বাধ্যবাধকতা হতে পারে না; তা হতে হয় মানুষের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত।.কোরআনে আল্লাহ–তাআলা ঘোষণা করেন, “আমি জিন ও মানুষকে শুধু আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।” (সুরা জারিয়াত, আয়াত: ৫৬)এই আয়াতের অর্থ এটি নয় যে মানুষকে জোর করে ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। কারণ, যে কাজের ওপর বেহেশতের পুরস্কার বা বা দোজখের শাস্তি নির্ভর করে, তা কখনো অন্ধ বাধ্যবাধকতা হতে পারে না; তা হতে হয় মানুষের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত।.‘তকদির পরিবর্তন হয় না’—একটি ভুল ধারণা.আলী (রা.) এই আয়াতের একটি চমৎকার অর্থ তুলে ধরে বলেছেন, “আয়াতের মূল কথা হলো, ‘আমি মানুষকে আমার ইবাদতের নির্দেশ দিতে এবং সেদিকে আহ্বান জানাতেই সৃষ্টি করেছি।’” (আহমদ ইবনে মুহাম্মদ আল-সালাবি, আল-কাশফু ওয়াল বায়ান আন তাফসিরিল কোরআন, ৯/১১২, দারু ইহইয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত, ২০০২)ফেরেশতাদের মতো মানুষকে এমনভাবে সৃষ্টি করা হয়নি যে তারা সবসময় বাধ্যগত আনুগত্য করবে। বরং মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাওয়ার জন্য, যেখানে কাজের ভালো-মন্দ নির্ধারণের জন্য তাকে দেওয়া হয়েছে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা।.ইসলামি দর্শনে আল্লাহর ইচ্ছাকে দুটি সহজ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়। প্রথমটি হলো বিশ্বজগতের প্রাকৃতিক নিয়ম, যেখানে মানুষের কোনো হাত নেই। যেমন, মানুষ কখন ও কোথায় জন্ম নেবে, তার রূপ-রং কেমন হবে, সে কখন অসুস্থ হবে বা মারা যাবে—এগুলো পুরোপুরি আল্লাহর জাগতিক নিয়মের অধীন।.অনেকের প্রশ্ন, আল্লাহ যদি আগে থেকেই জানেন আমি ভবিষ্যতে কী করব, তাহলে তো আমার কিছু করার নাই। এর উত্তরে বলা যায়, কোনো কিছু ‘আগে থেকে জানা’ আর কাউকে ‘সেই কাজ করতে বাধ্য করা’—দুটি এক বিষয় নয়।.দ্বিতীয়টি হলো জীবনযাপনের নৈতিক নিয়ম বা শরিয়ত। এই জায়গায় মানুষকে ভালো ও মন্দ বেছে নেওয়ার স্পষ্ট সুযোগ দেওয়া হয়েছে। মানুষ নিজের ইচ্ছায় ভালো কাজ করতে পারে, আবার মন্দ পথও বেছে নিতে পারে।নির্জীব বস্তু বা পশুপাখির মতো অবশ বা স্বাধীনতাহীন নয় মানুষের জীবন; বরং তার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত রয়েছে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতায়। আর এই স্বাধীনতা আছে বলেই মানুষ তার কাজের জন্য প্রশংসিত বা নিন্দিত হয় এবং পরকালে পুরস্কার বা শাস্তির মুখোমুখি হয়।.অনেকের প্রশ্ন, আল্লাহ যদি আগে থেকেই জানেন আমি ভবিষ্যতে কী করব, তাহলে তো আমার কিছু করার নাই। এর উত্তরে বলা যায়, কোনো কিছু ‘আগে থেকে জানা’ আর কাউকে ‘সেই কাজ করতে বাধ্য করা’—দুটি এক বিষয় নয়।আল্লাহ জানেন মানুষ নিজের ইচ্ছায় ভবিষ্যতে কী বেছে নেবে, কিন্তু এই জানার কারণে মানুষের ওপর কোনো জোর-জবরদস্তি তৈরি হয় না।.কর্মের ফল বনাম তকদির বা ভাগ্য.আল্লামা ইবনে আশুর লিখেছেন যে মানুষ কাজ করার আগেও আল্লাহ তা জানেন, আবার সম্পাদনকালেও তা পরিবেষ্টন করে রাখেন (সুরা মুহাম্মদ, আয়াত: ৩০)। কিন্তু এই জানার অর্থ এই নয় যে আল্লাহ মানুষকে কোনো কাজ করতে বাধ্য করছেন।তিনি লিখেছেন, “এই আয়াতের মাধ্যমে পরিষ্কার হয় যে আদেশ-নিষেধ দেওয়ার একটি মূল প্রজ্ঞা হলো মানুষের আচরণের ওপর আল্লাহর সর্বব্যাপী জ্ঞানের প্রকাশ ঘটা এবং মানুষের সামনে সত্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা।” (ইবনে আশুর, আত-তাহরির ওয়াত-তানভির, ২৬/১২৩, আদ-দারুত তিউনিসিয়্যাতু লিন-নাশর, তিউনিস, ১৯৮৪)সহজ কথায়, আল্লাহর জ্ঞান হলো আলোর মতো, যা ঘটনাকে উন্মোচিত করে; কিন্তু তা মানুষকে জোর করে কোনো কাজ করায় না।.ভাগ্যের অজুহাতে কাজ ছেড়ে দেওয়ার মানসিকতাকে একদম গোড়াতেই শুধরে দিয়েছেন মহানবী (সা.)। সাহাবিরা যখন জিজ্ঞেস করেছিলেন, “সবকিছু যদি লেখা হয়েই থাকে, তবে আমরা কি কাজ ছেড়ে দিয়ে ভাগ্যের ওপর ভরসা করে বসে থাকব না?”মহানবী (সা.) স্পষ্ট উত্তর দিয়েছিলেন, “না, বরং কাজ করে যাও; কারণ যাকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার জন্য সেই পথ সহজ করে দেওয়া হয়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৯৪৭).পথ সুগম করে দেওয়া আর বাধ্য করা এক জিনিস নয়। মানুষ নিজের পছন্দ ও স্বাধীন ইচ্ছায় কাজ করে বলেই সে সওয়াব বা শাস্তির যোগ্য হয়।.ইমাম রাজি এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, মহানবী (সা.) একদিকে যেমন আল্লাহর সিদ্ধান্তের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন, তেমনি অন্যদিকে মানুষকে কাজ করার তাগিদ দিয়েছেন। এখানে ‘সহজ করে দেওয়া’ মানে জোর করা নয়; বরং মানুষ যে ভালো বা মন্দ পথ বেছে নেওয়ার চেষ্টা করে, আল্লাহ তার জন্য সেই পথকেই সুগম করে দেন। (ফখরুদ্দিন আল-রাজি, মাফাতিহুল গাইব, ৩১/১৮৫, দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত)ইমাম ইবনে বাত্তাল বলেছেন, রাসুলের এই বাণী মূলত তাদের ভুল প্রমাণ করে যারা মনে করে মানুষ নিজের ইচ্ছাহীন পুতুলমাত্র। কারণ পথ সুগম করে দেওয়া আর বাধ্য করা এক জিনিস নয়। মানুষ নিজের পছন্দ ও স্বাধীন ইচ্ছায় কাজ করে বলেই সে সওয়াব বা শাস্তির যোগ্য হয়। (আলি ইবনে খালাফ ইবনে বাত্তাল, শারহু সহিহিল বুখারি, ১০/৩০৩, মিসবাহুর রুশদ, রিয়াদ, ২০০৩)পরিশেষ বলা যায়, তকদির মানুষের হাত-পা বেঁধে দেওয়ার কোনো ধারণা নয়। ভাগ্যে বিশ্বাস মানুষকে সফল হলে অহংকারী হতে দেয় না, আবার ব্যর্থ হলে হতাশায় ভেঙে পড়তেও দেয় না। মানুষ জানে, চেষ্টা করা তার নিজের নৈতিক দায়িত্ব, আর তার পরিণাম আল্লাহর প্রজ্ঞার ওপর নির্ভরশীল।.মুসলিম জীবনে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের ৯ উপায়

Source: https://www.prothomalo.com/religion/islam/hqi32yb8n8

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রোগের সংক্রমণে মৃত্যু হলে দায় কার?

১

টি–টুয়েন্টিতে ২০০ উইকেটের চূড়ায় রশিদই প্রথম

২

মেঘনায় গুলিবিদ্ধ জেলের মৃত্যু : ২৪ ঘণ্টা পরও মামলা হয়নি, থানায় পুলিশের জিডি

৩

শিশুর মানসিক বিকাশ: অভিভাবকদের করণীয় ও পরামর্শ

৪

মনিপুর উচ্চবিদ্যালয়ে বাংলা ও ইংলিশ ভার্সনে নার্সারি–নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী ভর্তি

৫

হরমুজ প্রণালিতে মাইন বিস্ফোরণে চার তেলবাহী জাহাজে আগুন

৬

বাংলাদেশের আকাশে এক টুকরা কাঞ্চনজঙ্ঘা

৭

টুথপেস্ট আবিষ্কারের আগে মানুষ যেসব বিচিত্র জিনিস দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করত

৮

ক্ষমতা হারানোর ভয়েই কি আরব দলগুলোর ওপর আক্রমণ বাড়িয়েছেন নেতানিয়াহু

৯

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে বড় নিয়োগ হচ্ছে

১০

গায়ে পা লাগলে ‘সালাম’ করা: প্রথা নাকি বিধান

১১

রাজধানীর গুলশান থানা এলাকায় জমজমাট জুয়ার আসর ?

১২

জাপানে চার দিনের সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী

১৩

হানিফসহ চার আসামির অপরাধ কী, মৃত্যুদণ্ড ছাড়াও তাঁরা কী কী সাজা পেলেন

১৪

নারীর ক্ষমতায়নে ধর্মের অপব্যাখ্যা ও পুরুষতন্ত্র এখনো বড় চ্যালেঞ্জ: জহির উদ্দিন স্বপন

১৫

বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে রহস্য

১৬

নিহত ছাত্রদল নেতার বাড়িতে গিয়ে বিচারের আশ্বাস দিলেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী

১৭

হোগলাবুনিয়া থেকে তাসভির…

১৮

রং, নকশা, বুননে প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম

১৯

নেতানিয়াহুর জোট ছেড়ে বিরোধী জোটে যেতে আগ্রহী ইউটিজে

২০