৮ আগস্ট ২০২৬, ৭:৩১ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

চিতল মাছ কি সত্যিই জীবন্ত জীবাশ্ম

চিতল মাছের শরীরের গঠন কি সত্যিই কোটি কোটি বছর ধরে একই রকম রয়ে গেছে? ডাইনোসরদের আমলে এটি যেমন ছিল, আজও কি তা প্রায় তেমনই আছে? মাছের বাজারে বরফের ওপর রাখা চিতল মাছের দিকে তাকালে অনেকের মাথায় এ প্রশ্নটি আসে। মাছটির মাথার দিকটা মোটা। অন্যদিকে লেজের দিকটি পাতলা হতে হতে প্রায় স্বচ্ছ হয়ে গেছে। এর গায়ে রয়েছে গোল গোল কালচে দাগ। শরীরের এই বিশেষ আকৃতিটি যেন কোনো পুরোনো নকশার ছাপ বহন করছে। এখান থেকেই একটি ধারণার জন্ম হয়েছে, চিতল মাছ একটি জীবন্ত জীবাশ্ম!‘জীবন্ত জীবাশ্ম’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করা হয় ১৮৫৯ সালে। প্লাটিপাস ও লাংফিশের মতো প্রাণীদের বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছিল শব্দটি। এর মানে এমন প্রজাতি, যাদের শরীরে বহু পুরোনো বৈশিষ্ট্য টিকে আছে বলে মনে হয়। পরে সাধারণ বিজ্ঞানে শব্দটি বেশ ঢালাওভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে।এই জীবন্ত জীবাশ্মের তালিকায় সবচেয়ে বিখ্যাত নাম ল্যাটিমেরিয়া বা সিলাক্যান্থ মাছ। ১৯৩৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে এটি জ্যান্ত ধরা পড়ে। এর আগে বিজ্ঞানীরা জানতেন, প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর আগেই মাছটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তবে সেই সিলাক্যান্থ নিয়ে সাম্প্রতিক একটি গবেষণা বেশ অবাক করা তথ্য দিয়েছে। মাছটির বাইরের শারীরিক গঠন প্রায় একই রকম থাকলেও এর খুলির হাড়ের পরিবর্তন হয়েছে। অর্থাৎ যাকে অপরিবর্তিত বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল, তার ভেতরেও হয়েছে পরিবর্তন। বিষয়টি শুধু বাইরে থেকে চোখে পড়েনি।.কই মাছ পানি ছাড়াও অনেক সময় বেঁচে থাকে কীভাবে.১৯৩৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে ল্যাটিমেরিয়া বা সিলাক্যান্থ মাছটি জ্যান্ত ধরা পড়ে। এর আগে বিজ্ঞানীরা জানতেন, প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর আগেই মাছটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।.চিতল মাছের ক্ষেত্রে গল্পটি আরও একটু জটিল। বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী চিতল মাছ নোটোপ্টেরিডি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এই পরিবারটি একটি বিশাল ও প্রাচীন গোত্রের অংশ, যার নাম অস্টিওগ্লোসোমরফা। বাংলায় একে অস্থি-জিহ্বা মাছের গোত্র বলা যায়। এই প্রাচীন গোত্রের মাছগুলোর জিহ্বায় দাঁত থাকে, যা দিয়ে এরা শিকার ধরে। এটি এদের একটি অন্যতম আদিম বৈশিষ্ট্য।এই গোত্রের ফসিলের রেকর্ড সত্যিই বেশ পুরোনো। এটি আর্লি ক্রিটেশিয়াস যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত, যা মোটামুটি ১১ থেকে ১৩ কোটি বছর আগের। আফ্রিকায় একটি মাছের জীবাশ্ম প্রজাতি পাওয়া গেছে, যার নাম প্যালিওনোটোপ্টেরাস গ্রিনউডি। একে নাইফফিশ বা চিতলজাতীয় মাছের সবচেয়ে পুরোনো ও প্রামাণ্য পূর্বপুরুষদের একটি বলে ধরা হয়। ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি জিনোমিক গবেষণায় আফ্রিকা ও এশিয়ার নাইফফিশগুলোর ডিএনএ তুলনা করা হয়েছে। সেখানে দেখানো হয়েছে, এদের পূর্বপুরুষেরা লেট ক্রিটেশিয়াস যুগে, অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৬ থেকে ১০ কোটি ৪০ লাখ বছর আগের কোনো একসময় আলাদা পথে পরিবর্তিত হয়েছিল। ডাইনোসরেরা তখনো পৃথিবীতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।.লইট্যা মাছ কেন মাথা উঁচু করে সাঁতার কাটে.আফ্রিকায় একটি মাছের জীবাশ্ম প্রজাতি পাওয়া গেছে, যার নাম প্যালিওনোটোপ্টেরাস গ্রিনউডি। এটিকে নাইফফিশ বা চিতলজাতীয় মাছের সবচেয়ে পুরোনো ও প্রামাণ্য পূর্বপুরুষদের একটি বলে ধরা হয়।.তবে কোনো বংশধারা পুরোনো হওয়া আর একটি নির্দিষ্ট প্রজাতি পুরোনো হওয়া মোটেও এক কথা নয়। নোটোপ্টেরিডি পরিবারটি ক্রিটেশিয়াস যুগ থেকে চলে আসছে ঠিকই, কিন্তু আজকের চিতল প্রজাতিটি নিজে সেই প্রাচীন সময়ের অবশিষ্টাংশ নয়। এটি বহু প্রজন্মের ছাঁকনি পেরিয়ে আজকের রূপ পেয়েছে। স্বয়ং ‘চিতালা’ গণের ভেতরের প্রজাতিভেদ নিয়েই বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো নানা মতভেদ আছে। মালয়েশিয়ায় করা শ্রেণিবিন্যাসের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এই গণের প্রজাতি শনাক্তকরণের বিষয়টি এখনো পুরোপুরি মীমাংসিত নয়। আবার ‘চিতালা লোপিস’ নামে একটি প্রজাতির মাছকে ১৮৫১ সালের পর আর কখনো দেখা যায়নি বলে বিলুপ্ত ধরে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে এটিকে আবারও খুঁজে পাওয়া গেছে।.যে গোষ্ঠীকে জীবন্ত জীবাশ্ম তকমা দিয়ে থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তার ভেতরেই রয়েছে এত রকমফের ও অনিশ্চয়তা! আফ্রিকার একটি ছোট মাছ প্যান্টোডন বুখহোলজি। সেটিও অস্টিওগ্লোসোমরফা গোত্রেরই সদস্য। এই মাছটি নিয়ে করা একটি গবেষণা পুরো বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে। গবেষকেরা মেপে দেখিয়েছেন, এই মাছের শারীরিক গঠন সত্যিই লাখ লাখ বছর ধরে প্রায় অপরিবর্তিত থেকে গেছে। কিন্তু এখানে পদ্ধতিগত বিষয়টিতে জোর দেওয়া প্রয়োজন। বিজ্ঞানীরা এখন শুধু কোনো মাছের চেহারা দেখেই সেটিকে প্রাচীন বলে তকমা লাগিয়ে দেন না। মাছের হাড়ের গঠন মাপা হয়, জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয় এবং একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ধরে তুলনা করা হয়। জীবন্ত জীবাশ্ম ধারণাটিই এখন একটি বিতর্কিত পরিভাষা। প্রতিটি জীবন্ত প্রাণীই তার নিজ নিজ সময়ের সমান বয়সী। শুধু কোনো কোনো প্রাণী তার আদিম বৈশিষ্ট্যের পুরোনো রূপটি ধরে রেখেছে মাত্র!.কিছু ছোট মাছ কেন কখনো বড় হয় না.নোটোপ্টেরিডি পরিবারটি ক্রিটেশিয়াস যুগ থেকে চলে আসছে ঠিকই, কিন্তু আজকের চিতল প্রজাতিটি নিজে সেই প্রাচীন সময়ের অবশিষ্টাংশ নয়। এটি বহু প্রজন্মের ছাঁকনি পেরিয়ে আজকের রূপ পেয়েছে।.ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা বা মেঘনার ঘোলা জলে যে চিতল মাছটি এখন ডুবসাঁতার কাটছে, তার পূর্বপুরুষেরা সত্যিই ডাইনোসরের যুগে পৃথিবীর জলে সাঁতার কেটেছে, এ কথাটি একেবারে ঠিক। কিন্তু আজকের চিতল মাছটি সেই পুরোনো পূর্বপুরুষের হুবহু প্রতিলিপি নয়। বরং এটি লাখ লাখ বছরের প্রাকৃতিক বাছাই ও বদলের ছাঁকনি পেরিয়ে আসা সম্পূর্ণ নতুন একটি সংস্করণ। শুধু এগুলোর গায়ে পূর্বপুরুষের পুরোনো নকশার একটি ছায়া রয়ে গেছে।এই বৈজ্ঞানিক বিতর্কের একটি রূঢ় ও দৈনন্দিন দিকও রয়েছে। প্রকৃতি সংরক্ষণের বৈশ্বিক জোট আইইউসিএনের হিসাব অনুযায়ী, চিতল মাছ এখন একটি নিয়ার প্রায়-বিপন্ন প্রজাতি। অর্থাৎ এরা পুরোপুরি বিলুপ্তির কাছাকাছি না হলেও বেশ ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে বাংলাদেশের আইইউসিএন লাল তালিকা অনুযায়ী, এ দেশে চিতল মাছকে ‘বিপন্ন’ বা এন্ডেঞ্জার্ড প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা আমাদের জন্য বেশ শঙ্কার বিষয়। নদীভাঙন, বাঁধ নির্মাণ, পানিদূষণ ও অতিরিক্ত মাছ ধরার চাপে আমাদের দেশের হাওর-বাঁওড় ও নদীগুলোতে চিতল মাছের সংখ্যা দ্রুত কমছে বলে মৎস্যবিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন। কোটি কোটি বছরের বন্যা, মহাদেশগুলোর বিচ্ছেদ ও বরফযুগ পেরিয়ে টিকে থাকা একটি প্রাচীন বংশধারা আজ হার মানছে মানুষের তৈরি দূষণ, মাত্র কয়েক দশকের অতিরিক্ত মাছ ধরা এবং নদী দখলের মতো আগ্রাসনের সামনে।.সমুদ্রের সব মাছ ধরে ফেললে কী হতো.প্রকৃতি সংরক্ষণের বৈশ্বিক জোট আইইউসিএনের হিসাব অনুযায়ী, চিতল মাছ এখন একটি নিয়ার প্রায়-বিপন্ন প্রজাতি। অর্থাৎ এরা পুরোপুরি বিলুপ্তির কাছাকাছি না হলেও বেশ ঝুঁকিতে রয়েছে।.মজাদার চিতল কোফতা রান্নার সময় মাছের কাঁটা বেছে বের করতে যে অসীম ধৈর্যের প্রয়োজন হয়, তার সঙ্গে এই কোটি কোটি বছরের চিতল মাছের পরিবর্তনের ইতিহাসের সরাসরি কোনো যোগ নেই। তবু খাবার থালায় রাখা মাছটির ওই চ্যাপটা ও ব্লেডের মতো শরীর আজও একটি প্রাচীন বংশধারার ছাপ বয়ে চলেছে। যে বংশধারার শুরু হয়েছিল পৃথিবীতে মানুষ নামে প্রজাতির আগমনেরও অনেক আগে। বাজারের মাছ বিক্রেতা বা কোনো ক্রেতা যখন বলেন ‘এই মাছ কোটি বছরের পুরোনো’, তখন তাঁরা পুরোপুরি ভুল বলেন না। তবে এই কোটি বছরের পুরোনো হওয়ার গল্পটি যতটা সহজ শোনায়, আসলে তা ততটা সহজ নয়।লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সূত্র: ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন জার্নাল, নিওট্রপিক্যাল ইকথিওলজি জার্নাল, জুওলজিকা স্ক্রিপ্টা জার্নাল।.ছোট মাছ কীভাবে বড় মাছকে টেক্কা দিয়ে সমুদ্রে বেঁচে থাকে

Source: https://www.bigganchinta.com/biology/8wrz8ortqa

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পল্টনে সাবেক অতিরিক্ত আইজিপির গাড়ির ধাক্কায় রিকশাচালক আহত, চালকের আসনে ছিলেন ছেলে

১

মাস্টহেড পিআরের চিফ স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড গ্রোথ অফিসার আশিক ইকবাল

২

বন্ধুদের সঙ্গে তাহসিফ সাউরির সিসিটিভি ভিডিও প্রকাশ

৩

দ্বিতীয় টেস্টের দলে অমিত হাসান, বাদ মুমিনুল

৪

ঈদে দেশে ফেরার কথা ছিল, ফিরলেন কফিনবন্দী হয়ে

৫

বাইন্যান্সের ক্রিপ্টো চুরি, বৈদেশিক মুদ্রা জোগাতে আরও যা করছে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা

৬

‘আমার ছেলের সাঁতারে প্রশিক্ষণ ছিল, ডুবে মৃত্যু হতে পারে না’: তাহসিফের বাবা

৭

জামায়াত–কওমির বিরোধ কেন, কোথা থেকে এর শুরু

৮

মিজুলায় হ্যালোউইন: হেমন্তের বৃষ্টি-কুয়াশায় ভূতের শহর আর হলুদ পাতায় উৎসবের রং

৯

চাঁদা চেয়ে ফোন, ‘যদি ছেলেপুলে পাঠাতে হয়, ৫০ লাখ ১ কোটি হয়ে যাবে’

১০

ভূত চতুর্দশীর ১৪ শাক: ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভেষজ গুণের গল্প

১১

নেতানিয়াহুকে সরাতে এবার সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের প্রস্তাব আনতে করতে পারে বিরোধী জোট

১২

আজিমপুরে হঠাৎ বাড়িওয়ালার নোটিশ, হন্যে হয়ে বাড়ি খুঁজছেন ছাত্রীরা

১৩

চিকিৎসার পর শুটিংয়ে ফিরে যেমন ছিলেন তানিয়া, রইল ১৫টি ছবি

১৪

এইচএসসিতে চট্টগ্রাম বোর্ডে ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার

১৫

এইচএসসির ফল প্রকাশ, ৯ শিক্ষা বোর্ডের জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩৫৯৪৮

১৬

ব্যালন ডি’অর: কে কত পয়েন্ট পেলেন, কোন দেশ কাকে ভোট দিল

১৭

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি করুন

১৮

সকালেই পড়ুন আলোচিত ৫ খবর

১৯

প্রধানমন্ত্রীর সফর: সূর্যোদয়ের দেশ থেকে আমাদের প্রত্যাশা

২০