২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০:০০ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

এক ঘেরের শেওলা আরেক ঘেরের মাছের খাবার

পানির ওপর ভাসছে বিছানার মতো চ্যাপটা একটি ভেলা। নীল জালের ভেতর থার্মোকলের (হালকা, সাদা ফোমজাতীয় পদার্থ) টুকরা দিয়ে বানানো সেই ভেলার ওপর স্তূপ হয়ে আছে কাদামাখা সবুজ শেওলা। কোমরপানিতে নেমে এক শ্রমিক ভেলাটি টেনে নিচ্ছেন, আরেকজন পানি থেকে শেওলা তুলে রাখছেন তাতে। একটু দূরে একই কাজে ব্যস্ত আরও কয়েকজন। দূর থেকে মনে হতে পারে, মাছের ঘের পরিষ্কার করা হচ্ছে। কাছে গেলে বোঝা যায়, সেখানে চলছে অন্য রকম এক জীবিকার আয়োজন। এক ঘেরের বাড়তি শেওলা তুলে অন্য ঘেরে মাছের খাবার হিসেবে বিক্রি করছেন তাঁরা। গত শুক্রবার সকালে সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার কুলিয়া ইউনিয়নের শশাডাঙ্গা গ্রামে এমন দৃশ্য দেখা যায়। চারপাশে ছোট-বড় মাছের ঘের। ঘেরের মাঝখান দিয়ে সরু পাড়, পাড় ঘেঁষে গ্রামের সড়ক। পানিতে নেমে সকাল থেকেই শেওলা সংগ্রহ করছেন শ্রমিকেরা।.ঘেরের মধ্যে ভেলা টেনে শেওলা তুলছিলেন রাজকুমার গাইন। পানিতে ভাসমান ভেলার ওপর শেওলা স্তূপ করতে করতে রাজকুমার বললেন, ‘ঘেরও পরিষ্কার হচ্ছে, সঙ্গে আমার আয়ও হচ্ছে।’ তিনি জানান, কোনো ঘেরে শেওলা বেশি হলে মাছের চলাচলে সমস্যা হয়। আবার ‘সাদা মাছের’ (কার্পজাতীয়) ঘেরে এই শেওলা খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাই এক ঘের থেকে শেওলা তুলে অন্য ঘেরে বিক্রি করা হয়। এক ভ্যান শেওলা ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। স্থানীয়ভাবে এই শেওলাকে ‘কাটা শেলা’ বলা হয়।.শশাডাঙ্গার সড়কের পাশে ভ্যানে কাদামাখা সবুজ শেওলা তুলছিলেন খলিলুর রহমান। নিজের ঘের থেকেই শেওলা তুলে তিনি বিক্রি করেছেন। তাঁর ভাষ্য, ‘আমার ঘেরেই শেওলা বড্ড বেশি হয়ে গিয়েছিল। এমনি এমনি হয়। দেখতে দেখতে ঘের ভরে যায় শেওলায়। এই এক ভ্যান ৭০০ টাকায় বিক্রি করেছি।’এই শেওলা কিনে নেন স্থানীয় আমিনুর রহমান। তাঁর ১২ বিঘার ঘেরে বর্ষা মৌসুমে রুই, গ্রাস কার্প ও মৃগেলসহ বিভিন্ন মাছ চাষ হয়। আমিনুর বলেন, ‘সাদা মাছ এই শেওলা খুব খায়। তাই মাছের খাবারের জন্য শেওলা কিনে ঘেরে ফেলি।’এভাবেই এক ঘেরের মালিকের কাছে যে শেওলা বাড়তি, অন্য ঘেরের মালিকের কাছে সেটিই মাছের খাবার। আর এই চাহিদাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে শেওলা সংগ্রহ, পরিবহন ও বিক্রির ছোট্ট এক অর্থনীতি।.দেবহাটার পারুলিয়া এলাকায় গেলে শেওলা সংগ্রহের কাজের ব্যাপ্তি আরও স্পষ্ট হয়। ঘেরের পাড়ের সড়কের পাশে সারি করে রাখা শেওলার স্তূপ। পানিতে ভাসছে থার্মোকলের ভেলা। শ্রমিকেরা কেউ পানিতে নেমে শেওলা তুলছেন, কেউ ভেলা টেনে আনছেন, আবার কেউ সড়কের পাশে তা ভ্যানে তুলছেন।সেখানে কাজ করছিলেন আবু সাঈদ। তিনি বলেন, ‘নোনাপানির ঘেরে শেওলা বেশি হয়। সেখান থেকে সংগ্রহ করে মিষ্টিপানির সাদা মাছের ঘেরে বিক্রি করি। এলাকায় অন্য কাজের সুযোগ কম। বছরের পাঁচ থেকে ছয় মাস শেওলা সংগ্রহ আর বিক্রি করি। দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। শীত এলে শেওলা কমে যায়, তখন দিনমজুরির কাজ করি।’শেওলা সংগ্রহের একই চিত্র দেখা যায় দেবহাটার পাশের আশাশুনি উপজেলার মহেশ্বরকাটি এলাকাতেও। সেখানে শেওলা সংগ্রহ করছিলেন লুৎফর রহমান। তিনি বলেন, ‘ঘেরে শেওলা প্রায় সব জায়গাতেই হয়। অতিরিক্ত হলে পরিষ্কার করতে হয়। এগুলো সাদা মাছের ঘেরের মালিকদের কাছে বিক্রি করি।’.চিংড়িঘেরের মালিকদের জন্য শেওলা অনেক সময় বাড়তি ঝামেলার কারণ। দেবহাটার ব্যবসায়ী অজিয়ার রহমানের ১৫ বিঘা জমির ঘেরে চিংড়ি চাষ হয়। তিনি বলেন, শেওলা বেশি হলে চিংড়ির পোনা চলাচলে সমস্যা হয়। এতে চিংড়ির বৃদ্ধিও কম হয়।সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি এম সেলিম বলেন, চিংড়ির ঘেরে অতিরিক্ত শেওলা চিংড়ির চলাচলে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি পানিতে সূর্যের আলো প্রবেশে ব্যাঘাত ঘটিয়ে প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে। তাই অতিরিক্ত শেওলা পরিষ্কার করা প্রয়োজন। তবে সেই শেওলা অন্য মাছের ঘেরে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা গেলে ঘের পরিষ্কারের পাশাপাশি মাছের খাদ্যেরও জোগান হয়।

Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/2ap30efvu3

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দুর্বল হয়েছে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’, দেশের কিছু স্থানে বৃষ্টির সম্ভাবনা

১

রাষ্ট্র যখন তার স্রষ্টাদের সম্মান জানাতে সংকটে পড়ে

২

সকালেই পড়ুন আলোচিত ৫ খবর

৩

আলভারেজ না পাজ—আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি কার

৪

ছিনতাইকারীর কবলে এক রাত

৫

মা-বাবাকে নামাজের দাওয়াত যেভাবে দেবেন

৬

আরব দলগুলোর রেকর্ড সাফল্যের পর ‘ভোট চুরির’ অভিযোগ নেতানিয়াহুর দলের

৭

নির্যাতনের কথা জানাতে গভীর রাতে বাবাকে ভিডিও কল, সংযোগ বিচ্ছিন্ন, বাসায় গিয়ে পেলেন মৃত্যুর খবর

৮

নেতানিয়াহুকে সরাতে আরব দলগুলোর সঙ্গে ঐক্যের ডাক গোলানের

৯

বছরের শেষ নাগাদ পণ্যের দাম বাড়তে পারে ২৩ শতাংশ: বিশ্বব্যাংক

১০

পুলিশে সরাসরি এসআই নিয়োগ হবে ৪ হাজার, ৪০০-৫০০ এএসপি নিতে হবে বিশেষ বিসিএস

১১

ইরানে স্বর্ণপামজয়ী নির্মাতাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ

১২

নির্বাচনের আগের দিন বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

১৩

চার জুটির চার রকম প্রেম, তিন নতুন মুখের অভিষেক

১৪

বেশি বেতনে চীনে চাকরির প্রলোভন, পাচারের জন্য আটকে রেখে ১২ নারীকে নির্যাতন

১৫

ইসরায়েলে ভোট গণনা: নাটকীয়তা বাড়ছে

১৬

ইসির পরীক্ষা হবে আগামীকাল: ১১–দলীয় ঐক্য

১৭

দুই পা হারানো সাখাওয়াতের হাতে হুইলচেয়ার, ঘরে এক মাসের বাজার

১৮

গুলির শব্দ শুনে দৌড়ে গিয়ে দেখেন রক্তে বুক ভিজে যাচ্ছে স্বামীর, হাসপাতালে নিতে নিতে শেষ

১৯

বিজ্ঞান প্রাণহীন বিষয় নয়, বিজ্ঞান থেকে মানবিকতা বিচ্ছিন্ন করা যায় না

২০