৩১ আগস্ট ২০২৬, ৯:০০ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

অবক্ষয়!

কাজল জানত ছেলেরা এ ধরনের অঘটন ঘটাবে। তাই সে সব বাদ্যযন্ত্র একটা ঘরে রেখে তালা মেরে রাতের ঘুম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে। কিন্তু সকালে স্কুলে এসে তার মাথায় হাত। পুরো স্কুলে শুধু প্রস্রাবের গন্ধ। দুই–তিন জায়গায় বমি করা হয়েছে। এক জায়গায় একটা নোংরা প্যান্টে মলও দেখতে পাচ্ছে। এই বিশ্রী গন্ধ তার সহ্য হচ্ছে না। আজ এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠান। সবাই স্কুলে আসার আগেই তাকে সব পরিষ্কার করতে হবে। সব কাজ তাকেই করতে হবে। এখন কাজলের একটু বয়স বেড়েছে; বেড়েছে শরীরের সুগার। অল্প পরিশ্রমেই ক্লান্ত হতে হয় তাকে। আজ এ বয়সে এসে তার গত ২০ বছরের স্মৃতিগুলো সে মাথায় সিনেমার রিলের মতো নিয়ে আসতে থাকে। ও যখন এই বিদ্যালয়ে পিয়ন পদে চাকরি নেয়, তখন তার বয়স ছিল ২৪ বছর। তখন এই পদকে সবাই সম্মান জানিয়ে স্কুলের সবাই তার সঙ্গে কথা বলত।

স্কুলে কেউ কখনো কাজলকে নাম ধরে ডাকত না। ছাত্ররা নরম সুরে কাকা, ভাই ডেকে তাদের প্রয়োজনের কথা বলত। যেন সে তাদের পরিবারের একজন সদস্য। সবাই তাকে ভালোবাসত। আপন মনে করত। মনে কষ্ট পাবে, এমন কথা কেউ কখনো বলেনি। নইলে ২০ বছর কাটিয়ে দিতে পারত না কাজল। এই স্কুল থেকে প্রতিবছর অনেক স্টুডেন্ট ভালো রেজাল্ট নিয়ে বের হয়। পিন্টু দাস এখন মন্ত্রণালয়ের সচিব হয়েছে। তারপরও পিয়ন কাজলের সঙ্গে দেখা হলে তাকে বড় ভাইয়ের মতোই সম্মান জানিয়ে কথা বলে। ঈদের ছুটিতে বেড়াতে এলে কাজলের সঙ্গে কোলাকুলি করে। হৃদয়ের গভীর থেকে ঠান্ডা অনুভব নিয়ে কাজলের খবর নেয়। পিন্টু দাস কাজলকে এখনো পিয়ন মনে করে না। কাজলও পিন্টু দাসকে ছাত্রাবস্থার মতোই দেখতে পায়। পিন্টু যে সচিব, বিশাল বড় চার চাকার এসি গাড়ি নিয়ে আসে। তারপরও তাদের দেখা হলে আন্তরিকতার কমতি নেই। নেই কোনো আলাদা হাবভাব। এমনই ভাবে, যারা এই স্কুল থেকে পাস করে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পুলিশ অফিসার, সরকারি বড় চাকরি পেয়েছে। তাদের আচরণের সঙ্গে এই ব্যাচ ও তারপরের ব্যাচের স্টুডেন্টদের আচরণ কাজল তার মনের কোনো মাপকাঠিতে মেপে মেলাতে পারছে না। আগের ব্যাচের স্টুডেন্টদের ভালোবাসা, জ্ঞান, মেধা, আন্তরিকতা, আচরণ, নৈতিকতা থেকে শুরু করে সবখানেই বর্তমান স্টুডেন্টদের মধ্যে খুবই কম দেখতে পাচ্ছে। তাই তো গত রাতে শিক্ষকেরা অনুমতি দিয়েছিলেন রাত ১০টা পর্যন্ত যেন স্টুডেন্টরা স্কুলে থাকে। সাউন্ডবক্সের ভলিউম যেন মিডিয়াম রাখা হয়। সব শর্তেই কিন্তু স্টুডেন্টরা একসঙ্গে ঘাড় কাত করে সম্মতি জানিয়েছে। এই সম্মতি জানানো ছিল ভাঁওতাবাজি। টিচার চলে গেলেন। তারপরই শুরু করে উচ্চ ভলিউমে সাউন্ডবক্স বাজানো। বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পাশের বাড়ির সবাই শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে গেছে। রাত আটটার সময় কয়েকজনের অভিযোগ পেয়ে বিদ্যালয়ের মোহাম্মদ স্যার স্টুডেন্টদের সঙ্গে কথা বলতে আসেন। স্যারের কথার বিরোধিতা করে বলে, তাদের বড় ভাইদের বিদায় অনুষ্ঠান খুবই জাঁকজমক করতে হবে। মঞ্চ সাজাতে হবে। কেউ কেউ মঞ্চে বিদায়ী বক্তব্য দেবে, তার অনুশীলন করবে। এ জন্য তাদের আজ এই বিদ্যালয়ে রাতে থাকতেই হবে। মোহাম্মদ স্যার যখন স্টুডেন্টদের উচ্চ স্বরে নিষেধ করতে লাগলেন, এমন সময় সেখানে এসে হাজির হলেন ফরিদ। ফরিদকে দেখে সুজন ছেলেটা বড় ভাই, বড় ভাই বলে ডাকতে লাগল, আর বলতে শুরু করল, এ জন্যই আপনাকে ফোন করে ডাকলাম। দেখেন না বড় ভাই, আমরা আজ স্কুলে বিদায় অনুষ্ঠান উপলক্ষে একটু আনন্দ করব, কিন্তু মোহাম্মদ স্যার আমাদের নিষেধ করছেন। ফরিদের আগমন দেখে মোহাম্মদ স্যারও একটু দুর্বল হয়ে গেলেন। ফরিদ এই স্কুলেরই ছাত্র ছিল। পাশের গ্রামে বাড়ি। ২০০৩ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে সে পাস করতে পারেনি। এখন এলাকার সবাই তাকে নেতা নামে চেনে। সবাই এখন তার কথার দাম দিয়ে চলে। শুরুতে এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত। চেয়ারম্যানের টুকিটাকি কাজ করে দিত। এভাবে এলাকায় ফরিদের নেতা হয়ে ওঠা। ফরিদ কোনো চাকরি করে না, কোনো ব্যবসা করে না, করে না কোনো কৃষিকাজ। সারা দিন শুধু স্যুট–প্যান্ট পরে সরকারি দপ্তরে ঘুরে বেড়ায়। সরকারি কর্তাদের সঙ্গে তার খুবই ভাব। এলাকার সবাই জানে, সরকারি কিছু সেবা টাকার বিনিময়ে প্রকৃত উপকারভোগীর পরিবর্তে সুবিধাবাদীদের পাইয়ে দেয়। ইদানীং এই কাজও বেশি করতে চায় না। সে এখন আরও বড় ইনকামের ধান্দা পেয়ে গেছে। এখন তাকে থানার ওসি, রাজনৈতিক দলের উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে চলতে দেখা যায়। সবাই জানে যে, ফরিদ এই এলাকায় মাদকের সরবরাহকারী। তার এই ওপেন সিক্রেট ব্যবসার কথা সবারই জানা। কিন্তু কেউ তার প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না।

গত ২০ বছরে এলাকার অভিভাবকদের কাছে এ বিষয়ে আস্থা জন্মেছে যে পড়ালেখা শেষে চাকরি করে জীবনে আর কয় টাকা কামানো যায়। তার চেয়ে তাদের ছেলে–মেয়েরা দুই ক্লাস পড়ে নেতার খাতায় নাম লেখাতে পারলেই তারা জীবনে বহু রোজগার করতে পারবে। এখানে ইনকামের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। এই যে স্টুডেন্টরা আজ ফরিদকে আদর্শ মানছে। তাকেই ফোনে ডাকা হয়েছে। তার দেখানো পথ থেকেই এই ছোট্ট ছেলেরা নেশা কিনে এনেছে। অনেকের কাছে আজ হয়তো নেশার জগতে প্রথম দিন ছিল, তাই তাদের শারীরিক সমস্যা হয়েছে। এই ছেলেদের মা–বাবারও সমর্থন আছে। তাঁদের কাছে এখন পড়ালেখা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তাঁদের ছেলেরা নেতার মতো ভাব নিয়ে চলাফেরা করে বড় হবে। একদিন তারা নেতা হবে, বড় নেতা হবে। হাট, ঘাট, পুলিশ, প্রশাসন সবই তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কাজলের সরল মনের সরল ভাবনা, অভিভাবকদের মানসিকতার এই অবক্ষয়ে দেশে রীতিমতো দাস ও সন্ত্রাস তৈরি হবে। যে দুই–একজন পড়ালেখা শিখে চাকরি করবে, তারাও এদের দলে মিশে সুদ ও ঘুষ নিয়ে নিজের জীবন যাপন করবে।

এই কাজল, কাজল! ডাক শুনে কাজলের অবচেতন মনে চৈতন্য ফিরে আসে। মোহাম্মদ স্যার কাজলকে নির্দেশ দিয়েছিলেন রাত ১০টার সময় কাজল যেন সবকিছু একটা ঘরে রেখে তালা মেরে চলে যায়। কাজল স্যারের পরামর্শ অনুযায়ী তা–ই করে। এতে স্টুডেন্টরা কোনো বাধা দেয়নি। তাই কাজলের মনে কোনো সন্দেহ জাগেনি। এই স্টুডেন্টরা পরে বাজার থেকে আবার সাউন্ডবক্স নিয়ে আসে; সঙ্গে নিয়ে আসে বিভিন্ন রকমের নেশা দ্রব্য। এই নেশা খাওয়ার একটা সুবর্ণ রাত স্টুডেন্টরা হাত ছাড়া করতে চায়নি। নিশ্চিত একটা রোমাঞ্চকর রাত তারা উপভোগ করে কাজলের কাজ বাড়িয়ে দেয়। এখন কাজল মোহাম্মদ স্যারকে সালাম দিয়ে নিজের কাজে মনোযোগ দেয়।

এরিয়া ম্যানেজার, ব্র্যাক সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচি

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

Source: https://nagorik.prothomalo.com/ayojon/zwn6pl0jlz

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চিকিৎসার পর শুটিংয়ে ফিরে যেমন ছিলেন তানিয়া, রইল ১৫টি ছবি

১

এইচএসসিতে চট্টগ্রাম বোর্ডে ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার

২

এইচএসসির ফল প্রকাশ, ৯ শিক্ষা বোর্ডের জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩৫৯৪৮

৩

ব্যালন ডি’অর: কে কত পয়েন্ট পেলেন, কোন দেশ কাকে ভোট দিল

৪

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি করুন

৫

সকালেই পড়ুন আলোচিত ৫ খবর

৬

প্রধানমন্ত্রীর সফর: সূর্যোদয়ের দেশ থেকে আমাদের প্রত্যাশা

৭

শেষ পর্যন্ত যখন আপনি চূড়ায় উঠবেন, সেই আনন্দের তুলনা নেই…

৮

পার্লামেন্টে প্রথম দিনই স্পিকারকে হটাতে একমত আরব দলসহ নেতানিয়াহু বিরোধীরা

৯

কুকুর পোষা পাপ আর বিড়াল পোষা কি সুন্নত

১০

বিজ্ঞাপনে এআইয়ের ধাক্কা, গুগলের বাজারমূল্য কমল ৫০০ বিলিয়ন ডলার

১১

তাহসিফের মৃত্যু: ধাওয়া দেওয়া ব্যক্তিরা কি মাদক কারবারি, নাকি পুলিশ—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা

১২

জাতীয় চার্চ পরিষদের ৭৫ বছর পূর্তি উদ্‌যাপন

১৩

লন্ডনে কিশোরী ধর্ষণের ঘটনায় দুই বাংলাদেশিকে খুঁজছে পুলিশ

১৪

যাত্রাবাড়ীতে মাদক অভিযানে এসআরবি-পুলিশের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার ২৬ জনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ

১৫

লোকজন জড়ো হয়ে ঘিরে ধরে পুলিশকে, ফাঁকে পালিয়ে যায় হত্যা মামলার আসামি

১৬

তাহসিফকে ধাওয়া দিয়েছিল ইউনিফর্ম পরা লোকজন, দাবি দীপের ও অন্যান্য খবর

১৭

পতিত স্বৈরাচার ও নব্য স্বৈরাচারকে পরাজিত করব: নাহিদ ইসলাম

১৮

সমর্থকদেরই শাস্তি দিল বার্সেলোনা, বন্ধ থাকবে গ্যালারি

১৯

পরাজিত প্রার্থীর বাড়িতে ফুল নিয়ে গেলেন বিএনপির বিজয়ী প্রার্থী মির্জা ফয়সল

২০