১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯:৩০ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সমন্বিত আইন প্রয়োজন

‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষা: সমন্বিত আইনের প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে ব্লাস্ট ও প্রথম আলো।.যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও প্রতিকারে এমন একটি পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর আইন প্রয়োজন, যা সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে—এমন অভিমত বিশেষজ্ঞদের। আইনে অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে জবাবদিহিমূলক ও ভুক্তভোগীবান্ধব কাঠামো রাখার প্রস্তাবও করেছেন তাঁরা।গতকাল বুধবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষা: সমন্বিত আইনের প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক গোলটেবিলে এসব কথা উঠে আসে। ইউএন উইমেনের সহযোগিতায় যৌথভাবে গোলটেবিলের আয়োজন করে ব্লাস্ট ও প্রথম আলো। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজীবী, অধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।.গোলটেবিল বৈঠকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদা বলেন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে যে আইনটি নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ হয়েছে, সেটি সংসদে পাস হওয়া প্রয়োজন। তবে শুধু আইন করলেই হবে না, আইনকে কার্যকর করার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। তাঁর মতে, কোনো কাজকে অপরাধ হিসেবে গণ্য না করা হলে মানুষ সেটিকে প্রতিরোধমূলকভাবে দেখে না।প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি কমিয়ে আনতে আর্থিক শাস্তির পরামর্শ দেন অধ্যাপক শাহনাজ হুদা। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের মামলা করার সুযোগ থাকলেও সেটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে।বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্লাস্টের লিগ্যাল স্পেশালিস্ট আয়েশা আক্তার। প্রবন্ধে বলা হয়, ২০০৯ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুগান্তকারী নির্দেশনা প্রদান করেন। এ নির্দেশনাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবে কার্যকর থাকলেও এর বাস্তবায়ন সর্বত্র নিশ্চিত হয়নি।তাই যৌন হয়রানি প্রতিরোধে এমন একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রয়োজন, যা কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য কার্যকর হবে।.ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, নতুন আইন যেমন প্রয়োজন, তেমনি আইন বাস্তবায়নের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। বিভিন্ন শ্রমজীবী নারী, শিক্ষার্থী, আইনজীবী, অধিকারকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একসঙ্গে নিয়ে এ বিষয়ে সরকারের ওপর সমন্বিতভাবে চাপ তৈরি করা প্রয়োজন।অধ্যাপক সামিনা লুৎফার মতে, নতুন আইনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দ্বিমতের সুযোগ নেই। তবে বর্তমান ব্যবস্থাতেও কিছু কাজ করা সম্ভব। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে বিদ্যমান হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোকেও এই আলোচনার মধ্যে আনতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।.যৌন হয়রানি প্রতিরোধে যে আইনটি নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ হয়েছে, সেটি সংসদে পাস হওয়া প্রয়োজন। তবে শুধু আইন করলেই হবে না, আইনকে কার্যকর করার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।শাহনাজ হুদা, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় .সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ফওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আইন ও নীতিমালা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ হলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা কঠিন হয়েছে। হাইকোর্টের নির্দেশনার পরও অনেক ক্ষেত্রে এর বাস্তবায়ন হয়নি।ফওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, শুধু আইন তৈরি করলেই হবে না, আইন সম্পর্কে বিচারক, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যথাযথ ধারণা থাকতে হবে। একইভাবে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং পারিবারিক সহিংসতা-সংক্রান্ত আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।.ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমিন বলেন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধের আইন নিয়ে ২০১৮ সাল থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও একটি খসড়া আইন অনেক দূর এগিয়েছিল। কিন্তু গেজেট প্রকাশের আগেই নির্বাচন হয়ে যাওয়ায় সেটি অধ্যাদেশ হিসেবে কার্যকর হয়নি।এই সহযোগী অধ্যাপক বলেন, আইনটি এমন হতে হবে, যাতে পোশাকশিল্প, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে তা কার্যকর করা যায়।.বিভিন্ন শ্রমজীবী নারী, শিক্ষার্থী, আইনজীবী, অধিকারকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একসঙ্গে নিয়ে এ বিষয়ে সরকারের ওপর সমন্বিতভাবে চাপ তৈরি করা প্রয়োজন। সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় .ইউএন উইমেনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার শ্রবণা দত্ত বলেন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে শুধু একটি নীতিমালা বা কমিটি যথেষ্ট নয়। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। এর সঙ্গে সক্ষমতা বৃদ্ধি, আইন ও নীতিমালা এবং প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়ও যুক্ত।প্রযুক্তির মাধ্যমে যৌন হয়রানির ঘটনা মোকাবিলায় ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতাও বাড়ানো দরকার বলেও মনে করেন শ্রবণা দত্ত।সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কারিশমা জাহান বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হলো প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও জবাবদিহির ঘাটতি। নির্দেশনায় কমিটি গঠনের কথা বলা হলেও কমিটি গঠনের পর সেটি কীভাবে কার্যকরভাবে কাজ করবে, সে বিষয়ে বাস্তব কাঠামোর ঘাটতি রয়েছে।কারিশমা জাহান বলেন, সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত আইনেও যৌন হয়রানির সব ধরনের ঘটনা মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট বিস্তৃত কাঠামো নেই। ফলে বিদ্যমান আইনগুলো দিয়ে সব ধরনের যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন।.অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হলেও তাঁদের সুরক্ষার জন্য বিদ্যমান আইন বা পরিপত্রে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই বলে বৈঠকে উল্লেখ করেন নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম। তিনি বলেন, অনানুষ্ঠানিক খাতের নারীরা পরিবার ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও হয়রানির শিকার হলে অনেক সময় বিচার বা প্রতিকার পান না।উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার মিষ্টি বলেন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি আইন প্রয়োজন। তবে আইন না হওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের নির্দেশনা ও বিদ্যমান বিভিন্ন আইনি কাঠামো ব্যবহার করতে হবে।.বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যৌন হয়রানি নিয়ে একধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে বলে বৈঠকে মন্তব্য করেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য হেমা চাকমা। তিনি বলেন, ভুক্তভোগীরা মনে করেন, হয়রানির শিকার হলেও প্রতিকার পাওয়া যাবে না। ফলে অনেকেই অভিযোগ করতে আগ্রহী হন না।হেমা চাকমা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল ও কলেজে শিক্ষার্থীদের জন্য এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করা দরকার। হয়রানির শিকার হলে কোথায় অভিযোগ করতে হবে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ কী—এসব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।বৈঠকে স্বাগত বক্তব্য দেন ব্লাস্টের পরিচালক (অ্যাডভোকেসি ও কমিউনিকেশন) মাহবুবা আক্তার। এতে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিবেদক মানসুরা হোসাইন। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীন।

Source: https://www.prothomalo.com/roundtable/84rhizhnwv

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

এল ম্যাগাজিনের কভার গার্ল থেকে গ্ল্যামার নিয়ে নতুন বিতর্কে দিশা পাটানি

সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ডেঙ্গুর শঙ্কা, এডিস নিয়ন্ত্রণে করণীয় কী

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তবিভাগ ফুটবল খেলায় দুই বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ

প্রার্থিতা জানান দিতে কয়েক শ মোটরসাইকেল নিয়ে শোডাউন, তিন হাজার মানুষের ভূরিভোজ

ক্রাউন প্লাজা ঢাকা গুলশানে দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজিত হতে যাচ্ছে ওয়াও মার্কেট।

ইরানের স্কুলে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা যুদ্ধাপরাধের শামিল, বলছে জাতিসংঘ

পারিবারিক কলহের জেরে ছেলেকে হত্যার অভিযোগ, মা আটক

মোহাম্মদপুরে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মোটরসাইকেল ও টাকা ছিনতাই

অদৃশ্য জীবাণু, দৃশ্যমান অবদান: মাইক্রোবায়োলজিস্টদের গল্প

এনসিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে

১০

বাংলাদেশিদের জন্য নতুন ওয়ার্ক পারমিট ও শ্রমভিসা বন্ধ করল লাওস

১১

আদালতে চুক্তিপত্র দেখিয়ে জামিন, পরে বেরিয়ে এল জালিয়াতির তথ্য

১২

নেপাল–তিব্বতের প্রাণঘাতী বন্যার পেছনে জলবায়ু সংকট, ধারণা গবেষকদের

১৩

যুক্তরাজ্য–ইসরায়েল মুখোমুখি, পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞা—আন্তর্জাতিক চাপে কি নেতানিয়াহু

১৪

ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে টাকা নেওয়ার ঘটনায় এনসিপি নেত্রীকে সাময়িক অব্যাহতি

১৫

যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সমন্বিত আইন প্রয়োজন

১৬

পাহাড়ে বাহারি ফুল

১৭

গ্রাহকবান্ধব সুদের হার ও দ্রুত অনুমোদন সুবিধা

১৮

যুদ্ধাপরাধের দায়ে কসোভোর সাবেক প্রেসিডেন্ট হাশিম থাচির ২৫ বছরের কারাদণ্ড

১৯

সাগরে নৌজাহাজের ধাক্কা, কূটনীতিক তলব ভারত ও পাকিস্তানের

২০