১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪:০০ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

‘আমার পরির মতো মেয়েটা কথা বলতে বলতেই মারা গেল, আমি কীভাবে বাঁচব’

‘আমার মেয়েটা সারা দিন সেজেগুজে থাকত, বেড়াতে পছন্দ করত। দুপুর হলেই বাবাকে ফোন করত, যাতে বাড়িতে এসে ভাত খেয়ে যায়। আমার এমন পরির মতো মেয়েটা কথা বলতে বলতেই মারা গেল। এই কষ্ট ভুলে আমি কীভাবে বাঁচব।’ কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন হাসান বানু। তিনি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড পৌর সদরের আমিরাবাদ এলাকার বাসিন্দা মো. নুরুন্নবীর স্ত্রী। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে সিরাজুম মুনিরার মৃত্যু হয়েছে। সিরাজুম মুনিরা উপজেলা সদরের আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্‌–প্রাথমিকের শিক্ষার্থী ছিল। তার বাবা নুরুন্নবী এলাকায় ডিশ সংযোগ দেওয়ার একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। অন্যদিকে সিরাজুম মুনিরার মা হাসান বানু একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মী। নুরুন্নবী–হাসান বানু দম্পতির দুই মেয়ের মধ্যে মুনিরা ছোট ছিল।.পরিবারের সদস্যরা জানান, ১০ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে সিরাজুম মুনিরার জ্বর হয়। পরদিন জ্বরের ওষুধ খাওয়ার পর কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠে সে। তবে গত রোববার আবার জ্বর দেখা দেয় তার। তাই পরিবারের সদস্যরা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। ওই চিকিৎসক সিরাজুম মুনিরার ডেঙ্গু হয়েছে কি না, তা পরীক্ষার পরামর্শ দেন। পরে ওই দিনই নগরের একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হয়।.মেয়েটা ঘুরতে যেতে পছন্দ করত। নতুন জামা আনার কথা বলত। রাতে দেরি হলেই ফোন দিয়ে আমার খবর নিত। এখন আর কেউ ফোন দেবে না। অল্প দিনেই মেয়েটা এত মায়া লাগিয়ে চলে গেল। এই কষ্ট ভুলে জানি না কীভাবে থাকব।—মো. নুরুন্নবী, সিরাজুম মুনিরার বাবা.ওই ডেঙ্গু পরীক্ষার প্রতিবেদন এসেছিল পরদিন সোমবার। তবে পরিবারের সদস্যরা এই প্রতিবেদন নিতে ওই দিন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যাননি। কারণ, যে চিকিৎসক ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে বলেছেন, তিনি ওই দিন চেম্বার করেন না। তাই পরদিন মঙ্গলবার প্রতিবেদনটি নিয়ে সিরাজুম মুনিরাকে ওই চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়।সিরাজুম মুনিরার মা হাসান বানু বলেন, মেয়েটা ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে নিজেই হেঁটে গিয়েছিল। তবে মঙ্গলবার থেকে তার হাত–পা ফুলে যেতে শুরু করে। এ ছাড়া মলের রং কালো হচ্ছিল। মঙ্গলবার চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলে চিকিৎসক মুনিরাকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তাঁরা মেয়েকে দ্রুত সেখানে নিয়ে যান। পরে আইসিইউয়ে নেওয়া হলে গতকাল রাতে সেখানে মুনিরার মৃত্যু হয়।.সীতাকুণ্ডে ৪৮ ঘণ্টার কম সময়ের ব্যবধানে ডেঙ্গুতে আরেক শিশুর মৃত্যু.আজ শুক্রবার সকালে সরেজমিনে মুনিরার বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, পুকুরের পাড়ে দুই কক্ষের একতলা একটি ঘর। এতে ভিড় করেছেন প্রতিবেশী ও স্বজনেরা। ঘরের একটি কক্ষে খাটের ওপর থাকা হলুদ রঙের একটি স্কুল ব্যাগ খুলে সিরাজুম মুনিরার হাতের লেখা ও আঁকা ছবি স্বজনদের দেখাচ্ছেন মা হাসান বানু ও নানি সালেহা বেগম। এ ছাড়া দুই মেয়ের কক্সবাজার বেড়াতে যাওয়ার ছবিও দেখাচ্ছেন হাসান বানু।ঘরে কথা হয় মুনিরার বাবা মো. নুরুন্নবীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘মেয়েটা ঘুরতে যেতে পছন্দ করত। নতুন জামা আনার কথা বলত। রাতে দেরি হলেই ফোন দিয়ে আমার খবর নিত। এখন আর কেউ ফোন দেবে না। অল্প দিনেই মেয়েটা এত মায়া লাগিয়ে চলে গেল। এই কষ্ট ভুলে জানি না ক্যামনে থাকব।’.নানি সালেহা বেগম বলেন, ‘আমার পরিটা যেমন সুন্দর ছিল, কাজও ছিল সুন্দর। ইউটিউব দেখে হাতের লেখা অনুশীলন করত। অল্প বয়সেই তার হাতের লেখা অনেক সুন্দর হয়েছিল। অনেক সুন্দর করে ছবি আঁকত। ঘরের পাশে পুকুর, তাই তাকে সাঁতার শেখানো হয়েছিল। গোসল করতে গেলেই পুকুরে দাপিয়ে বেড়াত সে।’মা হাসান বানু বলেন, ‘বড় মেয়ে সিদরাতুল মুনতাহা সীতাকুণ্ড বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় পড়াশোনা করছে। ছোট মেয়েটাকে স্কুলে দিয়েছিলাম। পড়াশোনায় ভালো ছিল সে। মেয়েটা আমাদের ছেড়ে চলে গেল।’সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিহত সিরাজুম মুনিরা যে ক্লাসে পড়ত, একই ক্লাসেই আমার মেয়ে পড়ে। সিরাজুম মুনিরার মৃত্যুর খবরটি আমি আমার মেয়ের কাছেই প্রথমে পাই। বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ঘটনা শুনে আমিও নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি।’

Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/wa5gtf2vqj

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুনে নিহত ১০ জনের মরদেহ স্বজনের কাছে হস্তান্তর

১

কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুনে নিহত ১০ জনের মরদেহ স্বজনের কাছে হস্তান্তর

২

হুমকিতে বন্ধ, রাজশাহীতে পুলিশের উপস্থিতিতে খুলল সার ডিলারের দোকান

৩

হুমকিতে বন্ধ, রাজশাহীতে পুলিশের উপস্থিতিতে খুলল সার ডিলারের দোকান

৪

‘নন্দিত নরকে’: মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্পে মানবজীবনের বেদনা

৫

‘নন্দিত নরকে’: মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্পে মানবজীবনের বেদনা

৬

‘ক্রসফায়ারের’ ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স, আইজিপির বক্তব্য ঠিক হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

৭

‘ক্রসফায়ারের’ ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স, আইজিপির বক্তব্য ঠিক হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

৮

যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় জাতিগত নিধন চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল: জাতিসংঘের তদন্ত

৯

জাফর ইকবাল, মাকসুদ কামালসহ পাঁচ আসামিকে আত্মসমর্পণ করতে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তির নির্দেশ

১০

কী নিয়ে বিরক্ত হন দীঘি?

১১

ডিকশনারি ডটকমের বর্ষসেরা শব্দ ‘ম্যাক্সিং’, এর অর্থ কী

১২

অভিষেকের দুর্দান্ত সেঞ্চুরি, নিউজিল্যান্ডকে টি–টুয়েন্টি শেখাল ভারত

১৩

অভিষেকের দুর্দান্ত সেঞ্চুরি, নিউজিল্যান্ডকে টি–টুয়েন্টি শেখাল ভারত

১৪

নিজের নামে রেলওয়েতে প্রায় কোটি টাকার বিল, জানেনই না গৃহিণী কোহিনূর

১৫

নিজের নামে রেলওয়েতে প্রায় কোটি টাকার বিল, জানেনই না গৃহিণী কোহিনূর

১৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪তম সমাবর্তনে আবেদন চার ধাপে, ১ নভেম্বর শুরু

১৭

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪তম সমাবর্তনে আবেদন চার ধাপে, ১ নভেম্বর শুরু

১৮

ইসরায়েলে ভোট চলছে, কেন্দ্রে কেন আরব ভোটারদের ভিডিও করছে নেতানিয়াহুর দল

১৯

কালো স্যুটে গোলাপি পালকের ব্রোচ, নজর কাড়লেন লামিনে ইয়ামাল

২০