২৭ জুলাই ২০২৬, ১:৩১ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

নির্বাচনে নারী, গভীর রাতে ফোনে বার্তা এবং অদৃশ্য শক্তি

দেশের কোনো এক উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদের মহিলা সদস্য হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রাক্কালে রোকেয়া বেগম (ছদ্মনাম) প্রথম যে কাজটি করেছিলেন, সেটি কোনো উন্নয়নকাজ নয়। তিনি মুঠোফোনের নম্বর বদলেছিলেন। রাত গভীর হলে তাঁর পুরোনো নম্বরে আসত এমন সব বার্তা, যেগুলো পড়লে মনে হয় রাজনীতি করার অপরাধে তাঁকে কোনো অদৃশ্য আদালত শাস্তি দিচ্ছে। তাঁর রাজনৈতিক যোগ্যতা চাপা পড়ে গেল চরিত্রহনন আর হেট-স্পিচের এক ‘সুপরিকল্পিত’ বেড়াজালে। শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিলেন। পরাজিত হলেন কোনো প্রার্থীর কাছে নয়, বরং অদৃশ্য এক শক্তির কাছে।তবে শুধু এ ধরনের অনলাইন বুলিং নয়, নিজ দলের সহযোগিতা না পাওয়া, পারিবারিক আপত্তি কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সঙ্গে অর্থনৈতিক সামর্থ্যে টিকতে না পেরে নারীরা রাজনীতির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।.আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নেই প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা; যতটুকু আছে সেটুকুও পর্যাপ্ত নয়। এই অবস্থায় যখন জাতিগত সংখ্যালঘু, দলিত ও অন্যান্য নিম্নবর্গের জনগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও নারীসহ জেন্ডার-বৈচিত্র্যের জনগোষ্ঠী সহিংসতার সম্মুখীন হয়, তখন তাদের এই পরিচয়ের কারণে সহিংসতার মাত্রা আরও তীব্র হয়।.ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) সাম্প্রতিক গবেষণায় ৪৩ জন নারী রাজনীতিবিদের সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে এ দেশের নারীদের রাজনৈতিক পথচলার বাস্তব চিত্র। বাংলাদেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়—এটি পদ্ধতিগত, বহুমাত্রিক এবং দীর্ঘস্থায়ী। এটি শুধু নির্বাচনের দিনে মারামারি বা বুথ দখলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং নারীর শরীর, পরিবার, বৈবাহিক অবস্থা ও নৈতিকতাকে হাতিয়ার বানিয়ে একটা ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে নারী প্রার্থীকে কেন্দ্র করে কমপক্ষে ১২টি বড় সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যেখানে আহত হয়েছেন অন্তত ছয়জন নারী। গবেষণা ও আন্তর্জাতিক তথ্য বলছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭৬ শতাংশ এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৬০ শতাংশ নারী সংসদ সদস্য অনলাইনে ও অফলাইনে এই জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার হন।.নির্বাচনে ‘ডিপফেক’ আতঙ্ক, এখন ভিডিও মানেই সন্দেহ.কিন্তু দুঃখজনক হলো, আমাদের প্রচলিত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে এই বিশেষায়িত অপরাধটিকে এখনো ‘রাজনীতির স্বতন্ত্র সহিংসতা’ হিসেবে স্বীকৃতিই দেওয়া হয়নি। আরও সহজ করে বললে, এ ধরনের ঘটনাকে ‘সহিংস ঘটনা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মানসিকতা এখনো আমাদের তৈরি হয়নি। তাই এমন পরিস্থিতি ঘটলে সার্বিক দিক থেকে সুষ্ঠু বিচার অনিশ্চিত থেকে যায়, ফলে অভিযোগও আসে কম। এ ছাড়া ডিজিটাল সহিংসতা নারীদের জনসমক্ষে আসতে নিরুৎসাহিত করে, দলীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে এবং গুরুতর মানসিক ক্ষতি করে। অথচ এ ধরনের সহিংসতা রোধে কার্যকর কোনো পদ্ধতি দেখা যায় না। অন্যদিকে রাজনীতিতে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা মোকাবিলার জন্য যেসব ব্যবস্থা নির্বাচন কমিশনের আছে, তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। আবার, রাজনৈতিক দল ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় বিদ্যমান নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ প্রতিকারব্যবস্থা দুর্বল ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নেই প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা; যতটুকু আছে সেটুকুও পর্যাপ্ত নয়। এই অবস্থায় যখন জাতিগত সংখ্যালঘু, দলিত ও অন্যান্য নিম্নবর্গের জনগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও নারীসহ জেন্ডার-বৈচিত্র্যের জনগোষ্ঠী সহিংসতার সম্মুখীন হয়, তখন তাদের এই পরিচয়ের কারণে সহিংসতার মাত্রা আরও তীব্র হয়।.বাংলাদেশে নারীদের জীবন পারিপার্শ্বিক নানা কারণে অনিরাপদ। কোনো নারী যদি রাজনীতিতে না-ও আসেন, তবু তিনি তাঁর দৈনন্দিন জীবনে ব্যাপকভাবে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার মুখোমুখি হন। ফলে রাজনীতিতে প্রবেশের আগেই একজন নারীর স্বাভাবিক চলাফেরা, স্বাধীনতা ও অধিকার-প্রাপ্তিতে ছন্দপতন ঘটে। অনিরাপদ এই সামাজিক পরিবেশে নারীর নিরাপত্তা থাকে সব সময় অনিশ্চিত। এখন যদি কোনো নারী প্রতিনিয়ত এই পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে রাজনীতিতে নাম লেখাতে চান, তখনই নতুন মাত্রার সহিংসতা ও বিপদ দেখা দেয়। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে শুরু করে আইনি হয়রানি, অসম্মানজনক আচরণ, সম্পদ ধ্বংস, ডিজিটাল সহিংসতা, যৌন হয়রানি, কিংবা শারীরিক হামলার মতো সংকট আসে নারী রাজনীতিবিদের জীবনে। আর এই প্রতিটি ধরনের সহিংসতা নারীর জীবনে নানামুখী ক্ষতি করে। এ ধরনের ঘটনা বা সহিংসতাকে নারীরা ক্ষেত্রবিশেষে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন; কিন্তু তা কোনো স্থায়ী বা কাঠামোবদ্ধ সমাধান নয়।এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের দরকার সুনির্দিষ্ট ও কাঠামোগত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। রাজনীতিতে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতাকে জাতীয় জরিপ ও নির্বাচন পর্যবেক্ষণের আলাদা সূচকে অন্তর্ভুক্ত করে এর স্বতন্ত্র সংজ্ঞা ও স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশনকেও কার্যকর আইনি ক্ষমতা দেওয়া দরকার। .মাঠে নারী, মিছিলে নারী; কিন্তু সংসদে?.যৌন হয়রানি, চরিত্রহনন ও ডিজিটাল সহিংসতাকে আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি টেকসই ও দ্রুত প্রতিক্রিয়াব্যবস্থা (রেসপন্স সিস্টেম) গড়তে পারলে তা সবাইকে নিরাপত্তা দিতে পারবে। একই সঙ্গে নারীর প্রতি আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে প্রয়োজনে প্রার্থিতা বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতাও নির্বাচন কমিশনের থাকা উচিত।গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করে প্রতিটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলে ২০০৯ সালের হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী একটি স্বাধীন ও নিরাপদ অভিযোগ প্রতিকারব্যবস্থা গড়ে তোলা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। কানাডার হাউস অব কমন্সের মতো আমাদের দেশেও রাজনৈতিক দল ও সংসদে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে প্রতিটি সদস্যকে জেন্ডার সংবেদনশীল আচরণের অঙ্গীকারে স্বাক্ষর করতে হয়। তা ছাড়া প্রযুক্তিভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ও তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন অনলাইন প্রচারণা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারলে জবাবদিহি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।সবশেষে, আমাদের মনে রাখতে হবে যে সব নারীর ঝুঁকি এক নয়। একজন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, দলিত, বা প্রান্তিক অঞ্চলের নারী রাজনীতিকের জন্য এই বাধা আরও দ্বিগুণ। তাই সব নীতি ও সুরক্ষামূলক পদক্ষেপে এই বহুমাত্রিক পরিচয় ও জাত-বর্ণের বৈষম্যহীনতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।.যে নারীনেত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কুৎসিত আক্রমণের শিকার হয়ে মাঝপথে রাজনীতি ছেড়ে ঘরে ফিরে গিয়েছিলেন, তিনি আসলে শুধু একা হেরে যাননি; তাঁর সঙ্গে হেরে গেছে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সুশাসিত সমাজের স্বপ্ন। রোকেয়া বেগম তাঁর ফোন নম্বর বদলেছিলেন, কিন্তু সমাজ থেকে সেই ভয়ের পরিবেশটি বদলে দেওয়া যায়নি। যত দিন পর্যন্ত রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলো রূপকথার হাইড্রার মতো বহুরূপী এই সহিংসতাকে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে স্বীকার করে এর বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক প্রাচীর না তুলবে, তত দিন পর্যন্ত এ দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর তথা নারীদের প্রকৃত গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব কেবলই এক দূরবর্তী আকাঙ্ক্ষা হয়ে থাকবে।জিহাদ আল মেহেদী ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টে (বিআইজিডি) ডেপুটি ম্যানেজার (মিডিয়া অ্যান্ড এনগেজমেন্ট) হিসেবে কর্মরত।মতামত লেখকের নিজস্ব

Source: https://www.prothomalo.com/opinion/column/k2t8pzbnd4

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাষ্ট্র যখন তার স্রষ্টাদের সম্মান জানাতে সংকটে পড়ে

১

সকালেই পড়ুন আলোচিত ৫ খবর

২

আলভারেজ না পাজ—আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি কার

৩

ছিনতাইকারীর কবলে এক রাত

৪

মা-বাবাকে নামাজের দাওয়াত যেভাবে দেবেন

৫

আরব দলগুলোর রেকর্ড সাফল্যের পর ‘ভোট চুরির’ অভিযোগ নেতানিয়াহুর দলের

৬

নির্যাতনের কথা জানাতে গভীর রাতে বাবাকে ভিডিও কল, সংযোগ বিচ্ছিন্ন, বাসায় গিয়ে পেলেন মৃত্যুর খবর

৭

নেতানিয়াহুকে সরাতে আরব দলগুলোর সঙ্গে ঐক্যের ডাক গোলানের

৮

বছরের শেষ নাগাদ পণ্যের দাম বাড়তে পারে ২৩ শতাংশ: বিশ্বব্যাংক

৯

পুলিশে সরাসরি এসআই নিয়োগ হবে ৪ হাজার, ৪০০-৫০০ এএসপি নিতে হবে বিশেষ বিসিএস

১০

ইরানে স্বর্ণপামজয়ী নির্মাতাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ

১১

নির্বাচনের আগের দিন বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

১২

চার জুটির চার রকম প্রেম, তিন নতুন মুখের অভিষেক

১৩

বেশি বেতনে চীনে চাকরির প্রলোভন, পাচারের জন্য আটকে রেখে ১২ নারীকে নির্যাতন

১৪

ইসরায়েলে ভোট গণনা: নাটকীয়তা বাড়ছে

১৫

ইসির পরীক্ষা হবে আগামীকাল: ১১–দলীয় ঐক্য

১৬

দুই পা হারানো সাখাওয়াতের হাতে হুইলচেয়ার, ঘরে এক মাসের বাজার

১৭

গুলির শব্দ শুনে দৌড়ে গিয়ে দেখেন রক্তে বুক ভিজে যাচ্ছে স্বামীর, হাসপাতালে নিতে নিতে শেষ

১৮

বিজ্ঞান প্রাণহীন বিষয় নয়, বিজ্ঞান থেকে মানবিকতা বিচ্ছিন্ন করা যায় না

১৯

ধীরে এগোচ্ছে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’

২০