২৯ জুলাই ২০২৬, ১:৩১ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

মনোযোগের অর্থনীতি: কেন বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে তরুণেরা

একসময় বই ছিল জ্ঞান অর্জনের প্রধান মাধ্যম। আজ বইয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে একটি অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা—মনোযোগের অর্থনীতি। বিশ্বে এমন একটি শিল্প গড়ে উঠেছে, যার প্রধান কাঁচামাল তেল, গ্যাস কিংবা খনিজ নয়; মানুষের মনোযোগ। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক বিজ্ঞাপন ব্যয় ১.১৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। গুগলের আয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ এবং মেটার ৯৮ শতাংশের বেশি এসেছে বিজ্ঞাপন থেকে। অর্থাৎ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক সাফল্য নির্ভর করছে আমরা কতক্ষণ তাদের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকি। মানুষের মনোযোগ আজ শুধু মনোবিজ্ঞানের বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক পুঁজিবাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো আমাদের যত বেশি সময় স্ক্রিনে ধরে রাখতে পারে, তাদের মুনাফা তত বাড়ে। ফলে মানুষের মনোযোগ আজ বৈশ্বিক বাজারে কেনাবেচার একটি সম্পদে পরিণত হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় শিকার তরুণ প্রজন্মের পাঠাভ্যাস।.বাংলাদেশে বই পড়ার প্রবণতা কমছে—এমন অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু এই পরিবর্তনকে কেবল ‘মোবাইলের নেশা’ বলে ব্যাখ্যা করলে বাস্তবতার গভীরে পৌঁছানো যায় না। প্রশ্ন হলো, তরুণেরা কি বই পড়তে চায় না, নাকি এমন একটি ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে বইয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার সুযোগই নেই?আজকের একজন তরুণ প্রতিদিন শত শত নোটিফিকেশন, রিল, শর্ট ভিডিও ও অ্যালগরিদম-নির্ধারিত কনটেন্টের মুখোমুখি হচ্ছে। কয়েক সেকেন্ড অন্তর নতুন উদ্দীপনা পাওয়ার এই সংস্কৃতি মস্তিষ্ককে দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। একটি উপন্যাস বা গবেষণাধর্মী বই যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মনোযোগ দাবি করে, সেখানে ৩০ সেকেন্ডের ভিডিও তাৎক্ষণিক আনন্দের প্রতিশ্রুতি দেয়। ফলে পাঠ আর কেবল ব্যক্তিগত অভ্যাসের বিষয় নয়; এটি একটি অসম অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ।.বই পড়া কমে যাওয়া কেবল একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন নয়; এটি একটি জ্ঞানগত সংকট। যে সমাজ দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না, সে সমাজ গভীরভাবে চিন্তা করতেও পারে না। আর যে সমাজ গভীরভাবে চিন্তা করতে পারে না, তার পক্ষে জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনে এগিয়ে যাওয়াও কঠিন। তাই পাঠাভ্যাস ফিরিয়ে আনার লড়াই আসলে শুধু বইয়ের জন্য নয়; এটি ভবিষ্যতের চিন্তাশীল নাগরিক গড়ে তোলার লড়াই।.ইউনেসকোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট এবং বিভিন্ন শিক্ষা গবেষণায় দেখা গেছে, শ্রেণিকক্ষে স্মার্টফোন ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও শিক্ষাগত অর্জন বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। একইভাবে নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স ও কানাডার বিভিন্ন অঞ্চলে স্কুলে মুঠোফোন নিষিদ্ধ করার পর শ্রেণিকক্ষের শৃঙ্খলা, শিক্ষার্থী-শিক্ষক যোগাযোগ এবং শেখার পরিবেশের উন্নতি লক্ষ করা গেছে। যুক্তরাজ্যও কিশোর-কিশোরীদের রাতের বেলা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছে, কারণ পর্যাপ্ত ঘুম শেখার সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এই নীতিগত পরিবর্তন একটি বিষয় পরিষ্কার করে—এটি কেবল প্রযুক্তির প্রশ্ন নয়; এটি মনোযোগ রক্ষার প্রশ্ন। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশ সীমিত করার আইন করেছে। চীন অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ‘অ্যান্টি-অ্যাডিকশন’ ব্যবস্থা চালু করেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ স্কুলে ব্যক্তিগত ফোন ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। কারণ, তারা বুঝতে পেরেছে, মনোযোগ হারালে শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সম্পর্ক—সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু বাংলাদেশ এ বিষয়ে কী করছে?.বাংলাদেশে পরিস্থিতি আসলে বেশ জটিল। এখানে ডিজিটাল আসক্তির পাশাপাশি পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা পাঠাভ্যাসের অন্যতম বড় শত্রু। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীকে বই ভালোবাসতে শেখায় না; শেখায় পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট অংশ মুখস্থ করতে। পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পড়া অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছে পরীক্ষার সঙ্গে সম্পর্কহীন একটি কাজ। ফলে পরীক্ষা শেষ হলে বইও শেষ। জ্ঞান অর্জনের আনন্দের পরিবর্তে শিক্ষা হয়ে ওঠে একটি প্রতিযোগিতা।এই পরিবর্তনকে নৃবৈজ্ঞানিকভাবে দেখলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিয়ো শিক্ষা ও পাঠকে সাংস্কৃতিক পুঁজি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। পরিবারে বই পড়ার পরিবেশ, আলোচনা, সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ একজন শিশুর মানসিক জগৎ গড়ে তোলে। কিন্তু আজ বহু পরিবারে বইয়ের তাকের জায়গা দখল করেছে স্মার্টফোনের পর্দা। শিশুরা বড় হচ্ছে এমন এক পরিবেশে, যেখানে অবসরের অর্থ বই নয়, বরং স্ক্রল করা। ফলে পাঠাভ্যাস শুধু ব্যক্তিগত পছন্দ নয়; এটি সামাজিক পরিবেশেরও প্রতিফলন।অন্যদিকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যালগরিদম ব্যবহার করছে। প্রতিটি ভিডিও, প্রতিটি নোটিফিকেশন এবং প্রতিটি ‘রিকমেন্ডেশন’ এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে ব্যবহারকারী আরও কিছুক্ষণ অনলাইনে থাকে। অর্থাৎ পাঠকের প্রতিপক্ষ কেবল একটি মুঠোফোন নয়; বরং শত শত বিলিয়ন ডলারের একটি বৈশ্বিক শিল্প, যার ব্যবসায়িক মডেলই মানুষের মনোযোগ বিক্রি করা। নেটফ্লিক্সের দ্য সোশ্যাল ডিলেমা (২০২০) প্রামাণ্যচিত্রে গুগল, ফেসবুক ও টুইটারের সাবেক কর্মকর্তারা দেখিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যাতে ব্যবহারকারী যত বেশি সময় স্ক্রিনে থাকে, কোম্পানির মুনাফা তত বাড়ে। অর্থাৎ এই অর্থনীতির মূল পণ্য মানুষের তথ্য নয়; তার মনোযোগ।.তবে সমাধান প্রযুক্তির বিরোধিতা নয়। ডিজিটাল যুগে বই ও প্রযুক্তির সহাবস্থানই বাস্তবসম্মত পথ। স্কুলে মুঠোফোন ব্যবহারের স্পষ্ট নীতিমালা, পরিবারে নির্দিষ্ট ‘স্ক্রিন-ফ্রি’ সময়, পাঠাগার ও পাঠচক্রের বিস্তার, বইমুখী সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষার পরিবর্তে অনুসন্ধানী শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ‘ডিজিটাল সাক্ষরতা’ শেখাতে হবে, যাতে তারা প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, কিন্তু প্রযুক্তি তাদের ব্যবহার করবে না।বই পড়া কমে যাওয়া কেবল একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন নয়; এটি একটি জ্ঞানগত সংকট। যে সমাজ দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না, সে সমাজ গভীরভাবে চিন্তা করতেও পারে না। আর যে সমাজ গভীরভাবে চিন্তা করতে পারে না, তার পক্ষে জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনে এগিয়ে যাওয়াও কঠিন। তাই পাঠাভ্যাস ফিরিয়ে আনার লড়াই আসলে শুধু বইয়ের জন্য নয়; এটি ভবিষ্যতের চিন্তাশীল নাগরিক গড়ে তোলার লড়াই।মাহ্ফুজ সরকার: শিক্ষক ও লেখক*মতামত লেখকের নিজস্ব

Source: https://www.prothomalo.com/opinion/column/jppo069de3

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মনিপুর উচ্চবিদ্যালয়ে বাংলা ও ইংলিশ ভার্সনে নার্সারি–নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী ভর্তি

১

হরমুজ প্রণালিতে মাইন বিস্ফোরণে চার তেলবাহী জাহাজে আগুন

২

বাংলাদেশের আকাশে এক টুকরা কাঞ্চনজঙ্ঘা

৩

টুথপেস্ট আবিষ্কারের আগে মানুষ যেসব বিচিত্র জিনিস দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করত

৪

ক্ষমতা হারানোর ভয়েই কি আরব দলগুলোর ওপর আক্রমণ বাড়িয়েছেন নেতানিয়াহু

৫

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে বড় নিয়োগ হচ্ছে

৬

গায়ে পা লাগলে ‘সালাম’ করা: প্রথা নাকি বিধান

৭

রাজধানীর গুলশান থানা এলাকায় জমজমাট জুয়ার আসর ?

৮

জাপানে চার দিনের সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী

৯

হানিফসহ চার আসামির অপরাধ কী, মৃত্যুদণ্ড ছাড়াও তাঁরা কী কী সাজা পেলেন

১০

নারীর ক্ষমতায়নে ধর্মের অপব্যাখ্যা ও পুরুষতন্ত্র এখনো বড় চ্যালেঞ্জ: জহির উদ্দিন স্বপন

১১

বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে রহস্য

১২

নিহত ছাত্রদল নেতার বাড়িতে গিয়ে বিচারের আশ্বাস দিলেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী

১৩

হোগলাবুনিয়া থেকে তাসভির…

১৪

রং, নকশা, বুননে প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম

১৫

নেতানিয়াহুর জোট ছেড়ে বিরোধী জোটে যেতে আগ্রহী ইউটিজে

১৬

সরকার চাইলেই কি টাকা ছাপাতে পারে

১৭

ব্রহ্মপুত্রের বুকেই তৈরি হচ্ছে খেলার মাঠ, প্রতিবাদ পরিবেশকর্মীদের

১৮

ঘরোয়াভাবে কাবিন হয়েছিল, বিয়ের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে, তার আগেই বর্ষার মৃত্যু

১৯

গবেষণার তথ্য: ফেসবুক ও মেসেঞ্জারে নারীর প্রতি সহিংসতা বেশি

২০