২৬ জুলাই ২০২৬, ৬:০০ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

‘দাদার–বাবার নাম ভুলে যাওয়ার রাজনীতি’: মুসলমানিত্বের সঙ্গে বাঙালিত্ববাদের বোঝাপড়া

সারকথাপ্রবন্ধটি বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের সংকট, ঐতিহাসিক বিবর্তন ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের এক গভীর সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। আধুনিক জিনতাত্ত্বিক গবেষণায় প্রমাণিত যে, ধর্মীয় ভিন্নতা সত্ত্বেও বাঙালি হিন্দু ও মুসলিমদের জেনেটিক ভিত্তি সম্পূর্ণ অভিন্ন এবং মুসলিমদের সরাসরি বিদেশি বংশোদ্ভূত হওয়ার ঐতিহাসিক দাবিটি অবৈজ্ঞানিক। ঐতিহাসিকভাবে ‘আশরাফ’ বা অভিজাত শ্রেণির সামাজিক অবজ্ঞা ও বঞ্চনা থেকে বাঁচতে সাধারণ ‘আতরাফ’ বা নিম্নবর্গের বাঙালি মুসলিমরা একধরনের সুপরিকল্পিত ‘বিস্মৃতির রাজনীতি’ বা কালচারাল অ্যামনেসিয়ার আশ্রয় নেয়। নিজেদের স্থানীয় পূর্বপুরুষের নাম ও পেশাগত পদবি সজ্ঞানে মুছে ফেলে তারা ‘শেখ’ পদবি গ্রহণ বা নামের শুরুতে ‘মোহাম্মদ’ যুক্ত করার মাধ্যমে একটি কাল্পনিক আভিজাত্য ও বৃহত্তর বৈশ্বিক ইসলামি পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছে, যা বর্তমানে তাদের নানা আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার মুখে ফেলছে। প্রবন্ধটিতে আরও বিশ্লেষণ করা হয়েছে, ঔপনিবেশিক আমলের কলকাতাকেন্দ্রিক বাবু সংস্কৃতি এবং পরবর্তীকালে ভাষাভিত্তিক সেক্যুলার ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ বনাম ধর্ম ও ভূখণ্ডভিত্তিক ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এই পরিচয়ের সংকটকে আরও ঘনীভূত করে তুলেছে। পরিশেষে লেখক একটি ‘উত্তর-জাতীয়তাবাদী’ রাষ্ট্রকল্পের প্রস্তাব করেছেন, যেখানে মুসলমানিত্ব ও বাঙালিত্ব একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। তিনি মনে করেন, নিজেদের প্রকৃত নৃতাত্ত্বিক শিকড় ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারকে অস্বীকার না করে, বরং তা সগৌরবে স্বীকার করে নেওয়ার মাধ্যমেই বাঙালি মুসলিম সমাজের এই দীর্ঘস্থায়ী আত্মপরিচয়-সংকটের অবসান এবং একটি সাম্যবাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যৎ সমাজ গঠন করা সম্ভব। ভূমিকাশ্রেণিকক্ষে সাংস্কৃতিক ঐতিহ‍্য ও ইতিহাস নির্মাণের রাজনীতির আলাপে একটি বিষয় প্রায়ই জানতে চাই—কে কে তাঁর ‘দাদার–বাবার নাম জানেন’। এর জবাবে ৩০ থেকে ৪০ জনের ভেতরে ৫ থেকে ৭ জন জানেন বলে হাত উত্তোলন করেন। তার মানে সিংহভাগই জানেন না। এখানে কেন্দ্রীয় বিষয় হলে প্রশ্নকর্তা হিসেবে আমি নিজেসহ সিংহভাগই দাদার–বাবার নাম জানি না। এখন প্রশ্ন হলো, এই না জানাটা কি একটি সাধারণ বিস্মৃতি, নাকি রাজনৈতিক অ্যামনেসিয়া? যদিও ফরাসি দার্শনিক আর্নেস্ট রেনান তাঁর ১৮৮২ সালের ‘হোয়াট ইজ আ নেশন’ নামক বিখ্যাত বক্তৃতায় প্রথম এই রাজনৈতিক অ্যামনেসিয়া বা ভুলে যাওয়ার প্রকল্পের বীজ বপন করেন। তাঁর মতে, জাতি গঠনের জন্য অতীতকে নিখুঁতভাবে স্মরণ রাখার চেয়ে অতীতকে ভুলে যাওয়া বেশি জরুরি। বিশেষত, প্রাচীনকালের জাতিগত সংঘাত, যুদ্ধ, রক্তপাত ও বিভেদকে ভুলে গিয়েই একটি সমাজ ঐক্যবদ্ধ হয় (রেনান ১৮৮২: ৫১-৬০)। অর্থাৎ সংঘাতময় বাস্তব অতীতের ‘অনুপস্থিতি’ বা সেটিকে যৌথ স্মৃতি থেকে মুছে ফেলাই আধুনিক জাতীয়তাবাদের প্রধান শর্ত। এখন প্রশ্ন করা যেতে পারে যে পরিচয়ের উত্তরাধিকারকে ভুলে যাওয়া জরুরি কি না? অথবা জাতীয়তাবাদের হাত ধরে একমুখী পরিচয় নির্মাণও কতটা ভয়াবহ হতে পারে? এ ব‍্যাপারে অমর্ত‍্য সেন আইডেন্টিটি অ্যান্ড ভায়োলেন্স: দ্য ইলিউশন অব ডেসটিনি (২০০৬) বইয়ে ‘সলিটারিস্ট আইডেন্টিটি’ বা ‘একমুখী পরিচয়ের’ ধারণাকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন, ‘কোনো মানুষকে যদি বলা হয় সে কেবল “মুসলমান” বা কেবল “হিন্দু”, তবে তার অন্যান্য মানবিক পরিচয় আড়াল হয়ে যায়। আমাদের পরিচয় স্থির কোনো বস্তু নয়; বরং এটি নির্বাচনের বিষয়। একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে বাঙালি, ভারতীয়, একজন অভিভাবক, একজন পেশাজীবী এবং একজন বিশ্বনাগরিক হতে পারেন। যখন রাজনৈতিক বা সামাজিক শক্তি মানুষকে কেবল একটি পরিচয়ে আটকে দেয়, তখন সেটি “আমরা” বনাম “তারা” বিভাজন তৈরি করে, যা শেষ পর্যন্ত সহিংসতার জন্ম দেয়’ (সেন ২০০৬: ১৫-২০)।তবে বাংলাদেশের বর্তমান বাংলাদেশপন্থী মানুষের পরিচয়কে একরৈখিক মুসলমানিকরণের প্রকল্পে একটি ধর্মনির্ভর জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হচ্ছে। এ বিষয়টা বোঝা যেতে পারে ইতিহাসবিদ এরিক হবসবাউমের কাজের ভেতর থেকে। যেখানে তিনি দেখিয়েছেন, ‘যখন আধুনিক রাষ্ট্রগুলো দ্রুত আধুনিকায়ন বা শিল্পায়নের মধ্য দিয়ে যায়, তখন মানুষের পুরোনো জীবনযাত্রার সঙ্গে তাদের একটি বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়। সেখানে প্রকৃত অতীতের একটি “অনুপস্থিতি” বা শূন্যতা দেখা দেয়। এই শূন্যতা পূরণের জন্য রাজনৈতিক শাসকগোষ্ঠী বা এলিটরা সম্পূর্ণ নতুন কিছু প্রথা তৈরি করে এবং সেগুলোকে “প্রাচীন” বা “সনাতন” বলে দাবি করে’ (হবসবাউম ১৯৮৩: ১-১৪)। হবসবাউম একে বলেছেন ইনভেনশন অব ট্র্যাডিশন। যখন প্রকৃত অতীত অনুপস্থিত থাকে, তখন জাতীয়তাবাদের স্বার্থে নতুন করে একটি ‘গৌরবময় অতীত’ উদ্ভাবন করা হয়। বাংলাদেশে বৈশাখ উদ্‌যাপন রাস্ট্রীয়ভাবে করাকে এই উদ্ভাবন হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে জাতীয়তাবাদের এ ধরনের যাত্রায় নিজের উত্তরাধিকারের পরিচয়কে ভুলে যাওয়ার প্রকল্পের উদাহরণ অন‍্যত্র খুব একটা পাওয়া যাবে কি না, তা আরেক খুঁজে দেখার বিষয়। জীবন্ত ঐতিহ‍্যের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখতে হলে উত্তরাধিকার হতে হয়। এই ভুলে যাওয়ার রাজনীতি অতীত ঐতিহ্যের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে। বিচ্ছিন্নতা নির্মাণ করে নিজের পূর্বজদের ইসলাম গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত যে পরিচয় ছিল, তার সঙ্গে। এ বিচ্ছিন্নতা জমিন ও সংস্কৃতির সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা স্থাপন করে। এর পাশাপাশি ইতিহাসকে এমনভাবে লেখা ও পড়ানো হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে, যা এ অঞ্চলের মানুষকে, বিশেষ করে ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন তরিকার মানুষকে বিচ্ছিন্ন করছে সামগ্রিক সাংস্কৃতিক আচরণ ও তার পরম্পরা থেকে। আমি আমার অপর একটি বই ‘বাঙালিত্ববাদ’–এ (ইমরান ২০১৫) বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলাপের সূত্রপাত করেছি। এখানে সংস্কৃতির একটি সমগ্র নির্মাণ করে তার ওপর জাতীয়তার পরিচয়কে স্থাপন করা হয়েছে।আর্নেস্ট গেলনারের মতে, ‘জাতীয়তাবাদ কোনো সুপ্ত বা প্রাচীন জাতিকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে না; বরং যেখানে জাতির কোনো অস্তিত্বই ছিল না, সেখানে জাতীয়তাবাদ নতুন করে জাতির জন্ম দেয়। কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে শিল্পভিত্তিক সমাজে উত্তরণের সময় পুরোনো সমাজকাঠামো ভেঙে যায় এবং রাষ্ট্রের টিকে থাকার জন্য এক নতুন সমজাতীয় সংস্কৃতির দরকার হয়। অতীতের এই প্রকৃত সংযোগের অনুপস্থিতিই আধুনিক জাতীয়তাবাদী চেতনার জন্ম দেয়’(গেলনার ১৯৮৩: ১-১৪)।‘অতীতের অনুপস্থিতি’ তত্ত্ব আমাদের শেখায় যে জাতীয়তাবাদ কোনো প্রাচীন বা শাশ্বত প্রাকৃতিক বিষয় নয়। এটি একটি আধুনিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নির্মাণ। যখন একটি সমাজের নিজস্ব ঐতিহাসিক শিকড় দুর্বল হয়ে পড়ে বা আধুনিকতার প্রভাবে মুছে যায়, তখন সেই অনুপস্থিত অতীতকেই রোমান্টিসাইজ করে অথবা নতুন কল্পনার রঙে সাজিয়ে জাতীয়তাবাদের ভিত শক্ত করা হয়। রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐক্যের প্রয়োজনে একটি সমাজ তার অতীতকে কতটা মনে রেখেছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সে তার অতীতকে কতটা ভুলেছে বা নতুন করে সাজিয়েছে।একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের সংকটে ‘জাতীয়তাবাদ–উত্তর রাষ্ট্রকল্প’ বা পোস্টন্যাশনালিস্ট স্টেট ইমাজিনারি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক কাঠামো হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে, যেখানে ধর্মীয় এবং নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের সংঘাত ঐতিহাসিককাল থেকেই বিদ্যমান, সেখানে ‘মুসলমানিত্ব’ এবং ‘বাঙালিত্ববাদের’ পারস্পরিক বোঝাপড়া বা দর–কষাকষি একটি জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে। জাতীয়তাবাদের প্রথাগত ধারণাগুলো যখন আধুনিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে সংকীর্ণ হয়ে পড়ে, তখন সমাজ ও রাজনীতির গভীরে পরিচয়তত্ত্বের এক নতুন পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয় (সিং ২০০১)।মূলত ঐতিহাসিক জাতীয়তাবাদী হেজিমনিক প্রকল্পসমূহ জুতসই তাত্ত্বিক কাঠামোর ওপর না দাঁড়ানোর কারণে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানও খারিজি প্রকল্পের ভেতর ঢুকে পড়েছে। নিজের হেজিমনিক প্রকল্পে নিজেই হেজিমনাইজড হয়ে পড়েছে। এই অভ্যুত্থান কি কোনো তাত্ত্বিক কাঠামো নিয়ে হাজির হয়েছে? না হয়নি। তবে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিষ্ঠিত একদলীয় একরৈখিক বয়ানকে এবড়োথেবড়োভাবে খারিজ করছে। উদাহরণ হিসেবে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধুর ভাষণ খারিজ করার চেষ্টা থেকে আমরা এটা বুঝতে পারি। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকে তার নিজের অর্গানাইজড কোনো বয়ান নিয়ে হাজির হতে দেখি না। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিস্তৃত পরিসরে সব এজেন্সির উপস্থিতি নিশ্চিত করার ভেতর থেকে অতীতের পুনঃবিবরণ নির্মাণ ব্যতিরেকে এ ধরনের মুড়মুড়ে রাজনীতি করা হয়েছে ১৯৭৫–উত্তর বাংলাদেশে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে ভূখণ্ডকেন্দ্রিক বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, যা বর্তমানে বাংলাদেশপন্থা হিসেবে হাজির হয়েছে, তা একধরনের ব্যাখ্যাহীন জাতীয়তাবাদ। সেখানে ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’–এর (অর্থাৎ বর্ষবরণ যাত্রায় সাংস্কৃতিক মোটিফের ক্ষেত্রে প‍্যাঁচাকে বাদ দিয়ে মুরগ উদ্‌যাপন করা হয়েছে) মতো তত্ত্বায়নের চেষ্টা করলেন অনেকে, যা আজও কোনো একটি একক চেহারায় হাজির হয়নি।জুলাই গণ–অভ্যুত্থান বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছিল। অনেকে বলেছিল, এটা একটা নতুন বাংলাদেশ বা আবারও স্বাধীনতা অর্জন বা চেতনা-রাজনীতিমুক্ত দেশ বা জাতীয়তাবাদী রাজনীতিমুক্ত বাংলাদেশ বা সবার অংশগ্রহণমূলক বাংলাদেশ; অর্থাৎ সব মত-পথের অংশগ্রহণের বাংলাদেশ। তাহলে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারণাকল্পের অধীনে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সাল অব্দি, তা বাংলাদেশের সব অংশীজনের সংস্কৃতিকে একাঙ্গীকরণে ব্যর্থ হয়েছে। এ জনযুদ্ধ আগের রাজনৈতিক প্রকল্পকে অস্বীকার করেছে রাজনৈতিকভাবে একাঙ্গীকরণের ব্যর্থতার কারণে। যদিও অমর্ত‍্য সেন দ্বি–জাতিতত্ত্বের অধীনে দেশভাগের বিভাজনকে সমালোচনা করে বলেন, ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের সম্পত্তি নয়; বরং এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ধারণা। তিনি মধ্যযুগের সুফি ও বৈষ্ণব পদাবলি থেকে শুরু করে লালন শাহর গানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এই সমন্বয়ী চেতনাকে বাঙালির আসল শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেন। তবে সেন মুসলিম বা হিন্দুদের নিজেদের ভেতরকার বিভাজনকে বুঝতে চেষ্টা করেননি (সেন ২০০৬)।মুসলিমদের ভেতরে এ প্রবণতাগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করে ফরায়েজি আন্দোলনের ভেতর থেকে। সাতচল্লিশ–উত্তর পূর্ব বাংলায় এসব বিভাজনরেখা আরও স্থূল হতে থাকে। এর পরণতি বলা যেতে পারে আজকের বাংলাদেশ পন্থা; অর্থাৎ ধর্মনির্ভর মুসলিম জাতীয়তাবাদ এবং ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ মোটাদাগে একে অপরকে খারিজ করে দাঁড়াতে চেষ্টা করেছে। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি কি অপরাপর জাতিসত্তাকে নিয়ে ভেবেছে? একদমই ভাবেনি। এই প্রবণতা আমরা পশ্চিমাদের কাছ থেকেই আত্মস্থ করেছি। সতেরো শতকের মধ্যভাগে (১৬৪৮) ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তির ভেতর থেকে পৃথিবীতে যেসব ধর্মনির্ভর জাতি-রাষ্ট্র গঠিত হয়, তার প্রধানতম বিষয় ছিল পরমতসহিষ্ণুতা। তবে এই ‘সহিষ্ণুতা’র ঘটনাটি সক্রিয় হয় ক্রিশিয়ানিটির ভেতরের বিবদমান মত ও পথের মানুষের ভেতরের সহিষ্ণুতার প্রশ্নে। এ কারণে এই উদ্যোগ আজ পর্যন্ত সমাদৃত। তবে আমরা একটু বাড়তি মনোযোগী হলে দেখতে পাব, চুক্তিটি ক্রিশিয়ানিটির বাইরে যে ইসলাম, জায়নবাদসহ অপরাপর ধর্মীয় গোষ্ঠী, তাদের প্রতি সহিষ্ণুতা নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট মতামত হাজির করেনি। এটি সম্পূর্ণরূপে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মমতের ভিত্তিতে জাতি-রাষ্ট্র নির্মাণ করাকেই উৎসাহিত করেছে। এমনকি জাতীয় চরিত্র নির্মাণে সংখ্যালঘিষ্ঠসহ যারা তাদের ভেতরে একেবারে অপ্রধান, সেই অপরাপর ধর্মীয় ও জাতিগত অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেনি।মোটামুটি ম্যাক্স ওয়েবার (১৯৭৮), ডব্লিউ কননোর (১৯৯৪), এম হেক্টর (২০০০) প্রমুখ প্রখ্যাত চিন্তাবিদও মনে করেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মতামতের ভিত্তিতেই রাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতি গঠিত হবে। ভারতবর্ষের রাজনীতিও প্রশিক্ষিত হয়েছিল এই জ্ঞানতাত্ত্বিক পাটাতনের ওপর। এখানেও একইভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠের রাজনীতির মনস্তত্ত্ব প্রভাবশালী হয়ে পড়ে। মুসলিম লীগ ১৯৪৭-পূর্ব সময়ে দুবার নির্বাচনে বিজয় লাভ করলেও তার ভোটারদের বুঝতে ভুল করেছিল। ভোটের প্রকৃত এলাকার ভিত্তিতে ভোটারের ধর্মীয় ও জাতিগত ভিন্নতাকে বোঝার ব্যর্থতাস্বরূপ তারা নিজেকে কেবল মুসলিম হিসেবেই বিবেচনা করেছিল। দলটি দলিতদের অধিকারের লড়াই থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। ভারতবর্ষ ভাগ হয় ধর্মনির্ভর দ্বি–জাতিতত্ত্বের ভিত্ত্বিতে। ’৪৭-পরবর্তী রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক ভাবনা ধর্মকে সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে। এই বিচ্ছিন্নতার প্রয়োগ ঘটে মূলত খারিজি অর্থে। ধর্মের ক্ষেত্রে আবার আশরাফ, আতরাফ ও আজলাফের ভিন্নতার সংস্কৃতি সমাজে প্রকট হতে থাকে, যখন পাকিস্তানের পূর্ব অংশে ধর্মনির্ভর জাতীয়তাবাদ দুর্বল হয়ে পড়ে।বাঙালি মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয় নির্মাণের ইতিহাস এক জটিল ও বহুমুখী প্রক্রিয়া, যা ধর্মীয় আদর্শ, ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামো এবং স্থানীয় আর্থসামাজিক স্তরবিন্যাসের টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে। এই বিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে ‘আশরাফ’ ও ‘আতরাফ’ বা ‘আজলাফ’ নামক দুটি বিপরীতমুখী সামাজিক মেরুকরণ। এই বিভাজন কেবল শ্রেণিগত নয়, বরং এটি একটি নৃ–বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বয়ানও বটে (খান ২০১৭)। বাঙালি আতরাফ বা নিম্নবর্গের মুসলিমদের মধ্যে নিজেদের প্রকৃত বংশীয় ইতিহাস বা ‘দাদার বাবার নাম’ ভুলে যাওয়ার যে প্রবণতা লক্ষ করা যায়, তা কোনো আকস্মিক স্মৃতিভ্রংশ নয়; বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত এবং সচেতন ‘বিস্মৃতির রাজনীতি’ (ইসলাম ২০২৫)। এই বিস্মৃতির সমান্তরালে নামের শুরুতে ‘মোহাম্মদ’ বা তার সংক্ষিপ্ত রূপ ‘মো.’ ব্যবহারের যে ব্যাপক প্রচলন ঘটেছে, তা একটি বৈশ্বিক ও একীভূত মুসলিম পরিচিতি লাভের আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করে। এটি একই সঙ্গে স্থানীয় বর্ণগত বা পেশাগত পরিচয়কে আড়াল করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।অপর দিকে উনিশ শতকের বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ‘বাবু সংস্কৃতি’। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে কলকাতাকেন্দ্রিক যে শিক্ষিত মধ্যবিত্তশ্রেণির উদ্ভব ঘটেছিল, তাদের জীবনধারা, মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিই মূলত এই সংস্কৃতির ভিত্তি (সেনগুপ্ত ২০২২; রয় ২০২২; সার্টোরি ২০০৮; টেন্ডফোলাইন ২০২১) । তবে এই বাবু সংস্কৃতি কেবল হিন্দু ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি বাংলার মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ শ্রেণিবিভাগ এবং পরবর্তীকালে ‘ঘটি’ ও ‘বাঙাল’ বিভাজনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিন্যাসেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল (হাশমি ২০০০)। বাংলার মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশ যখন ঔপনিবেশিক আধুনিকতাকে গ্রহণ করতে শুরু করে, তখন তাদের মধ্যেও একটি ‘ভদ্রলোক’ বা ‘বাবু’সুলভ আচরণের বিকাশ ঘটে, যা মূলত পশ্চিম বাংলার (ঘটি) এবং পূর্ব বাংলার (বাঙাল) মুসলিমদের মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক দূরত্বের সৃষ্টি করে (চ্যাটার্জি ১৯৯৪)।পশ্চিমা এনলাইনটেনমেন্টের সময় সেক্যুলারিজম ও লিবারালিজম ধারণায় ধর্মকে প্রাইভেট বিষয়ে পরিণত করে এবং তা পরিগণিত হয় একটি সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি হিসেবে। বিষয়টি ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ বুঝতে ব্যর্থ হয়। এই ফাঁকার ভেতর থেকে পাকিস্তানের পূর্ব পাশে ভাষানির্ভর সংস্কৃতি প্রধান হয়ে ওঠে। সাবজেকটিভলি যা সংহতি, আত্মসচেতনতা ও আনুগত্যের মতো বিষয়সমূহকে তাড়িত করে একটি সংঘবদ্ধতা নির্মাণকল্পে। এই ভাষানির্ভর জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের সংস্কৃতি থেকে ধর্মকে অনুল্লেখ্য করে তোলে, ’৭১-পরবর্তী বাংলাদেশে যা ‘খারিজীকরণের’ প্রক্রিয়ার ভেতরে যুক্ত হয়। এসব পাল্টাপাল্টি খারিজীকরণের চূড়ান্তরূপ হিসেবে ২০১৩ সালে দেশ বিভাজিত হয়ে পড়ে ‘শাহবাগ’ ও ‘শাপলাচত্বর’-এ। বলা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থান একীভূত করে এই দুই চত্বরকে। এ কথা বলাই যেতে পারে যে নিপীড়িত মানুষমাত্রই নিপীড়িত হওয়ার ভেতর থেকে ঐক্য বোধ করে। এর পাশাপাশি একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্নের উদয় হয়, নিপীড়িত মানুষমাত্রই কি সাংস্কৃতিক বোধের জায়গা থেকে একীভূত বোধ করবে? একীভূত হওয়ার ক্ষেত্রে একই শত্রুকে পাল্টা–আক্রমণ করাটা প্রধান হয়ে গিয়েছিল আন্দোলনের সময়ে। আন্দোলন এবং আন্দোলনোত্তরকালে এ দেশের ধর্মীয়, জাতিগতসহ নানামাত্রিক মতাদর্শের অস্তিত্বকে জেগে উঠতে দেখতে পাই, যা আজও প্রবলভাবে সক্রিয়। এসব সক্রিয় সত্তার অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একটি আগামীর বাংলাদেশ গড়ে ওঠা জরুরি। যে কারণে বাংলা অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া আবশ্যক।সাংস্কৃতিক বোঝাপড়ার পাশাপাশি ২০১৯ সাল থেকে ডিএনএর জিনতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ভেতর থেকে বাংলা অঞ্চলের তথাকথিত বাঙালি হয়ে ওঠার সংখ‍্যাগরিষ্ঠের এই ভূখণ্ডের অপরাপর জাতিসত্তার মানুষদের থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে দেখানোর কৌশলকে একটি বড় ধাক্কা দিয়েছে। বঙ্গীয় বদ্বীপের জনতাত্ত্বিক ইতিহাস ও জেনেটিক গঠন বিশ্বের অন্যতম জটিল ও কৌতূহলোদ্দীপক। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর বিধৌত এই উর্বর ভূখণ্ড হাজার বছর ধরে বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে (শ এবং অন‍্যান‍্য ২০০৯)। এই অঞ্চলের মানুষের জেনেটিক পরিচয় কেবল তাদের আদিম অভিবাসন প্রক্রিয়ারই প্রতিচ্ছবি নয়, বরং তা আধুনিক বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণেও একটি শক্তিশালী উপাদান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশি মুসলিম ও হিন্দু বাঙালিদের মধ্যে বিদ্যমান জেনেটিক সাযুজ্য বা বৈসাদৃশ্য এবং এই বৈজ্ঞানিক তথ্যের সঙ্গে রাজনৈতিক আদর্শের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত জরুরি (হেলাল ২০২৬)।আরেকটি প্রশ্ন উত্থাপন করা যেতে পারে, রাষ্ট্রের জন্য জাতীয়তাবাদ জরুরি কি না বা নেশনের ধারণা জাতীয়তাবাদকালের বাইরে কোনো গুরুত্ব বহন করে কি না? রাষ্ট্রের সংস্কৃতির বহুমাত্রিকতাকে গ্রহণ করে একটি জাতীয় ধারণা জরুরি কি না, তা–ও ভাবা প্রয়োজন। অমর্ত্য সেন বহুসংস্কৃতিবাদের প্রকৃত ধারণার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি তথাকথিত ‘বহু-একক সংস্কৃতিবাদ’-এর (Plural monoculturalism) কড়া সমালোচনা করেন, যেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ একই দেশে বাস করলেও একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকে এবং নিজেদের গণ্ডির বাইরে মেলামেশা করে না। তিনি এমন এক সমাজের কথা বলেন, যেখানে মানুষ তাদের বৈচিত্র্য বজায় রেখেও একে অপরের সঙ্গে সাংস্কৃতিকভাবে যুক্ত থাকবে এবং বৃহত্তর মানবিক পরিচয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে (সেন ২০০৬)। তবে বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের মড্যুলার-এর ধারণা খানিকটা বিপজ্জনক একরৈখিকতাকে উসকে দেয়, যা আমরা বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদের ক্ষেত্রে দেখতে পাই (অ্যান্ডারসন ২০০৬: ৬-৭)। তাঁর মতে, ‘জাতি হলো একটি “কল্পিত সম্প্রদায়”। ছাপাখানা ও পুঁজিবাদের বিকাশের ফলে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের মানুষ একই সংবাদপত্র বা সাহিত্য পড়তে শুরু করে। এর ফলে তারা নিজেদের মধ্যে এমন এক ঐক্যের কল্পনা করে, যা অতীতে বাস্তবে কখনোই ছিল না। প্রকৃত ঐতিহাসিক যোগসূত্রের এই অনুপস্থিতিই মানুষের কল্পনাশক্তিকে উসকে দেয় এবং একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয় তৈরি করতে সাহায্য করে’ (অ‍্যান্ডারসন ২০০৬: ৩৭-৪৬)। শেষ পর্যন্ত জাতীয়তাবাদ মূলত একরৈখিকতা নির্মাণ করে, যার চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে তা আমাদের একটি কানাগলিতে নিয়ে দাঁড় করায়। এই একাঙ্গীকরণে সব অংশীজনের অংশগ্রহণ সমান হবে কীভাবে, তার সুলুক-সন্ধান আবশ্যক। তার কারণ হলো, অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে দাতা-গ্রহীতার সম্পর্ক প্রবল হয়ে উঠলে সেই অংশগ্রহণও অন্যায্য হয়ে পড়বে।বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের রাজনীতির বিশ্লেষণ এবং এর সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক প্রভাবগুলোর ঐতিহাসিক বিবর্তন, বুদ্ধিবৃত্তিক সংঘাত, সাংবিধানিক সংকট এবং উত্তর-জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রকল্পে এর ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতির পর্যালোচনামূলক বিশ্লেষণই বর্তমান প্রবন্ধের কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয়।হাইফেনেটেড পরিচয়ের বহুমাত্রিকতা: তারুণ্যের জাতীয়-পরিচয়বাদী ভাবনাবাংলাদেশের বহুমাত্রিক জাতীয়তাবাদী পরিপ্রেক্ষিতে কীভাবে প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাস বিভাগের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের পরিচয় নির্ধারণ করেন, তা নিয়ে ২০১৪ থেকে ২০১৫ সালের সময়ে একটি শ্রেণিকক্ষভিত্তিক বোঝাপড়ার আলাপ পরিচালনা করি। এই আলাপে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তাঁদের জাতীয়তা সম্পর্কে ধারণা জানার জন্য সাধারণ ও অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে আলাপ জুড়ে দিই। নৃবিজ্ঞান এবং প্রত্নতত্ত্ববিষয়ক ক্লাসে আলোচনা চলাকালে তাঁদেরকে বলা হয়েছিল, এক পৃষ্ঠার মধ্যে নিজের জাতীয়তা কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন, তা লিখতে।আমাদের শ্রেণিকক্ষে স্বভাবতই শিক্ষার্থীদের ভেতর আদিবাসীদের সংখ‍্যা থাকে এক বা দুজন। তবে তাঁদের উত্তরগুলো ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আলাদা, যা বাংলাদেশের সংবিধানের চেতনার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উদাহরণস্বরূপ, সোহান গাজি তাঁর উত্তর দেন:‘আমি একজন মানুষ। জন্মসূত্রে মুসলিম, জৈবিকভাবে পুরুষ। পারিবারিক বংশাণুক্রমে গাজি। ভাষা, সংস্কৃতি ও রীতিতে বাঙালি এবং নাগরিকত্বের দিক থেকে বাংলাদেশি।’অন্য শিক্ষার্থীরা তাঁদের উত্তরগুলোতে বিভিন্ন মাত্রা যোগ করেন। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। রথী তালুকদার—যিনি নারী এবং বাঙালি হিন্দু হিসেবে নিজেকে চিহ্নিত করেন। একইভাবে, রিপন হাওলাদার—বাঙালি মুসলিম; মোরশেদ মোয়েন—মুসলিম বাঙালি; পিংকি রহমান—বাঙালি মুসলিম; দুলাল সমদ্দার—হিন্দু বাঙালি এবং বুলবুল ভূঁইয়া—বাংলাদেশি বাঙালি। অন্যদিকে আদিবাসী অংশগ্রহণকারীদের উত্তর ছিল এক শব্দে সীমাবদ্ধ এবং সরল। যেমন ‘চাকমা’, ‘মারমা’, ‘মুরং’।এই উত্তরগুলো বহুমাত্রিক সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে তুলে ধরে। বেশির ভাগ বাঙালি শিক্ষার্থী তাঁদের পরিচয় বর্ণনার সময় জাতীয়তা এবং ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংমিশ্রণ ব্যবহার করেন। যেমন বাঙালি মুসলিম বা বাঙালি হিন্দু। কিন্তু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উত্তরগুলো তাদের নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করেই সীমাবদ্ধ থাকে, যেখানে নাগরিকত্ব বা ধর্ম তাদের জাতীয়তার অংশ হয় না।এই বৈচিত্র্যময় উত্তরগুলো আমাদের দেখায় যে জাতীয়তার ধারণাটি এখনো অনেকের কাছে অস্পষ্ট। এটি কিছুটা উনিশ শতকের বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কল্পিত চরিত্র কামলাকান্তের মতো, যার দ্বিধাগ্রস্ত পরিচয়ের দিকটি আহমদ ছফা তাঁর ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। ছফা দেখিয়েছেন, কীভাবে বাঙালি মুসলমান পরিচয়টি পুঁথিসাহিত্যে আরব সংস্কৃতির আদলে তৈরি হলেও এর অন্তর্নিহিত চেতনা ও কার্যক্রম মূলত বাঙালি পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি এবং হিন্দু দেব-দেবী দ্বারা প্রভাবিত। এসব পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয়তার ধারণাটি আজও বহুমুখী এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে একক সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ নয়।ফাহীমের ভাষ্যে আহমেদ ছফার (২০১৩) বিশ্লেষণকে নিম্নরূপে ব্যাখ্যা করা হয়েছে:প্রথমত, পুঁথির লেখকদের মূল উদ্দেশ্য ছিলো বাংলায় ইসলামের মহানুভবতা তুলে ধরা। তারা মুসলিম নায়কদের অবিশ্বাস্যভাবে বীরত্বপূর্ণ কাজের মাধ্যমে এটি প্রদর্শন করতে চেয়েছিলেন। তারা মনে করতেন, এটি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে বেশি আবেদন সৃষ্টি করবে। দ্বিতীয়ত, এই পুঁথিগুলো যে সময়ে লেখা হয়েছিলো, তখন বাঙালি মুসলমানদের মানসিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব চলছিলো। এটি এমন একটি সময় ছিলো, যখন মুসলমানদের নতুন সামাজিক শ্রেণি এবং নিম্নবিত্ত শ্রেণির মধ্যে মূল্যবোধ এবং দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত দেখা যাচ্ছিল। ফলে এই নিম্নবিত্ত শ্রেণি পুঁথির নায়কদের মাধ্যমে তাদের আকাঙ্ক্ষাগুলোকে বাস্তবায়িত করে একধরনের মানসিক স্বস্তি খুঁজে পেত। তৃতীয়ত, পুঁথির লেখকরা ইসলামী সভ্যতার উৎপত্তি এবং আরবি-ফারসি ভাষার সম্পর্কে অনভিজ্ঞ ছিলেন। ইতিহাস এবং ভৌগোলিক সীমানার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা আধ্যাত্মিক ও সামাজিক উন্নয়নের ধারণা না থাকায় তারা এমন অপরিণত মিশ্র আখ্যান তৈরি করেছিলেন। চতুর্থত, এই লেখকরা অনেকেই নিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায় থেকে মুসলমান হয়েছিলেন। একসময় ব্রাহ্মণদের দ্বারা নিপীড়িত এই মানুষরা পরবর্তীতে মুসলিম নায়কদের মাধ্যমে ব্রাহ্মণদের পরাজয় দেখিয়ে এক ধরনের মানসিক প্রতিশোধ নিয়েছিলেন (শহীদ ২০১৩: ২৪৯) ।আরেকটি ধারণা হলো আত্মসচেতনতা। সাক্ষাৎকার চলাকালে লক্ষ করা গেছে যে অংশগ্রহণকারীরা বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের দ্বৈত রাজনৈতিক ধারা সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। এটি তাঁদের কাছে স্পষ্ট যে জাতীয় পরিচয় প্রায়ই রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে জড়িত। উদাহরণস্বরূপ, যাঁরা নিজেদের ‘বাঙালি’ বলে পরিচয় দেন, তাঁরা সাধারণত আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে বিবেচিত হন আর ‘বাংলাদেশি’ পরিচয় বিএনপির প্রতি আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়।বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের তিনটি ধারা রয়েছে: ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ এবং ভৌগোলিক সীমানাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। ফরহাদ মজহার বাঙালি বনাম বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে একটি প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠেছিলো বাঙালি জাতীয়তাবাদের আক্রমণাত্মক প্রচারণার প্রতিক্রিয়া হিসেবে, তবে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারেনি’ (মজহার ২০০৮: ৫৭)।সম্প্রতি শাহবাগ আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় হেফাজতে ইসলাম ‘আল্লাহু আকবর! তুমি কে, আমি কে? মুসলমান! মুসলমান!’ স্লোগানের মাধ্যমে মুসলমান জাতীয়তাবাদকে প্রকাশ্যে পুনর্জাগরিত করেছে।বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ নিয়ে ভাবতে গেলে একটা বিষয় খুব পরিষ্কার হয়ে যায়, দেশটি জাতীয়তাবাদের ধারণারই একরকম শিকার। জাতীয়তাবাদের ধারণা আমাদের জন্য বরং একটা ধাঁধার মতো। বিভিন্ন সময়ের প্রভাব, যেমন সমাজ আর রাজনীতির পরিস্থিতি, আমাদের চিন্তাভাবনা আর পরিচয়ের ওপর বড়সড় ছাপ ফেলেছে। সাক্ষাৎকারদাতাদের উত্তরগুলো সেই প্রভাবগুলোর প্রতিফলন বহন করে।অ্যান্ডারসনের ‘ইমাজিনড কমিউনিটি’ তত্ত্ব অনুযায়ী, জাতীয়তাবাদের ধারণা একটি ‘সমজাত শূন্য সময়’-এর মাধ্যমে গঠিত হয়। এটি এমন এক কাঠামো তৈরি করে, যেখানে ব্যক্তিরা নিজেদের কল্পিত একটি বৃহৎ সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে দেখতে পারে। জাতীয়তাবাদের এই ধারণা ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপট, শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাঠামো ও সামাজিক আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয় (অ‍্যান্ডারসন ২০০৬: ২৪-২৫) । বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অ্যান্ডারসন উল্লেখ করেছেন, জাতীয়তাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় ‘ব্যাকরণ’ হলো যেমন আদমশুমারি, মানচিত্র, ও জাদুঘর, যা যথাযথভাবে বিকশিত হয়নি। ফলে জাতীয় পরিচয় সম্পর্কে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দেয় এবং সাক্ষাৎকারে উত্তরদাতারা প্রায়ই আত্মনিয়ন্ত্রিত বা সতর্কতার সঙ্গে উত্তর দিয়েছেন, যেখানে তাঁরা দ্বৈত রাজনীতির বাইরে নিজেদের অবস্থান বোঝাতে চেয়েছেন (অ্যান্ডারসন ২০০৬: ১৬৩-১৮৫)।বিশ্বযুদ্ধের পর অভিবাসনের বৃদ্ধি, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে একটি ‘দ্বৈত’ বা ‘হাইফেনেটেড’ পরিচয়ের ধারণা তৈরি করে (যেমন আমেরিকান-বাংলাদেশি, ব্রিটিশ-বাংলাদেশি)। ব্রামসনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এ ধরনের দ্বৈত পরিচয় মূলত একটি সেতুর মতো কাজ করে, যা মূল জাতীয় পরিচয় এবং অভিবাসিত পরিচয়ের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে (ব্রামসন ১৯৮১: ৫৫)।বাংলাদেশে ‘দ্বৈত’ বা ‘হাইফেনেটেড’ পরিচয়ের ধারণা ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রভাব বিস্তার করেছে। মাঠপর্যায়ের গবেষণায় ও উন্মুক্ত আলাপের অংশে এটি স্পষ্ট হয়েছে, এ ধরনের পরিচয় গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। এটি ক্ষমতা ও জ্ঞানের সম্পর্কের পুনর্গঠনে সাহায্য করতে পারে এবং বিভিন্ন মত ও অংশগ্রহণকে একত্র করে একটি সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।আশরাফীকরণ, নামের রাজনীতি ও এমনেসিয়ার সমাজতত্ত্ববাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের সংকট বা দ্বৈততা কোনো সমসাময়িক বিষয় নয়, বরং এর শিকড় প্রোথিত রয়েছে মধ্যযুগীয় এবং ঔপনিবেশিক আমলের সামাজিক কাঠামোর মধ্যে। ঐতিহাসিকভাবেই বাঙালি মুসলমান সমাজ ‘আশরাফ’ ও ‘আতরাফ’—এই দুই প্রধান ভাগে বিভক্ত ছিল। আশরাফরা সাধারণত নিজেদের বিদেশি বংশোদ্ভূত (আরব, পারস্য বা তুর্কি) বলে দাবি করত এবং তারা উর্দু ভাষা ও উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতির অনুসারী ছিল (ইটন ১৯৯৩: ৩৪৩-৩৪৪)। অন্যদিকে আতরাফরা ছিল স্থানীয় বাঙালি, যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল এবং কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। এই বিভাজন কেবল সামাজিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে যখন আধুনিক শিক্ষা ও রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়, তখন বাঙালি মুসলমান সমাজ এই দ্বৈত পরিচয়ের সংকটে পড়ে। ১৮৭১ সালের আদমশুমারিতে বাঙালি মুসলমানদের বিশাল অংশকে নিম্নবর্ণের হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যা তৎকালীন মুসলমান অভিজাতদের মধ্যে এক ধরনের হীনম্মন্যতা ও পরিচয়ের সংকট তৈরি করে (আহমেদ ১৯৯৬)। এই সংকট থেকেই পরবর্তী সময়ে ‘ইমিগ্রেশন থিওরি’ বা অভিবাসন তত্ত্বের উদ্ভব ঘটে, যেখানে দাবি করা হয়, বাংলার মুসলমানরা কেবল স্থানীয়ভাবে ধর্মান্তরিত নয়, বরং তারা বিদেশি ভাগ্যান্বেষী ও ধর্ম প্রচারকদেরও বংশধর (ইটন ১৯৯৩: ৩০৪-৩০৬)। এই তত্ত্ব মূলত আশরাফ শ্রেণির রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা এবং নিজেদের বাঙালিত্বের চেয়ে মুসলমানত্বের দিকে বেশি ঝুঁকিয়ে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা ছিল।তবে এই অভিজাতদের আধিপত্যের সমান্তরালে একধরনের সিনক্রিটিক পরিচয়ও বিকশিত হচ্ছিল। বিশেষ করে সুফি সাধক ও পীরদের মাধ্যমে ইসলাম যখন বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা স্থানীয় লোকজ বিশ্বাস ও আচারের সঙ্গে মিশে এক অনন্য রূপ ধারণ করে (ইটন ১৯৯৩)। এখানে ইসলাম ধর্মীয় আচারের চেয়েও একটি জীবনপদ্ধতি হিসেবে স্থানীয় সংস্কৃতিকে ধারণ করেছিল, যেখানে একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে মুসলমান ও বাঙালি হিসেবে নিজের পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত (ইটন ১৯৯৩: ২৯৬-৩০০)।দক্ষিণ এশীয় মুসলিম সমাজের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত স্তরবিন্যাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আশরাফ শ্রেণি মূলত নিজেদের বিদেশি বংশোদ্ভূত বলে দাবি করত এবং তারা ছিল সমাজের উচ্চবিত্ত ও অভিজাত অংশ (ইটন ১৯৯৩: ২৬৮-২৭৮)। তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে উঠেছিল উর্দু ভাষা এবং একটি প্যান-ইসলামিক বা বিশ্বজনীন মুসলিম সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে, যা তাদের সাধারণ মানুষের থেকে আলাদা করে রাখত। এর বিপরীতে, আতরাফ বা আজলাফ গোষ্ঠী ছিল মূলত স্থানীয়ভাবে ধর্মান্তরিত কৃষক ও শ্রমজীবী শ্রেণি। তারা ঐতিহ্যগতভাবে বাংলা ভাষা এবং এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের লোকজ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে নিজেদের পরিচয় বজায় রেখেছিল (বাংলাপিডিয়া ২০২৬) । তবে এই দুই ধারার বাইরেও একটি সিনক্রিটিক পরিচয় বা সমন্বিত ধারা গড়ে উঠেছিল, যেখানে সুফি সাধক ও পীরদের প্রভাব ছিল অপরিসীম। ধর্ম ও স্থানীয় সংস্কৃতির এই মিলনের ফলে একটি সমন্বিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং লৌকিক ইসলামের জন্ম হয়, যা বাংলার সাধারণ মুসলিম মানসে ভাষা ও ধর্মের এক অনন্য সেতুবন্ধন তৈরি করেছিল (রয় ১৯৮৩: ৫৪-৫৬; ইটন ১৯৯৩: ২১৯-২২৫)।.ঐতিহাসিক স্তরবিন্যাস এবং আশরাফ-আতরাফ দ্বন্দ্বের উৎসবাংলার মুসলিম সমাজ ঐতিহাসিকভাবেই এক গভীর ও অনমনীয় স্তরবিন্যাসে বিভক্ত ছিল, যা ইসলামের তাত্ত্বিক সাম্যবাদের ধারণার সঙ্গে প্রায়ই সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দী ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিকেরা, যেমন উইলিয়াম হান্টার বাংলার বিশাল মুসলিম জনসংখ্যাকে প্রধানত দুটি শ্রেণিতে ভাগ করেছিলেন: আশরাফ ও আজলাফ (বা আতরাফ) (হান্টার ১৮৭১: ১৬৭-১৬৮)। হান্টার ও তাঁর সমসাময়িকদের মতে, পূর্ব ভারতের জলাভূমি অঞ্চলে মুসলিমদের এই বিপুল উপস্থিতির কারণ ছিল নিম্নবর্ণের হিন্দু সমাজ থেকে ব্যাপক ধর্মান্তকরণ! যদিও ইটন (১৯৯৩) তাঁর কাজে এ ধরনের ধর্মান্তকরণ তত্ত্বের সমালোচনা হাজির করেছেন।আশরাফ বলতে বোঝানো হতো সেই মুসলিমদের, যারা উত্তর ভারত বা মধ্য এশিয়া (যেমন আরব, পারস্য বা আফগানিস্তান) থেকে আগত বলে দাবি করতেন (আহমেদ ১৯৬৬: ২৬৮-২৭৮)। এই শ্রেণির মধ্যে প্রধানত চারটি গোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত ছিল: সৈয়দ, শেখ, মোগল ও পাঠান (আনসারি ১৯৬০)। এরা সাধারণত উচ্চবিত্ত, ভূস্বামী, ধর্মীয় নেতা বা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন এবং তাঁরা নিজেদের স্থানীয় মুসলিমদের তুলনায় নৃতাত্ত্বিকভাবে শ্রেষ্ঠ মনে করতেন (মোসাররাপ ২০১৭)। অন্যদিকে আতরাফ বা আজলাফ বলতে বোঝানো হতো সেই বিশাল জনসংখ্যাকে, যারা মূলত স্থানীয় নিম্নবর্ণের হিন্দু বা বৌদ্ধ সমাজ থেকে ধর্মান্তরিত হয়েছিল এবং যাদের পেশা ছিল মূলত কৃষিকাজ বা অন্যান্য কায়িক শ্রম (ওয়ালি ১৯০৪: ৫৭৪-৫৭৭)। এ কাঠামোর নিচে ছিল ‘আরজাল’ বা ‘রাইজাল’ শ্রেণি, যারা ঝাড়ুদার বা মেথরের মতো তথাকথিত ‘অশুচি’ পেশায় নিয়োজিত ছিল এবং সমাজের মূলধারা থেকে প্রায় অস্পৃশ্য হিসেবে বিবেচিত হতো (মোসাররাপ ২০১৭)।ঐতিহাসিকভাবে দক্ষিণ এশীয় মুসলিম সমাজে বর্ণপ্রথার আদলে সামাজিক স্তরবিন্যাস গড়ে উঠেছিল। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশীয় মুসলিম সমাজ প্রধানত যে তিনটি স্তরে বিভাজিত ছিল—আশরাফ, আজলাফ ও আরজাল—তার মূলে ছিল বংশপরিচয়, পেশা ও অর্জিত সামাজিক মর্যাদা। আশরাফরা ছিল সমাজের সর্বোচ্চ স্তরের অভিজাত শ্রেণি। তারা মূলত নিজেদের বিদেশি বংশোদ্ভূত, অর্থাৎ আরব, পারস্য, তুর্কি বা আফগান বংশধর হিসেবে দাবি করত। এই স্তরে অন্তর্ভুক্ত ছিল সৈয়দ, শেখ, মোগল ও পাঠানরা। তারা প্রধানত বিশাল ভূসম্পত্তির মালিক, উচ্চশিক্ষিত আলেম অথবা রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ সামরিক ও বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করত। বংশীয় শ্রেষ্ঠত্ব ও ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থানের কারণে তারা সমাজে সর্বোচ্চ আভিজাত্য ও সম্মানের অধিকারী ছিল।সামাজিক সিঁড়ির দ্বিতীয় স্তরে ছিল আজলাফ বা আতরাফ গোষ্ঠী। তারা মূলত স্থানীয়ভাবে ধর্মান্তরিত মুসলিম ছিল, যারা ইসলাম গ্রহণের পরও তাদের ‘শুদ্ধ’ বা সম্মানজনক কায়িক শ্রমের পেশাগুলো ধরে রেখেছিল। এই শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল ধর্মান্তরিত শেখ, আনসারি (জোলাহা), রায়িন ও মনসুরিরা। তারা মূলত কৃষক, তন্তুবায় (তাঁতি), দরজি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হিসেবে কাজ করত। আজলাফরা সমাজের মূল চালিকা শক্তি এবং সংখ্যাগুরু অংশ হলেও আশরাফদের তুলনায় তাদের সামাজিক মর্যাদা ছিল মধ্যম বা নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির।সমাজের সবচেয়ে নিচের স্তরে অবস্থান ছিল আরজাল গোষ্ঠীর। তারা মূলত অতিনিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায় থেকে ধর্মান্তরিত ছিল এবং তথাকথিত ‘অশুচি’ পেশায় নিয়োজিত থাকত। এই স্তরে হালালখোর, লালবেগী ও ভাটিয়ারাদের মতো গোষ্ঠীগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাদের ঐতিহাসিক পেশা ছিল ঝাড়ুদার, মেথর, মৃতদেহ সৎকারকারী কিংবা নাপিতের কাজ করা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ইসলাম ধর্মের মূলনীতি সাম্য হলেও পেশাগত কারণে এই গোষ্ঠী সামাজিকভাবে চরম অবজ্ঞা ও অস্পৃশ্যতার শিকার হতো। এই বিভাজনগুলো মূলত বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রবল ছিল, তবে আধুনিক শিক্ষা ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে এই ব্যবধানগুলো অনেকটাই কমে এসেছে।এ বিভাজন কেবল তত্ত্বগত ছিল না, বরং তা দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় গভীর বৈষম্য সৃষ্টি করত। আশরাফ মুসলিমরা উর্দু ভাষাকে তাদের আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং বাংলাকে ‘হিন্দুয়ানি’ ভাষা হিসেবে অবজ্ঞা করত (আহমেদ ১৯৯৬: ১১০-১১৫)। তাদের পোশাক (কুর্তা-পায়জামা) ও খাদ্যাভ্যাসও ছিল স্থানীয় মুসলিমদের (লুঙ্গি-ধুতি পরিহিত কৃষক) থেকে ভিন্ন (আহমেদ ১৯৯৬: ১১০-১১৫)। এই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দূরত্ব ঘোচানোর লক্ষ্যে এবং মর্যাদা বৃদ্ধির তাগিদে আতরাফ মুসলিমদের মধ্যে যে প্রক্রিয়ার সূচনা হয়, সমাজবিজ্ঞানে তাকে ‘আশরাফীকরণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় (আহমদ ১৯৬৬)।আশরাফীকরণ এবং পদবি পরিবর্তনের রাজনীতি: ‘জোলাহা’ থেকে ‘শেখ’ হওয়ার আখ্যানআশরাফীকরণ হলো এমন একটি সামাজিক প্রক্রিয়া, যেখানে নিম্নবর্গের মুসলিমরা নিজেদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে উচ্চবর্গের (আশরাফ) মুসলিমদের আচার-আচরণ, জীবনধারা ও নামীয় পদবি গ্রহণ করে (মোমিন ১৯৭৮) । এ প্রক্রিয়ায় নামের পরিবর্তন ছিল সবচেয়ে সহজলভ্য এবং শক্তিশালী কৌশল। বাংলার গ্রামীণ সমাজে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় প্রবাদ ছিল, যা এই সামাজিক গতিশীলতাকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে—‘গত বছর ছিলাম জোলাহা, এ বছর শেখ, আগামী বছর যদি ফসলের দাম বাড়ে তবে হব সৈয়দ।’১৮৭২ থেকে ১৯৩১: পরিচয়ের বিস্ময়কর রূপান্তরব্রিটিশ শাসনামলে পরিচালিত আদমশুমারিগুলোতে বাঙালি মুসলিমদের এই আত্মপরিচয় পরিবর্তনের প্রবণতা সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ১৮৭২ সালের আদমশুমারিতে বাংলায় মুসলিমদের মধ্যে খুব সামান্য অংশ নিজেদের ‘আশরাফ’ বা ‘শেখ’ হিসেবে দাবি করেছিল। কিন্তু ১৯০১ ও ১৯২১ সালের আদমশুমারিগুলোতে দেখা যায়, মোট মুসলিম জনসংখ্যার এক বিশাল অংশ (৯৫ শতাংশের বেশি) নিজেদের ‘শেখ’ হিসেবে নথিভুক্ত করেছ (ইটন ১৯৯৩: ২০৭-২১০)। এটি কোনো নৃবৈজ্ঞানিক পরিবর্তন ছিল না, বরং ছিল আতরাফ মুসলিমদের এক সংগঠিত প্রয়াস, যার মাধ্যমে তারা তাদের মণ্ডল , প্রামাণিক, বিশ্বাস বা জোলাহার মতো স্থানীয় ও পেশাগত পদবি বর্জন করে ‘শেখ’ বা ‘সৈয়দ’–এর মতো মর্যাদাসম্পন্ন ধর্মীয় পদবি গ্রহণ করেছিল (আহমেদ ১৯৯৬: ১২০-১৪০)।বাংলার মুসলিম সমাজে ‘শেখ’ পদবি ব্যবহারের বিবর্তনটি বিশ্লেষণ করলে এক চমকপ্রদ সামাজিক রূপান্তরের চিত্র ফুটে ওঠে। ১৮৭২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, তৎকালীন বাংলায় মাত্র ২ লাখ ৩২ হাজার ১৮৯ মানুষ নিজেদের ‘শেখ’ বলে পরিচয় দিতেন, যা ছিল মোট মুসলিম জনসংখ্যার মাত্র ১ দশমিক ৫ থেকে ৪ শতাংশ। এই ক্ষুদ্র গোষ্ঠীটি মূলত নিজেদের বিদেশি বংশোদ্ভূত বা উচ্চবংশীয় বলে দাবি করত (আহমেদ ১৯৯৬: ১২০-১৪০)। তবে বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই এই চিত্রে এক অভাবনীয় পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। ১৯০১ সালের মধ্যে ‘শেখ’ পদবিধারী জনসংখ্যা একলাফে ১৯ দশমিক ৫ মিলিয়নে পৌঁছায়, যা ছিল মোট মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ৯১ শতাংশ। এই সময়কালেই মূলত ব্যাপক ‘আশরাফীকরণ’ প্রক্রিয়া শুরু হয়, যেখানে নিম্নবর্ণ বা সাধারণ পেশাজীবী মুসলিমরা সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির অভিপ্রায়ে নিজেদের পুরোনো পদবি বদলে ‘শেখ’ পদবি গ্রহণ করতে থাকে (আহমেদ ১৯৯৬: ১২০-১৪০)। এই রূপান্তরের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯২১ সালে, যখন শেখ পদবিধারী জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৪ দশমিক ৪ মিলিয়ন বা মোট মুসলিম সমাজের প্রায় ৯৫ দশমিক ৮ শতাংশ (আহমেদ ১৯৯৬: ১২০-১৪০)। মাত্র ৫০ বছরের ব্যবধানে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রায় সবাই একক ‘শেখ’ পরিচয়ে পরিচিতি লাভ করার মাধ্যমে বংশীয় বিভাজন কাটিয়ে একটি সংহতিমূলক পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা চালায়।এই তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাঙালি মুসলিমরা একটি ব্যাপক ‘পরিচয়ের পুনর্গঠনের’ মধ্য দিয়ে গিয়েছিল। তারা তাদের স্থানীয়, ভৌগোলিক ও নৃবৈজ্ঞানিক শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি বৃহত্তর, কল্পিত আভিজাত্যের মধ্যে আশ্রয় খুঁজেছিল। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা একদিকে যেমন হিন্দু বর্ণপ্রথার ছায়া থেকে মুক্ত হতে চেয়েছিল, তেমনি অন্যদিকে আশরাফদের সামাজিক অবজ্ঞা থেকে বাঁচতে চেয়েছিল।‘দাদার বাবার নাম’ ভুলে যাওয়ার রাজনীতি: শিকড় কর্তনের মনস্তত্ত্ববাঙালি আতরাফ মুসলিমদের ভেতর একটা প্রবণতা ছিল, তিন বা চার পুরুষ আগের পূর্বপুরুষের নাম বা বংশীয় ইতিহাস ভুলে যাওয়ার, যা একটি গভীর ও সুসংগঠিত ‘সাংস্কৃতিক এমনেসিয়া’। এই বিস্মৃতির রাজনীতি মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে: হীনম্মন্যতা থেকে মুক্তি, সামাজিক আভিজাত্যের পুনর্নির্মাণ ও ধর্মীয় বিশুদ্ধতার অন্বেষণ।নৃতাত্ত্বিক শিকড় আড়াল করার কৌশল: বাঙালি মুসলিমদের পূর্বপুরুষেরা প্রায়ই নিম্নবর্ণের হিন্দু বা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল, যারা ব্রাহ্মণ্যবাদী নিপীড়ন বা সামাজিক বঞ্চনা থেকে বাঁচতে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ধর্মান্তরিত হওয়ার পরও আশরাফ বা বিদেশি বংশোদ্ভূত মুসলিমরা তাদের ‘নিচু জাতের’ হিসেবে গণ্য করত। অনেক ক্ষেত্রে তাদের আদি পদবি (যেমন পাল, দত্ত, বিশ্বাস) তাদের হিন্দু অতীতের দিকে ইঙ্গিত করত। ফলে নিজেদের ‘বিশুদ্ধ মুসলিম’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং আশরাফদের সমমর্যাদা পেতে তারা তাদের সেসব পূর্বপুরুষদের নাম বা পদবি ভুলে যাওয়ার বা মুছে ফেলার চেষ্টা করত, যারা স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত ছিল (আহমেদ ১৯৯৬: ১০৮-১১৫) । ‘দাদার বাবার নাম’ ভুলে যাওয়া মানে হলো সেই আদি ‘অপবিত্র’ বা ‘নিম্ন’ শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা।কল্পিত আভিজাত্য এবং ‘শাজরা’ বা ‘বংশলতিকা’ নির্মাণ: বাস্তব পূর্বপুরুষদের ইতিহাস এমনেসিয়ার গর্ভে ঠেলে দেওয়ার পর সেখানে একধরনের ‘উদ্ভাবিত আভিজাত্য’ (ইনভেনটেড নোবিলিটি) নির্মাণ করা হয়। আতরাফ থেকে আশরাফে রূপান্তরিত হওয়ার জন্য তারা নতুন বংশতালিকা বা ‘শাজরা’ তৈরি করে, যেখানে তারা নিজেদের সরাসরি আরব্য বা পারস্যের কোনো বীর বা সুফি সাধকের বংশধর হিসেবে দাবি করে (ইসলাম ২০২২: ৮৭-৯৮)। এ প্রক্রিয়ায় তাদের সত্যিকারের পারিবারিক ইতিহাস অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে, যা ব্যক্তিকে তার বর্তমান সামাজিক অবস্থানে একধরনের বৈধতা প্রদান করে।শিক্ষিত মধ্যবিত্তের উদয় ও আভিজাত্যের স্পৃহা: বিংশ শতাব্দীতে বাংলার মুসলিম সমাজে একটি ক্ষুদ্র কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষী শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদয় হয়, যারা ব্রিটিশ প্রদত্ত ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করে (আহমেদ ১৯৯৬)। এই শ্রেণি যখন গ্রামীণ কৃষি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শহুরে পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে চায়, তখন তারা তাদের কৃষক বা কায়িক শ্রমিকের পরিচয়কে আড়াল করতে চায়। এই ‘এমনেসিয়ার রাজনীতি’ তাদের জন্য একটি ঢাল হিসেবে কাজ করে, যা তাদের নতুন সামাজিক আভিজাত্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। আবুল মনসুর আহমদ (১৯৩৫) যেমনটি পর্যবেক্ষণ করেছেন, মুসলিম পরিচয়টি তখন কেবল ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং একটি সামাজিক শ্রেণি হিসেবে আবির্ভূত হয়, যা হিন্দু সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চায়। নামের শুরুতে ‘মোহাম্মদ’ বা ‘এম. ডি.’ ব্যবহার: পরিচয়ের রাজনীতিবাঙালি মুসলিম পুরুষদের নামের শুরুতে ‘মোহাম্মদ’ বা সংক্ষেপে ‘মোঃ’ ব্যবহারের আধিক্য কেবল ভক্তির বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত সচেতন ‘পরিচয়ের রাজনীতি’। এই প্রবণতা বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় মুসলিমদের মধ্যে এক অনন্য মাত্রা পেয়েছে, যেখানে এটি নামের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য হয়।বৈশ্বিক ইসলামি পরিচয়ের মুখচ্ছবি: নামের শুরুতে নবীর নাম যুক্ত করা ব্যক্তিকে তার স্থানীয় বর্ণ, গোত্র বা পেশাগত পরিচয় থেকে মুক্ত করে একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক মুসলিম পরিচয়ের (Pan-Islamic Identity) সঙ্গে যুক্ত করে। যখন একজন ব্যক্তি নিজেকে ‘মোঃ মাসউদ ইমরান’ হিসেবে পরিচয় দেয়, তখন তার নামের মধ্যে তার পূর্বপুরুষের পেশাগত পরিচয় (যেমন—জোলাহা/মণ্ডল/মিয়া) অনুপস্থিত থাকে। এটি তাকে একটি ‘নিরপেক্ষ’ এবং ‘বিশুদ্ধ’ ধর্মীয় পরিচিতি দান করে, যা তাকে উচ্চবর্গের আশরাফদের কাছাকাছি নিয়ে যায়। এটি মূলত একটি ‘সর্বজনীন মুসলিম পরিচয়’ তৈরির প্রয়াস, যা অভ্যন্তরীণ শ্রেণিবিভাগকে মুছে দিতে সাহায্য করে।প্রশাসনিক বিবর্তন এবং ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার: নামের এই সংক্ষিপ্ত রূপ ‘মোঃ’ ব্যবহারের পেছনে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনেরও ভূমিকা রয়েছে। ব্রিটিশ রেকর্ড কিপিং ব্যবস্থায় দীর্ঘ মুসলিম নামগুলোকে সংক্ষেপে নথিভুক্ত করার প্রয়োজনে ‘Mohammad’–কে ‘Md.’/‘MD.’ হিসেবে লেখা শুরু হয়। পরবর্তীকালে এটি স্কুল রেজিস্টার, জন্মনিবন্ধন ও ভোটার তালিকায় এতটাই স্থায়ী হয়ে যায় যে অনেক অভিভাবক অসচেতনভাবেই সন্তানের নামের শুরুতে এটি যুক্ত করে দেন। মজার ব্যাপার হলো, খোদ আরব দেশগুলোতে বা বিশ্বের অন্যান্য মুসলিমপ্রধান অঞ্চলে নামের শুরুতে নবীর নাম রাখার প্রচলন থাকলেও সব পুরুষের নামের শুরুতে বাধ্যতামূলকভাবে ‘মোহাম্মদ’ বা তার সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহারের এমন গণপ্রবণতা বিরল (ফোরবিয়ারস ২০২৬)।‘মোঃ’ বনাম ‘মেডিকেল ডাক্তার’: আধুনিক প্রেক্ষাপটে এই সংক্ষিপ্ত রূপটি বাঙালি মুসলিমদের জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে প্রায়শই বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন বা প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ‘Md.’–কে ‘Medical Doctor’–এর সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে ভুল করা হয়। এটি একটি গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে একটি স্থানীয় সামাজিক সুরক্ষার কৌশল বৈশ্বিক প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। পাসপোর্ট অফিসে একসময় সংক্ষিপ্ত নাম ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও এনআইডি কার্ডের ‘মোঃ’–এর প্রভাব কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি, যা নির্দেশ করে যে এই পরিচিতিটি এখন বাঙালি মুসলিমের আত্মপরিচয়ের অস্থিমজ্জায় মিশে গেছে।‘শেখাইজেশন’-এর মাধ্যমে জাতপাত আড়ালের সূক্ষ্ম কৌশল: গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে নিম্নবর্গের মুসলিমরা (যাদের সমাজবিজ্ঞানী ইমতিয়াজ আহমদ (১৯৬৬) ‘Caste-like features’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন) নিজেদের আদি পরিচয় আড়াল করতে নামের শুরুতে ‘মোহাম্মদ’ এবং শেষে ‘শেখ’ বা ‘সৈয়দ’ যুক্ত করে (আহমদ ১৯৬৬)। এই প্রক্রিয়াকে ‘শেখাইজেশন’ (Sheikhisation) বলা যেতে পারে, যেখানে ‘শেখ’ শব্দটি কোনো গোত্র পরিচয় নয় বরং একটি সম্মানসূচক পদবি বা ‘Courtesy Title’ হিসেবে ব্যবহৃত হয় (আহমদ ২০২৩: ৯২-১০৮)। এটি তাদের জন্য একধরনের সামাজিক স্বীকৃতি লাভের সহজতম উপায় হলেও এর ফলে তারা প্রায়শই রাষ্ট্রীয় কোটা সুবিধার (Reservation) সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, কারণ তারা তাদের প্রকৃত ‘পিছিয়ে পড়া’ পরিচয়টি প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ করে। নাম গ্রহণের রাজনৈতিক বিশ্লেষণবাঙালি মুসলিমদের নামের এই পরিবর্তনশীলতা এবং বিস্মৃতির রাজনীতি আধুনিক সময়ে এক ভয়াবহ ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি নিজেই আমার পূর্বজদের থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। নতুন সংগঠিত পরিচয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। বাংলাদেশের মুসলিমদের অবস্থা এখন না ঘরকা, না ঘাটকা।অ্যালগরিদমিক অ্যামনেসিয়া ও প্রশাসনিক হয়রানি: বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় দেখা গেছে, অনেক মুসলিম ভোটারের নাম ‘অসংগতিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, কারণ তাদের নথিপত্রে নামের শুরুতে কখনো ‘Md.’ আছে, আবার কখনো ‘Mohammad’ আছে, অথবা কখনো কিছুই নেই। রাষ্ট্রীয় অ্যালগরিদম এই সূক্ষ্ম সামাজিক পরিবর্তনের ব্যাকরণ বোঝে না। ফলে একজনের নাম ‘মোহাম্মদ আলী’ এবং অন্য নথিতে ‘মোঃ আলী’ থাকাকে দুই ভিন্ন ব্যক্তির পরিচয় হিসেবে গণ্য করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত তাদের নাগরিকত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।নথিপত্রে নামের অসংগতির কারণে সৃষ্ট প্রশাসনিক জটিলতাগুলো বর্তমানে একটি বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে প্রকট। ভোটার কার্ডে সাধারণত নামের শুরুতে ‘মোঃ’ বা ‘Mohammad’ ব্যবহারের অদলবদল ঘটে, যা মূলত প্রান্তিক ও গ্রামীণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য নাগরিক সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। অন্যদিকে ভোটার কার্ডে যখন একই ব্যক্তির নাম ‘মোহাম্মাদ মাসউদ’ হিসেবে নথিভুক্ত হয়, তখন অন্যান্য ডকুমেন্টের সঙ্গে বানান বা দৈর্ঘ্যের পার্থক্যের কারণে বায়োমেট্রিক ও পরিচয়ের অমিল দেখা দেয়, যা সাধারণ নাগরিকদের প্রাত্যহিক প্রশাসনিক কাজে ভোগান্তিতে ফেলে। এই জটিলতা আরও তীব্র হয় পাসপোর্ট বা শিক্ষাগত সনদের ক্ষেত্রে, যেখানে অনেক সময় ‘Md.’/‘MD.’ বা প্রাথমিক অংশটি পুরোপুরি বাদ পড়ে যায় এবং ব্যক্তি কেবল ‘মাসউদ’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। এর ফলে বংশীয় সংযোগ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, যা উচ্চশিক্ষিত ও প্রবাসী ব্যক্তিদের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বা নাগরিকত্বের প্রমাণ দাখিলের ক্ষেত্রে বড় ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।অ্যামনেসিয়ার ফলাফল, যখন পূর্বপুরুষই শত্রু হিসেবে জ্ঞাত: যারা আভিজাত্যের আশায় নিজেদের ‘দাদার বাবার নাম’ ভুলে গিয়েছিল বা পরিবর্তন করেছিল, আজ তারাই সবচেয়ে বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে নিজেদের সংস্কৃতি থেকে। আজ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিবারে আদি পূর্বপুরুষের নামের সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের নামের কোনো মিল নেই। পূর্বপুরুষ ছিল ‘বিশ্বাস’ বা ‘মণ্ডল’, নাতি এখন ‘সৈয়দ’ বা ‘শেখ’ (আহমেদ ১৯৯৬: ৮৫-৯০)। এই পরিচয়ের বিচ্ছিন্নতা ব্যক্তিকে রাষ্ট্রহীন হওয়ার ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। অর্থাৎ যে অ্যামনেসিয়া একসময় সামাজিক মর্যাদার ঢাল ছিল, আজ তা অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাংস্কৃতিক অ্যামনেসিয়া বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতা: একটি তাত্ত্বিক মূল্যায়নবাঙালি মুসলিমদের এই ‘অ্যামনেসিয়ার রাজনীতি’ কেবল নামের পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি বৃহত্তর শ্রেণি রাজনীতির অংশ। সমাজবিজ্ঞানী রাজনি কোঠারি যেমনটি বলেছেন, এটি একধরনের ‘ক্রমবর্ধমান অ্যামনেসিয়া’, যা দরিদ্র ও প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোকে মূলধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে অদৃশ্য করে দেয়। মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলিম শ্রেণি যখন নিজেদের একটি ‘স্যানিটাইজড’ বা মার্জিত ইসলামি পরিচয়ে উপস্থাপন করতে চায়, তখন তারা তাদের গ্রামীণ, কৃষক এবং তথাকথিত ‘নিম্নবর্ণের’ ইতিহাসকে মুছে ফেলতে বাধ্য হয় (কোঠারি ১৯৯৫)।ভাষা ও পরিচয়ের টানাপোড়েন: বাঙালি মুসলিমের পরিচয়ের এই দ্বন্দ্বে ভাষা একটি প্রধান অনুষঙ্গ। উনিশ শতকের শেষের দিকে আশরাফরা উর্দুকে তাদের ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেছিল, যাতে তারা হিন্দুদের থেকে আলাদা হতে পারে (রবিনসন ১৯৭৪)। কিন্তু আতরাফ বা সাধারণ বাঙালি মুসলিমদের জন্য বাংলা ছিল তাদের নাড়ির ভাষা। এই ভাষা ও ধর্মের দ্বন্দ্বকে আবুল মনসুর আহমদ চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, বাঙালি মুসলিমের জন্য ‘মুসলিম’ পরিচয়টি কেবল একটি ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং এটি একটি সামাজিক শ্রেণি গঠন, যা হিন্দু ভূস্বামী ও মহাজনদের শোষণের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক ব্যারিকেড হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। কিন্তু এ লড়াইয়ে জিততে গিয়ে তারা তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের (যেমন—বাউল, মরমি গান, লোকজ সংস্কৃতি) অনেক কিছুকেই ‘অ-ইসলামিক’ বলে বর্জন করেছে ((মনসুর ১৯৩৫)।ভাষার টানাপোড়েন যে এখনো বর্তমান, তা আমরা দেখতে পাই ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আন্দোলনকারীদের নেতাদের মুখেই শোনা গেছে আজাদি, বন্দোবস্ত, বয়ান, ইনসাফ, ফয়সালা, মজলুম ইত্যাদি শব্দ। সভা–সমাবেশে কিংবা টেলিভিশনের টক শোতে আলোচনায় তাঁরা এসব শব্দ অনেক বেশি ব্যবহার করছেন বলে অনেকের দৃষ্টিতে এসেছে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে ইনকিলাব বর্গটি। বাংলাদেশপন্থার ভাষাভঙ্গি হিসেবে এসব বর্গ প্রচলনের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে, যার ভেতর থেকে ভাষার মুসলমানিকরণ অব্যাহত রাখা হয়েছে। এ প্রকল্প আমরা দেখব শুরু হয়েছিল ফরায়েজি আন্দোলনের ভেতর থেকে যখন জলকে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল পানি শব্দ গ্রহণের মাধ্যমে।ঔপনিবেশিক সীমানা নির্ধারণ ও দক্ষিণ এশিয়ার ‘ম্যাপিং’: দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচয় বা ‘সাউথ এশিয়া’র ধারণাটি কোনো প্রাকৃতিক বা ভৌগোলিক ধ্রুবক নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক নির্মাণের ফসল। ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশরা যখন এই অঞ্চলের মানচিত্র তৈরি করে, তখন তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল সাম্রাজ্যবাদী শাসনকে বৈধতা দেওয়া এবং বিভাজন সৃষ্টি করা (লুডেন ২০০৪)। এই ‘ম্যাপিং’ বা সীমানা নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোতেও অব্যাহত রয়েছে। স্বাধীন ভারত বা পাকিস্তান রাষ্ট্র যেভাবে তাদের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার বা জাতীয় পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা করেছে, তা মূলত সেই ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারেরই ধারাবাহিকতা (লুডেন ২০০৪)।দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রকল্পে সীমানা কেবল ভূখণ্ডকে আলাদা করে না, বরং মানুষের চলাফেরা, বাণিজ্য এবং বৈধ-অবৈধতার ধারণাকেও সংজ্ঞায়িত করে। বর্তমান বিশ্বায়িত বিশ্বে এই সীমানাগুলো একদিকে যেমন কঠোরভাবে রক্ষা করা হচ্ছে, অন্যদিকে অভিবাসন ও আন্তসীমানা চলাচলের কারণে তা ক্রমাগত অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে (পাসি ২০১৫)। বাঙালি মুসলমানদের ক্ষেত্রে এই সীমানা–সংকট অত্যন্ত প্রকট। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এই অঞ্চলের মানুষের আত্মপরিচয়কে রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে বন্দী করে ফেলার চেষ্টা করেছে, যা পরবর্তী সময়ে নানা সংকটের জন্ম দিয়েছে (সিরাজুল ২০১২)। জিনিয়ালজি-১, ১৯০৫ থেকে ১৯৪৭: দ্বিজাতিতত্ত্ব ও বাঙালি মুসলমানের মোহভঙ্গের প্রাথমিক পর্ব১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ছিল ব্রিটিশদের একটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক কৌশল, যার মাধ্যমে তারা হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করতে চেয়েছিল। তবে পূর্ববঙ্গের মুসলমান মধ্যবিত্তের কাছে এটি ছিল উন্নয়নের একটি সুযোগ (আহমেদ ২০১৩)। কলকাতার হিন্দু জমিদারদের শোষণ থেকে মুক্তি এবং নিজেদের প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনের আশায় তারা বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন করেছিল। ১৯১১ সালে এই বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর মুসলমানদের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়, তা পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান আন্দোলনের ভিত্তি মজবুত করে (আহমেদ ২০১৩)।১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ ছিল মুসলমানত্বের ওপর ভিত্তি করে একটি রাষ্ট্র নির্মাণের প্রয়াস। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, হিন্দু ও মুসলমানরা সম্পূর্ণ আলাদা দুটি জাতি এবং তাদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র প্রয়োজন। বাঙালি মুসলমানরা শুরুতে এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল এই আশায় যে পাকিস্তান হবে তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির গ্যারান্টি (সেন ১৯৮৬: ২১০-২১২)। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর দেখা গেল, পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের ওপর একধরনের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ চাপিয়ে দিচ্ছে (উমর ১৯৭০: ১-১০)। ধর্মীয় ঐক্যের চেয়ে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক শোষণ যখন বড় হয়ে দেখা দিল, তখন থেকেই বাঙালি মুসলমানের মনে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রকল্প নিয়ে মোহভঙ্গ শুরু হয়।বাংলার মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী বিবর্তনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় পরিলক্ষিত হয়। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ছিল এই প্রক্রিয়ার শুরুর দিক, যেখানে প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন লাভ এবং তৎকালীন জমিদারি শোষণ থেকে সাধারণ মুসলিমদের মুক্তি (সিরাজুল ২০১২)। এই পর্যায়ে পরিচয়ের প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছিল আঞ্চলিক ও ধর্মীয় স্বার্থ। পরবর্তী সময়ে, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময়ে লক্ষ্য পরিবর্তিত হয়ে মুসলমানদের জন্য একটি আলাদা আবাসভূমি ও রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের দিকে ধাবিত হয় (সিরাজুল ২০১২)। এই স্তরে দ্বিজাতিতত্ত্ব বা ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদই ছিল পরিচয়ের মূল ভিত্তি। তবে দেশভাগের অল্পকাল পরেই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এক নতুন মোড় নিয়ে আসে, যেখানে প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় সাংস্কৃতিক অধিকার এবং মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা (আমিন ২০২৬)। এই পর্যায়ে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ভাষাগত ও নৃতাত্ত্বিক জাতীয়তাবাদই হয়ে ওঠে বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রধান নিয়ামক, যা পরবর্তী সময়ে একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি তৈরি করে। জিনিয়ালজি-২, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন: বাঙালিত্বের দ্বিতীয় জাগরণভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় বিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এটি কেবল উর্দুর পরিবর্তে বাংলার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবি ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লব, যা দ্বিজাতিতত্ত্বের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছিল (আমিন ২০২৬)। এই আন্দোলনের মাধ্যমেই বাঙালি মুসলমান বুঝতে পেরেছিল যে তার ধর্মীয় পরিচয় আর ভাষাগত পরিচয় পরস্পরবিরোধী নয়, বরং পরিপূরক।আনিসুজ্জামান (২০২২) ভাষা আন্দোলনের এই রূপান্তরকে একটি সামগ্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গ্রহণের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, এই আন্দোলন হিন্দু ও মুসলমানের যৌথ অবদানে নির্মিত বাংলা সংস্কৃতিকে আপন করে নেওয়ার পথকে প্রশস্ত করেছিল। তবে এই আন্দোলনেও আদর্শিক বিভাজন ছিল। তমুদ্দিন মজলিসের মতো সংগঠনগুলো চেয়েছিল বাংলার একটি ‘ইসলামি সংস্করণ’ প্রচার করতে, যেখানে তারা ভাষার মর্যাদা চাইলেও পাকিস্তানের ইসলামি কাঠামোর মধ্যে থাকতে আগ্রহী ছিল (উমর ১৯৭০)। অন্যদিকে প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী ও ছাত্ররা একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাঙালিত্বের ধারণা সামনে নিয়ে এসেছিলেন।বদরুদ্দীন উমর ভাষা আন্দোলনকে ‘শ্রেণি লেন্সের’ মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে এই আন্দোলন কেবল শিক্ষিত মধ্যবিত্তের দাবি ছিল না, বরং এটি ছিল একটি বৈশ্বিক জনপ্রিয় কারণ, যা অভিজাত ও সাধারণ মানুষের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে দিয়েছিল। তাঁর বিশ্লেষণে, ভাষা আন্দোলন ছিল পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে প্রথম সার্থক বিদ্রোহ, যা পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সালের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরি করেছিল (উমর ১৯৭০)। জিনিয়ালজি-৩, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ধর্মনিরপেক্ষতার সাংবিধানিক ভিত্তি১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, যা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে একটি আধুনিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের মূল স্লোগান ‘জয় বাংলা’ কোনো ধর্মীয় পরিচয় বহন করত না, বরং এটি ছিল এই ভূখণ্ডের মানুষের সামগ্রিক মুক্তির প্রতীক (নুরুল ২০১৪)। স্বাধীন বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’–কে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এ ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ ছিল ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের অবসান ঘটানো, ধর্মহীনতা বা নাস্তিকতা নয়। অর্থাৎ ধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। এটি ছিল একটি ‘বাঙালিত্ববাদী’ রাষ্ট্রকল্পের সূচনা, যেখানে নাগরিকের পরিচয়ে ধর্মের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় সাংস্কৃতিক পরিচয়ের। জিনিয়ালজি-৪, ১৯৭২ সালের সংবিধানের সমালোচনা ও চ্যালেঞ্জতবে এই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকল্প শুরু থেকেই নানামুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। বদরুদ্দীন উমরের মতো বামপন্থী তাত্ত্বিকরা এই সংবিধানের সমালোচনা করে বলেছিলেন, এটি সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে এবং এটি মূলত একটি বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করছে। অন্যদিকে রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলো মনে করেছিল, ধর্মনিরপেক্ষতা বাঙালি মুসলমানদের তাদের ধর্মীয় শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে।এ ছাড়া সংবিধানে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’কে যখন নাগরিকত্বের ভিত্তি করা হয়, তখন তা আদিবাসীদের (যেমন পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী) মধ্যে একটি আশঙ্কার সৃষ্টি করে (ইমরান ২০১৫)। তারা মনে করেছিল যে এই উগ্র বাঙালিত্ব তাদের নিজস্ব স্বতন্ত্র পরিচয়কে গ্রাস করে ফেলবে। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এই সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের পরিচয়ের রাজনীতিতে একটি বড় বিতর্কের জন্ম দেয় (ইমরান ২০১৫)।জিনিয়ালজি-৫, ১৯৭৫–উত্তর পরিবর্তন এবং বুদ্ধিজীবিতা: বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনির্ভর রাজনীতির প্রত্যাবর্তন১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ আমূল বদলে যায়। জিয়াউর রহমান ১৯৭২-এর সংবিধানের সেক্যুলার ধারণার বিস্তর পরিবর্তন নিয়ে আসেন। যেখানে ধর্মনির্ভর রাজনীতি বা সংগঠন তৈরি করা সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ ছিল ৩৮ অনুচ্ছেদ দ্বারা, তার পরিবর্তন করা হয় পঞ্চম সংশোধনীর ভেতর থেকে। পাশাপাশি ৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিবর্তন করা হয়, যা জাতীয়তার পরিচয়কে নতুন বাঁকে নিয়ে দাঁড় করায়। অর্থাৎ জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’–এর পরিবর্তে মুসলমানিত্বকে গুরুত্ব দিয়ে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’–এর ধারণা প্রবর্তন করা হয় (কবির ১৯৮৩)। এটি ছিল মূলত একটি কৌশলগত পরিবর্তন, যার মাধ্যমে বাঙালিত্বের সঙ্গে মুসলমানত্বের একটি নতুন মেলবন্ধন তৈরির চেষ্টা করা হয়। জিয়াউর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন যে কেবল ভাষাগত পরিচয় মানুষের সব আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারছে না, তাই তিনি এর সঙ্গে ভৌগোলিক অবস্থান এবং ধর্মীয় অনুষঙ্গকে যুক্ত করেন (মনিরুজ্জামান ২০১০)।এই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেওয়া হয় এবং ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ যুক্ত করা হয় । পরবর্তী সময়ে এরশাদ সরকারের আমলে ইসলামকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ হিসেবে ঘোষণা করা হয় (মনিরুজ্জামান ২০১০)। এ ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয় ক্রমাগতভাবে একটি লৈখিক ও ভাষাগত পরিচয় থেকে আবার ধর্মীয় পরিচয়ের দিকে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। একে অনেকেই ‘মুসলিম পরিচয়’–এর পুনঃপ্রতিষ্ঠা হিসেবে দেখেন, যা ১৯৭১ সালের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার সঙ্গে দ্বান্দ্বিক অবস্থানে রয়েছে।বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদের বিবর্তন এবং এর বিভিন্ন ধারা বিশ্লেষণ করলে তিনটি প্রধ

Source: https://www.protichinta.com/article/vvngni0ehe

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৬১ ম্যাচে ৬২ গোল, চ্যাম্পিয়নস লিগে অনন্য হলান্ড

১

সঞ্চয়পত্রের উৎসে কর চূড়ান্ত কর নয়, কার লাভ কার ক্ষতি

২

মাদ্রাসায় শিশুসুরক্ষা: অস্বীকার ও দোষারোপের বৃত্ত ভেঙে সমাধানের পথে

৩

প্রথমবার ডাইনোসরের জীবাশ্মে পাওয়া গেল লাল রক্তকণিকা

৪

মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের মূল কারণ ইরান যুদ্ধ: ভ্যান্স

৫

তরঙ্গ নবায়ন ব্যয় আরও যৌক্তিক করার আহ্বান মোবাইল অপারেটরদের

৬

এথেন্স স্তব্ধ করে রিয়ালকে জেতালেন ভালভের্দে

৭

কটিয়াদীতে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের ছেলেকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত, মারধর

৮

নতুন বাস্তবতার উপযোগী হয়ে ওঠার অঙ্গীকার

৯

উত্তরায় ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ তুলে ম্যাজিস্ট্রেটকে হেনস্তা

১০

গ্যাসের সরবরাহ কমেছে, এমন চলবে কত দিন

১১

প্রথম আলোর ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, কর্মীদের মিলনমেলা

১২

নাসির উদ্দিনের মামলায় পরীমনির জামিন বাতিল, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি

১৩

এইচএসসিতে দুই বিষয় পর্যস্ত অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের আবারও পরীক্ষার সুযোগ

১৪

ডেসকোর যেই নম্বরের প্রিপেইড মিটার রিচার্জ বন্ধ থাকবে ২৪ ঘণ্টা

১৫

ভিডিওতে ৮ পিস্তল নিয়ে হুমকি, ‘সময় থাকতে পালিয়ে যাও, আমি তুফান’

১৬

তৃতীয় ভাষা চালুর আগে প্রস্তুতি কতটুকু

১৭

হল্টারনেক স্টেটমেন্ট ব্লাউজে দেওয়ালি লুকে আলিয়া

১৮

কোয়ান্টাম জগৎ: মহাবিশ্ব কীসের তৈরি, কণা নাকি তরঙ্গ

১৯

ফতুল্লায় শ্রমিক-পুলিশ পাল্টা–পাল্টি ধাওয়া, টিয়ার শেল নিক্ষেপ

২০