২ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩১ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে বৈষম্যহীন, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষের মূল পরিচয় ছিল ‘বাংলাদেশপন্থী’। দল, মত ও আদর্শের ভিন্নতা ভুলে সবাই তখন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এককাতারে দাঁড়িয়েছিলেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মরণে ‘ফার্স্ট জুলাই কনক্লেভ অন জুলাই রেভোল্যুশন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জুলাই রেভোল্যুশনারি অ্যালায়েন্স ফাউন্ডেশন। আজ রোববার বিকেলে রাজধানীর ইস্কাটনের বিয়াম ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের আত্মার শান্তি কামনায় দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। মাহদী আমিন বলেন, আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে তাঁরা যে বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই আদর্শ ও মূল্যবোধ ধারণ করা সম্ভব। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে মানবাধিকার থাকবে, আইনের শাসন থাকবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে এবং বৈষম্যের কোনো স্থান থাকবে না।’.আন্দোলনে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, অনেক পরিবার এখনো তাঁদের স্বজন হারানোর বেদনা বয়ে বেড়াচ্ছে। অনেক আহত ব্যক্তি এখনো পুরোপুরি সুস্থ হননি। তাঁদের পাশে থাকার বিষয়ে সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের আন্তরিকতার কথাও তুলে ধরেন তিনি।অনুষ্ঠানে মাহদী আমিনের বক্তব্য চলাকালে জুলাই সনদ নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার দাবি তুলে স্লোগান দেন আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা। জবাবে তিনি বলেন, তাঁদের কষ্ট ও বেদনা সরকার উপলব্ধি করে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা হবে। ফ্যাসিবাদবিরোধী যে ঐক্যের মধ্য দিয়ে আন্দোলন সফল হয়েছিল, সেই ঐক্য ধরে রেখে দেশ গঠনের কাজ এগিয়ে নিতে হবে। মাহদী আমিন বলেন, ‘আমরা সবাই মিলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করব এবং প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করব।’.জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও দলীয়করণমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলা কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য ক্ষতিকর নয়; বরং তা সরকার, বিরোধী দল এবং সাধারণ জনগণ—সবার জন্যই দীর্ঘ মেয়াদে কল্যাণকর। একই সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন, জুলাইয়ের ঘটনাকে কোনো ‘পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।এনসিপির সদস্যসচিব বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের আগে দেশে এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল, যেখানে অনেকেই মনে করতেন, স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা থেকে মুক্তির কোনো পথ আর অবশিষ্ট নেই। তাঁর ভাষ্য, প্রচলিত রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তনের সুযোগ কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।.নতুন প্রজন্মকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার আহ্বানআলোচনায় লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সরকার দলের সংসদ সদস্য ও হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, জুলাইয়ের চেতনা কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি সততা, জবাবদিহি, মানবিকতা ও ব্যক্তিগত নৈতিকতার মাধ্যমে ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি নতুন প্রজন্মকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান এবং শহীদ পরিবারের মর্যাদা ও ত্যাগকে সর্বোচ্চ সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।মায়ের ডাকের সংগঠক এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম বলেন, জুলাই ছিল কোনো একক রাজনৈতিক দলের আন্দোলন নয়; এটি ছিল ছাত্র–তরুণদের নেতৃত্বে সাধারণ মানুষের মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ ছিল, তাই নতুন বাংলাদেশ গঠনের প্রক্রিয়াতেও তাঁদের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ বলেন, অতীতের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক ভিত্তির ওপর পুনর্গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনপরিসরে জুলাই অভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা ও চর্চা বাড়ানোর আহ্বান জানান।.জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে খাটো না করার আহ্বান‘দ্য মিডিয়া অ্যান্ড কালচার ইন পোস্ট-জুলাই বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় বক্তব্য দেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তিনি বলেন, দেশে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় একশ্রেণির গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ব্যক্তিরা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে গণমাধ্যম, সাহিত্য, নাটক, সিনেমা ও সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে এমন একটি বয়ান তৈরি করা হয়েছে, যেখানে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তিকে মহিমান্বিত করা হয়েছে এবং ভিন্নমতের মানুষকে প্রান্তিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন, জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি হলো ভিন্নমত, বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক ধারার মানুষের জন্য সমান জায়গা নিশ্চিত করা; সেই অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনা ধরে রাখতে পারলে দেশে নতুন কোনো বিভাজন তৈরি হবে না।সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের বিরোধিতা করা বা স্বৈরাচারী শাসনের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ব্যক্তিদের এখনো বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে নিয়মিত আলোচনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, এসব গণমাধ্যম অতীতে জনগণের সঙ্গে ‘ধোঁকাবাজি’ করেছে এবং এখনো একই ব্যক্তিদের প্ল্যাটফর্ম দিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেছিল বলেই এসব কর্মকাণ্ড প্রশাসনিকভাবে বন্ধ করার পথে যায়নি।.জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আশরাফ কায়সার বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকে ‘জঙ্গিদের ক্ষমতা দখল’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা এখনো বিভিন্ন মহল থেকে চলছে, যা গণ–অভ্যুত্থানের প্রকৃত বয়ান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করছে। তিনি অভিযোগ করেন, ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে একশ্রেণির গণমাধ্যমকর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি দাবি করেন, গণ–অভ্যুত্থানের পরও কিছু গণমাধ্যম এবং সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে।বিডিজবসের সিইও ফাহিম মাশরুর বলেন, জুলাইয়ের ঘটনাকে কেবল একটি আন্দোলন হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব খাটো করে দেখা হবে। এটি ছিল সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে সংঘটিত একধরনের ‘জনযুদ্ধ’, যেখানে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। তিনি দাবি করেন, এ সময় দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবী জনগণের পক্ষে অবস্থান না নিয়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের পক্ষেই ছিলেন। তাই জুলাইয়ের ইতিহাস মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গণমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবী মহলের ভূমিকা নিয়েও খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন।.সম্মেলনের উদ্বোধন ঘোষণা করেন জুলাই রেভোল্যুশনারি অ্যালায়েন্সের গণ-অভ্যুত্থানবিষয়ক সম্পাদক এবং শহীদ ফাহমিন জাফরের মা ফাহমিদা জাফর। সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদা হাবীবা, নারায়ণগঞ্জ–৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন, শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা, জাতীয় ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদ আহসান, শহীদ আনাসের মা সানজিদা খান, শহীদ মো. নাজমুল কাজীর স্ত্রী মারিয়া সুলতানা রাখি, শহীদ ইবরাহিমের বাবা কবির হোসাইনসহ আরও অনেকে।

Source: https://www.prothomalo.com/politics/22sj1ahmlx

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নিজের নামে রেলওয়েতে প্রায় কোটি টাকার বিল, জানেনই না গৃহিণী কোহিনূর

১

নিজের নামে রেলওয়েতে প্রায় কোটি টাকার বিল, জানেনই না গৃহিণী কোহিনূর

২

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪তম সমাবর্তনে আবেদন চার ধাপে, ১ নভেম্বর শুরু

৩

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪তম সমাবর্তনে আবেদন চার ধাপে, ১ নভেম্বর শুরু

৪

ইসরায়েলে ভোট চলছে, কেন্দ্রে কেন আরব ভোটারদের ভিডিও করছে নেতানিয়াহুর দল

৫

কালো স্যুটে গোলাপি পালকের ব্রোচ, নজর কাড়লেন লামিনে ইয়ামাল

৬

দ্বিতীয়বার খোলা হলো লালন আখড়াবাড়ির দানবাক্স, কত টাকা পাওয়া গেল

৭

ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে ভোটার টানতে নানা প্রতিশ্রুতি

৮

ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে ভোটার টানতে নানা প্রতিশ্রুতি

৯

মোদিকে বলুন জ্ঞানেশকে সরাতে, ৩০ সেকেন্ডে বিক্ষোভ বন্ধ হবে: দিল্লির ব্যবসায়ীদের রাহুল

১০

মোদিকে বলুন জ্ঞানেশকে সরাতে, ৩০ সেকেন্ডে বিক্ষোভ বন্ধ হবে: দিল্লির ব্যবসায়ীদের রাহুল

১১

অস্ট্রেলিয়ার ভিসানীতিতে কড়াকড়ি: বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও অভিবাসীদের করণীয় কী

১২

অস্ট্রেলিয়ার ভিসানীতিতে কড়াকড়ি: বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও অভিবাসীদের করণীয় কী

১৩

জুয়ার আসরে নিঃস্ব ওসমান মিয়া, হোমনা উপজেলায় আবারো জমজমাট ‘জুয়ার আসর’ ?

১৪

দাম্পত্যে সন্দেহ থেকে মধ্যবিত্তের গল্প, আলোচনায় কোন পাঁচ নাটক

১৫

দাম্পত্যে সন্দেহ থেকে মধ্যবিত্তের গল্প, আলোচনায় কোন পাঁচ নাটক

১৬

প্রকৃতি ও পরম্পরার সেতুবন্ধ

১৭

প্রকৃতি ও পরম্পরার সেতুবন্ধ

১৮

মালয়েশিয়া ভ্রমণ: কালের যাত্রাধ্বনি-৫

১৯

মালয়েশিয়া ভ্রমণ: কালের যাত্রাধ্বনি-৫

২০