২৬ আগস্ট ২০২৬, ৬:০০ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

সিআইএর সতর্কতা শোনেননি ট্রাম্প, নেতানিয়াহুর পরামর্শে যুদ্ধে জড়ান

ইরানের সঙ্গে গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধে জড়ানোর মাত্র কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওভাল অফিসে তাঁর গোয়েন্দাপ্রধানকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, পূর্ণমাত্রার হামলা চালানো ঠিক হবে কি না, তা জেনে নেওয়া।তবে প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ এক সহকারী ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁকে জানিয়েছিলেন, ইরান কয়েক দশকের মধ্যে এখন সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। এটি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করার এবং একজন ‘শান্তিদূত’ হিসেবে নিজের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি সুসংহত করার এক বিরল সুযোগ। তবে প্রশ্ন ছিল— বড় ধরনের এই হামলা আদৌ কাজ করবে কি না এবং তা সেখানকার শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করতে পারবে কি না।.যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক (ডিএনআই) তুলসী গ্যাবার্ড সে সময় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়নের একটি চিত্র তুলে ধরেন। ওই বৈঠকের বিষয়ে অবগত সূত্রে জানা গেছে, তিনি ট্রাম্পকে বলেছিলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা হলে সেখানে আরও কঠোরপন্থী এবং পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনে ইচ্ছুক একটি নতুন শাসনব্যবস্থা ক্ষমতায় আসতে পারে। জবাবে তেহরান দ্রুত হরমুজ প্রণালির চলাচল বন্ধ করে দেবে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তুলবে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনী ও তাদের অংশীদারদের ওপর ইরান হামলা চালাবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ও বিশ্বস্ততা নিয়ে মিত্রদের মনে প্রশ্ন তুলবে।সাবেক ডিএনআই প্রধানের সতর্কতার এই সুর ছিল ট্রাম্পকে সব পক্ষ থেকে দেওয়া সতর্কবাণীরই প্রতিধ্বনি। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্টকে জানিয়েছিলেন—এই যুদ্ধ প্রাণহানি ঘটাবে, অস্ত্রের মজুত নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করবে এবং ইতিমধ্যে চাপে থাকা মার্কিন বাহিনীর সক্ষমতায় ঘাটতি সৃষ্টি করবে।সব শঙ্কা পেছনে ফেলে ট্রাম্প ইসরায়েলির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পরামর্শ শুনে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার নির্দেশ দেন এবং ইরানের জনগণকে তাঁদের সরকার উৎখাতের আহ্বান জানান। যে যুদ্ধ ছয় সপ্তাহের মধ্যে শেষ করার প্রতিশ্রুতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দিয়েছিলেন, তা এখন প্রায় ছয় মাসে গড়িয়েছে। এই যুদ্ধ কবে শেষ হবে, তার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নেই।.ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দেশটিকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাচ্ছে। নিহত বাবার স্থলাভিষিক্ত হওয়া সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নেতৃত্বাধীন শাসনব্যবস্থা নতি স্বীকারের কোনো লক্ষণই দেখাচ্ছে না। যুদ্ধের এই অচলাবস্থা ট্রাম্পকে এমনকি কোনো পারমাণবিক চুক্তি ছাড়াই হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত হলে বিজয় ঘোষণার কথা ভাবতে বাধ্য করছে।.এখন ট্রাম্প অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার ওপর ভরসা রাখছেন। দিনের পর দিন এই অবরোধ মার্কিন বাহিনীকে ক্ষয়িষ্ণু করে তুললেও তাঁর আশা, এটি ইরানের অর্থনীতিকে গুঁড়িয়ে দেবে। সামরিক অভিযানে প্রায় তিন হাজার ইরানি এবং ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। পেন্টাগন জানিয়েছে, অতিরিক্ত ৭৫৬ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোর ক্ষতি করেছে, তেলের মজুত কমিয়েছে এবং গোলাবারুদের ভান্ডার খালি করেছে।এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই সংঘাত রিপাবলিকানদের জয়ের সম্ভাবনাকে সংকটে ফেলছে। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার সূচক তাঁর প্রেসিডেন্ট মেয়াদের সর্বনিম্ন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে।.হোয়াইট হাউস ও জাতীয় নিরাপত্তার সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা বলছেন, ট্রাম্প যা চান তা সহজে পাওয়ার কোনো উপায় নেই। তিনি এমন একটি চুক্তি চান, যা অনির্দিষ্টকালের জন্য ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমকে থামিয়ে দেবে এবং ইতিহাসের পাতায় তাঁকে একজন সফল যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তুলে ধরবে।.ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দুই প্রশাসনের অধীনই কাজ করা নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের ডেপুটি ভাইস প্রেসিডেন্ট এরিক ব্রিউয়ার বলেন, ‘এসবের প্রতিটি বিষয়ই অনুমেয় ছিল এবং আগে থেকেই এর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।’হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিতে পেন্টাগন ট্রাম্পকে নিরপেক্ষ ও সঠিক তথ্য সরবরাহ করেছে।.২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর সিআইএ ডিরেক্টর জন র‍্যাটক্লিফ এবং ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান ইরানবিষয়ক প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ মার-এ-লাগোতে এক তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠানে ঢুকে ট্রাম্পকে জানান, ইসরায়েল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে হত্যা করেছে। ট্রাম্প এতে এতটাই আনন্দিত হন যে তিনি তাঁদের এই খবর সমবেত অতিথিদের জানাতে বলেন। পুরো কক্ষ করতালি ও উল্লাসে ফেটে পড়ে।.তবে ট্রাম্পের এই উজ্জ্বল হাসি বেশি দিন টেকেনি। যুদ্ধক্ষেত্রের ক্ষতি এবং মার্কিন সরঞ্জাম ও ঘাঁটির ধ্বংসযজ্ঞ এই সংঘাত থেকে যুক্তরাষ্ট্র আসলে কী পাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সামরিক ক্ষতির পাশাপাশি যোগ হয় অস্থিতিশীল জ্বালানি বাজার। এপ্রিলের মাঝামাঝিও ট্রাম্প পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা এক বন্ধু প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধ শেষ করার পরামর্শ দেন। ১৭ জুন একটি অগ্রগতি আসে—প্রণালিটি আবার খুলে দেওয়ার জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ৬০ দিনের পারমাণবিক আলোচনার পথ প্রস্তুত করে।.জুন মাসের অন্তর্বর্তী চুক্তির পরপরই তেহরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে আবার হামলা শুরু করে। ট্রাম্প এটাকে নিজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বলে মনে করেন। হতাশাজনক এই বৃত্ত আবার ঘুরতে শুরু করে। পারমাণবিক আলোচনার ৬০ দিনের মেয়াদ ১৭ আগস্ট শেষ হয়ে গেছে। এর তিন দিন পর অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, ট্রাম্প এখন ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর অধীন সরকার পতন ঘটাতে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল নিয়েছেন। যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পর সেই পুরোনো সরকার পরিবর্তনের কৌশলই আবারও ফিরে এসেছে।

Source: https://www.prothomalo.com/world/usa/eumuunrqmj

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অঙ্গীকারের প্রশংসা করলেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী

১

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অঙ্গীকারের প্রশংসা করলেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী

২

ইসরায়েলের নির্বাচনে হারছে নেতানিয়াহুর জোট

৩

ইসরায়েলের নির্বাচনে হারছে নেতানিয়াহুর জোট

৪

নায়ক মান্নার ব্যবহৃত গাড়িতে আগুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার দুজন কারাগারে

৫

নায়ক মান্নার ব্যবহৃত গাড়িতে আগুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার দুজন কারাগারে

৬

বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের প্রতিবাদ, যন্ত্রাংশ ও দুটি গাড়ি নিয়ে গেলেন শেকৃবির শিক্ষার্থীরা

৭

বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের প্রতিবাদ, যন্ত্রাংশ ও দুটি গাড়ি নিয়ে গেলেন শেকৃবির শিক্ষার্থীরা

৮

জীবনানন্দের স্মরণে ভার্চ্যুয়াল পাঠচক্র

৯

জীবনানন্দের স্মরণে ভার্চ্যুয়াল পাঠচক্র

১০

মালয়েশিয়ায় ৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে বিডি এক্সপার্ট ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ-২০২৬

১১

মালয়েশিয়ায় ৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে বিডি এক্সপার্ট ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ-২০২৬

১২

বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণ জানতে তদন্ত কমিটি

১৩

বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণ জানতে তদন্ত কমিটি

১৪

কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুনে নিহত ১০ জনের মরদেহ স্বজনের কাছে হস্তান্তর

১৫

কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুনে নিহত ১০ জনের মরদেহ স্বজনের কাছে হস্তান্তর

১৬

হুমকিতে বন্ধ, রাজশাহীতে পুলিশের উপস্থিতিতে খুলল সার ডিলারের দোকান

১৭

হুমকিতে বন্ধ, রাজশাহীতে পুলিশের উপস্থিতিতে খুলল সার ডিলারের দোকান

১৮

‘নন্দিত নরকে’: মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্পে মানবজীবনের বেদনা

১৯

‘নন্দিত নরকে’: মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্পে মানবজীবনের বেদনা

২০