১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭:০০ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

ভারত ও পাকিস্তানের শিশুদের জীবন যেন খুচরো পয়সার মতো তুচ্ছ

গত সপ্তাহে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য মহারাষ্ট্রের অমরাবতীর একটি সরকারি হাসপাতালে নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) আগুন লেগে তিন নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে।এর দুই দিন পর পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের অন্যতম প্রধান সরকারি হাসপাতালে প্রসূতি ওয়ার্ডে আগুন লেগে মারা যায় ১৪ নবজাতক।অমরাবতীতে অগ্নিকাণ্ডের কারণ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ ভেন্টিলেটরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আর ইসলামাবাদে আগুনের সূত্রপাত হয় একটি এয়ারকন্ডিশনার বিস্ফোরণ থেকে। দুই দেশের সীমান্তের দুই পাশে সন্তান হারানো মা–বাবার হৃদয়বিদারক গল্প একই।দুই দেশেই বাবা-মায়েরা সরকারি হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে ঘটনার কোনো অর্থ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। অমরাবতীতে এক বাবা সন্তানের জন্মের আনন্দে তখনো মিষ্টি বিতরণ করছিলেন। তিনি তখনো নিজের সন্তানের মুখ দেখেননি। ইসলামাবাদে একটি পরিবার বহু বছর পর প্রথম পুত্রসন্তানের জন্ম উদ্‌যাপন করছিল।পরিস্থিতি আলাদা হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা এবং সরকারি প্রতিক্রিয়ায় ছিল একই চিত্র। উদ্ধারকারী দল দেরিতে পৌঁছেছে।.যুদ্ধ বাধলে পাকিস্তান ও ভারত— কার কী ক্ষতি হবে.পাকিস্তান, ভারত ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় বাংলাদেশ.জরুরি রোগী সরিয়ে নেওয়ার কাজও ব্যাহত হয়েছে হাসপাতালের মৌলিক অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে।রাজনীতিকেরা দ্রুত শোক প্রকাশ করেছেন। উচ্চপর্যায়ের তদন্তের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দেওয়া হয়েছে আর্থিক ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি। অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার নিরীক্ষার কথাও বলা হয়েছে।কিন্তু আগুনের ধোঁয়া মিলিয়ে যাওয়ার পর এই দুই ঘটনা একটি অত্যন্ত লজ্জাজনক সত্য সামনে আনে। দুই দেশেই দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের মানুষের জীবনকে যেন সহজেই বিসর্জন দেওয়া যায়।ক্রিকেট, সামরিক শক্তি প্রদর্শন এবং কূটনৈতিক কথার লড়াইয়ে ভারত ও পাকিস্তান পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনকে পকেটের খুচরো পয়সার মতো খরচ করার ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে আশ্চর্য মিল রয়েছে।২৬ বছর ধরে স্বাস্থ্যবিষয়ক সাংবাদিক হিসেবে আমি ভারত ও পাকিস্তানে হাসপাতালের অগ্নিকাণ্ড দেখেছি। বারবার এসব ঘটনায় বিপুল প্রাণহানি ঘটেছে। কিন্তু এসব হাসপাতালের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হয়নি।.ভারতে ২০১১ সালে এএমআরআই হাসপাতালে আগুনে ৮৯ জন মারা যান। ২০১৬ সালে ভুবনেশ্বরের এসইউএম হাসপাতালে আগুনে মারা যান ২৪ জন।এসব ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন লেখা ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। অথচ এসব ঘটনায় একজনকেও দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি।পাকিস্তানেও একই চিত্র। ২০১২ সালে লাহোরের সার্ভিসেস হাসপাতালে আগুনে ১০ নবজাতকের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালে সাহিওয়াল টিচিং হাসপাতালে আগুনে মারা যায় আরও ১১ শিশু।এই পুরোনো ঘটনাগুলো আমার মনে পড়ছে; কারণ, অমরাবতী ও ইসলামাবাদের সর্বশেষ আগুনকে শুধু ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতি বা কোনো ব্যক্তির অবহেলার ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এসব আগুন কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাসপাতালে লাগেনি।একটি ঘটনা ঘটেছে ভারতের সবচেয়ে ধনী রাজ্যে, অন্যটি ঘটেছে পাকিস্তানের রাজধানীতে।সরকারি তথ্য যত গভীরভাবে দেখা যায়, চিত্র ততই ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বছরের পর বছর ভারত ও পাকিস্তান নিজেদের নাগরিকদের আগুনের হাতে তুলে দিচ্ছে। যেন মধ্যযুগের সমাজের মতো উদাসীন কোনো দেবতাকে সন্তুষ্ট করতে মানুষ বলি দেওয়া হচ্ছে।.আমাদের শিশুরা কি এতটাই খরচযোগ্য.আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বলি কেন শিশুরা.প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো জ্ঞান বা সম্পদ ভারত ও পাকিস্তানের নেই, এ কথা বলা যাবে না। দুই দেশই দরিদ্র কিংবা যুদ্ধবিধ্বস্ত এমন দেশ নয়। তারপরও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন না আনার সিদ্ধান্ত একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আর এ সিদ্ধান্ত ক্ষমার অযোগ্য।দশকের পর দশক ভারত ও পাকিস্তান তাদের নাগরিকদের বোঝাচ্ছে যে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হলো একে অপরের কাছ থেকে সুরক্ষা। কিন্তু সত্য হলো, দুই দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে উঠেছে তাদের নিজেদের অসতর্ক ও দায়িত্বহীন সরকার।ভারত ও পাকিস্তানে কারখানা, বিপণিবিতান, হাসপাতালসহ বড় ভবনে আগুন লাগার ঘটনা নিয়মিত ঘটে।এর অন্যতম কারণ হলো অগ্নিনিরাপত্তা আইন যথাযথভাবে না মানা এবং ভবন নির্মাণবিধি প্রয়োগে কর্তৃপক্ষের দুর্বলতা।বারবার এমন ঘটনা ঘটলেও প্রশ্ন উঠছে আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ নিয়ে।এসব আগুন আসলে দুই দেশের গণতন্ত্রের গভীরতম বাস্তবতাই প্রকাশ করে। সরকার কোন বিষয়কে অগ্রাধিকার দেয় এবং কাদের জীবনকে মূল্যবান মনে করে, সেটিই এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।.ক্ষুধা আর ভয়ের মধ্যে যেভাবে বর্ণমালা শিখছে গাজার শিশুরা.গাজায় শিশুরা ক্ষুধায় মরছে, আমরা কী করছি.আর এসব প্রশ্নের উত্তরও যেন একই—অসহায়, অসুস্থ কিংবা দরিদ্র মানুষ অগ্রাধিকারের তালিকায় নেই।এ মাসের শুরুতেই ভারত ও পাকিস্তান—উভয় দেশ স্বাধীনতার ৭৯ বছর পূর্তি উদ্‌যাপন করেছে। ৭৯ বছর ধরে দুই দেশই নিজেদের জটিল ইতিহাস, গৌরবময় সংস্কৃতি, ভাষা ও খাবারের ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করে এসেছে।কিন্তু সীমান্তের দুই পাশেই মানুষ এমন এক নিষ্ঠুর অব্যবস্থার মধ্যে বসবাস করছে, যেখানে রাষ্ট্রের আচরণ প্রায় নির্মম।আমাদের দেশে গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক কাঠামো আছে। নির্বাচন আছে, প্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার ব্যাপারে সরকারের আগ্রহ খুবই কম।আমাদের শেখানো হয় দেশের জন্য ত্যাগ করতে। সম্পদ ত্যাগ করতে, পরিবারের সদস্যকে ত্যাগ করতে, এমনকি নিজের মর্যাদাও বিসর্জন দিতে। বিনিময়ে নিজেদের নিরাপত্তার ব্যবস্থাও যেন নিজেদেরই করতে হবে। সরকারের কাছে নিরাপত্তা আশা করা যাবে না।এ সপ্তাহে সীমান্তের দুই পাশে আগুনে পুড়ে সম্পূর্ণ অসহায় নবজাতকদের মৃত্যুর খবর দেখছিলাম। ভাবছিলাম, দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের কি কোনো লজ্জা হয়?.তাঁদের কি লজ্জা হয় এই ভেবে যে আগুন লাগার পর পরিবারগুলো দেখতে পেয়েছে, ওয়ার্ডের পানি ছিটানোর ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করছে না?

সবচেয়ে ভয়াবহ হলো, এসব পরিবারের অনেককে হয়তো সারা জীবন সেই দৃশ্যের সঙ্গে লড়াই করতে হবে—পোড়া শিশুদের কালো ছাইয়ে ঢাকা দেহ দেখার ভয়াবহ স্মৃতি নিয়ে।.তাঁদের কি লজ্জা হয় এই ভেবে যে সদ্য সন্তান জন্ম দেওয়া মায়েদের আগুন থেকে বাঁচতে কয়েকতলা সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নামতে হয়েছে; জানালা দিয়ে বের হতে হয়েছে; মই বেয়ে নামতে হয়েছে?তাঁদের কি লজ্জা হয় এই ভেবে যে আগুন লাগার পর পরিবারগুলো দেখতে পেয়েছে, ওয়ার্ডের পানি ছিটানোর ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করছে না?সবচেয়ে ভয়াবহ হলো, এসব পরিবারের অনেককে হয়তো সারা জীবন সেই দৃশ্যের সঙ্গে লড়াই করতে হবে—পোড়া শিশুদের কালো ছাইয়ে ঢাকা দেহ দেখার ভয়াবহ স্মৃতি নিয়ে।আমি ভাবছিলাম, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যখন কোনো নবজাতকের ওয়ার্ডের বাইরে কান্নারত মায়ের সামনে দাঁড়ান, তখন তাঁদের কাছে সামরিক শক্তি ও পারমাণবিক অস্ত্রের তুলনায় সাধারণ মানুষের জীবনের গুরুত্ব আসলে কতটা?বিদ্যা কৃষ্ণন অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও লেখক।আল–জাজিরা থেকে নেওয়া।ইংরেজি থেকে অনূদিত।

Source: https://www.prothomalo.com/opinion/column/7su2s8436y

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নিজের নামে রেলওয়েতে প্রায় কোটি টাকার বিল, জানেনই না গৃহিণী কোহিনূর

১

নিজের নামে রেলওয়েতে প্রায় কোটি টাকার বিল, জানেনই না গৃহিণী কোহিনূর

২

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪তম সমাবর্তনে আবেদন চার ধাপে, ১ নভেম্বর শুরু

৩

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪তম সমাবর্তনে আবেদন চার ধাপে, ১ নভেম্বর শুরু

৪

ইসরায়েলে ভোট চলছে, কেন্দ্রে কেন আরব ভোটারদের ভিডিও করছে নেতানিয়াহুর দল

৫

কালো স্যুটে গোলাপি পালকের ব্রোচ, নজর কাড়লেন লামিনে ইয়ামাল

৬

দ্বিতীয়বার খোলা হলো লালন আখড়াবাড়ির দানবাক্স, কত টাকা পাওয়া গেল

৭

ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে ভোটার টানতে নানা প্রতিশ্রুতি

৮

ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে ভোটার টানতে নানা প্রতিশ্রুতি

৯

মোদিকে বলুন জ্ঞানেশকে সরাতে, ৩০ সেকেন্ডে বিক্ষোভ বন্ধ হবে: দিল্লির ব্যবসায়ীদের রাহুল

১০

মোদিকে বলুন জ্ঞানেশকে সরাতে, ৩০ সেকেন্ডে বিক্ষোভ বন্ধ হবে: দিল্লির ব্যবসায়ীদের রাহুল

১১

অস্ট্রেলিয়ার ভিসানীতিতে কড়াকড়ি: বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও অভিবাসীদের করণীয় কী

১২

অস্ট্রেলিয়ার ভিসানীতিতে কড়াকড়ি: বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও অভিবাসীদের করণীয় কী

১৩

জুয়ার আসরে নিঃস্ব ওসমান মিয়া, হোমনা উপজেলায় আবারো জমজমাট ‘জুয়ার আসর’ ?

১৪

দাম্পত্যে সন্দেহ থেকে মধ্যবিত্তের গল্প, আলোচনায় কোন পাঁচ নাটক

১৫

দাম্পত্যে সন্দেহ থেকে মধ্যবিত্তের গল্প, আলোচনায় কোন পাঁচ নাটক

১৬

প্রকৃতি ও পরম্পরার সেতুবন্ধ

১৭

প্রকৃতি ও পরম্পরার সেতুবন্ধ

১৮

মালয়েশিয়া ভ্রমণ: কালের যাত্রাধ্বনি-৫

১৯

মালয়েশিয়া ভ্রমণ: কালের যাত্রাধ্বনি-৫

২০