৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০০ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

বেসরকারি খাতেও বেতনের সমন্বয় কেন জরুরি

সদ্য ঘোষিত সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নবম বেতনকাঠামো নিয়ে কয়েক দিন ধরে ব্যাপক আলোচনা চলছে। আলোচনা ও সমালোচনার মূলে বস্তুত চারটি বিষয় ঘুরেফিরে আসছে—বেতন বৃদ্ধির যৌক্তিকতা ও প্রয়োজনীয়তা; মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা; সরকারের আর্থিক সক্ষমতার চ্যালেঞ্জ এবং বেসরকারি খাতের বেতনকাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্য।অষ্টম বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ সময় পর ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় বর্তমানে বিদ্যমান সরকারি ২০টি গ্রেডের জন্য মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত জুলাই থেকে বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হলেও এই বৃদ্ধি একবারে নয়; বরং চার ধাপে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রথম ধাপে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে মূল বেতনের ৪০ শতাংশ, জানুয়ারি ২০২৭ সালে ৩০ শতাংশ, জুলাই ২০২৭ সালে ৩০ শতাংশ এবং ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে ভাতা কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।.সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পে স্কেল, বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য কী.বেসরকারি চাকরিজীবীদের কেন দ্বিতীয়-তৃতীয় শ্রেণির করে রাখা হবে?.নবম বেতন স্কেলের যৌক্তিকতার পরিপ্রেক্ষিতে বলা চলে যে অষ্টম বেতন স্কেলের পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে গত কয়েক বছরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে নতুন স্কেলের মাধ্যমে বেতনকাঠামোয় প্রয়োজনীয় পরিমার্জনা করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশেই এ ধরনের পরিমার্জনার মাধ্যমে বেতনকাঠামো যুগোপযোগী করার বিষয়টি একটি রুটিন বিষয় এবং তা নিয়মিতভাবেই করা হয়ে থাকে, যাতে করে প্রকৃত আয়ের ক্ষেত্রে সামঞ্জস্য বজায় থাকে। তাই বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যৌক্তিকতার চেয়ে সক্ষমতার বিষয়টি অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। বেতন স্কেল নিয়ে আলোচনার জায়গাটি মূলত সেখানেই।বেতন স্কেল নিয়ে আলোচনায় মানুষের শঙ্কার জায়গাটি মূলত মূল্যস্ফীতিকেন্দ্রিক—বাজারে অতিরিক্ত অর্থের সঞ্চালন মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন। .মনে রাখা জরুরি যে বেসরকারি খাত আমাদের দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তিই শুধু নয়, এর ওপর নির্ভর করে আছে অসংখ্য পরিবারের জীবনযাত্রা। তাই নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে সমগুরুত্ব দিয়ে ব্যক্তি খাতের বেতনকাঠামোয় প্রয়োজনীয় পরিমার্জনা করার সক্ষমতা তৈরি করা ধারাবাহিক মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত জরুরি।.এর পরিপ্রেক্ষিতে বলা চলে যে সাম্প্রতিক সময়ে, অন্তত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি মূলত উৎপাদন খরচকেন্দ্রিক, অর্থাৎ বিদ্যুৎ, গ্যাস, কাঁচামালসহ বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে উৎপাদন খরচ বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে দ্রব্যমূল্যে। এর পাশাপাশি টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্যমানের পরিপ্রেক্ষিতে আমদানি করা মূল পণ্য ও আমদানি করা কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ার ফলেও চাপ সৃষ্টি হয়েছে।সন্দেহ নেই যে বাজার ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত দুর্বলতা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিয়েছে। অপর পক্ষে বেতন বৃদ্ধির ফলে যদি অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ ও চাহিদার সৃষ্টি হয়, তা মূল্যস্ফীতি তখনই তৈরি করবে, যদি এই অতিরিক্ত চাহিদার সঙ্গে উৎপাদন ও জোগানের সঠিক ভারসাম্য না থাকে। এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংখ্যা মোট জনশক্তির ২ শতাংশের কাছাকাছি; তাই অতিরিক্ত চাহিদার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা অনেক কম। .বাজেটে এবারও বেসরকারি চাকরিজীবীদের ঘুমের মধ্যে বেতন কমে যাচ্ছে?.মহার্ঘ ভাতা: বেসরকারি চাকরিজীবীরা কি অনাদরেই পড়ে থাকবেন.তবে চাহিদার মাল্টিপ্লায়ার এফেক্ট ও বেসরকারি খাতের ক্ষেত্রে সমন্বয় বিবেচনা করা হলে তার কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে; ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হলে সেটিও বড় কোনো প্রভাব ফেলার কথা নয়। তবে এর পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগী আর বাজারব্যবস্থায় থাকা সুবিধাভোগীরা নতুন বেতন স্কেলের সুযোগে বাজারে কৃত্রিম সরবরাহ–সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বাজার ব্যবস্থাপনার গভীর তদারকি ও এর পাশাপাশি উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় দক্ষতা ও গতিশীলতা আনতে পারলে বেতন স্কেলের পরিমার্জনা বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করার কথা নয়।তবে মূল্যস্ফীতির আরেকটি উৎস হতে পারে বেতন স্কেলের অর্থায়নের প্রক্রিয়া—বেতন-ভাতার সমন্বয়ের জন্য যদি অভ্যন্তরীণ খাত (মূলত ব্যাংকিং খাত) থেকে ঋণ নেওয়া হয়, তাহলে এর প্রভাব বাজারে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা না গেলে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। বর্তমান মূল্যস্ফীতির পরিপ্রেক্ষিতে বেতন স্কেল বাস্তবায়নে এ ধরনের ঋণ গ্রহণ কিংবা টাকা ছাপানোর বিষয়টি এড়িয়ে চলা জরুরি। এর পাশাপাশি আর্থিক সমন্বয়ের জন্য বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ খাত থেকে যদি কাটছাঁট করা হয়, তাহলে সেটিও দীর্ঘ মেয়াদে সার্বিকভাবে অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনবে না।.নতুন বেতন স্কেলের বাস্তবায়ন ও অর্থায়নের বিষয়টি তাই করতে হবে সাবধানতার সঙ্গে, অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে। সরকার এ ক্ষেত্রে তিন ধাপে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রথম ধাপের বাস্তবায়ন হবে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। তাই ধাপগুলোর বাস্তবায়নের সময়, প্রয়োজনে অতিরিক্ত ধাপের সংযোজন, সংশ্লিষ্ট অর্থায়ন ইত্যাদি বিষয়ের ব্যবস্থাপনা যথোপযুক্ত হওয়া জরুরি।নতুন বেতন স্কেলের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জের জায়গাটি হচ্ছে বেসরকারি খাতের সঙ্গে বেতনকাঠামোয় অনেক ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যের অভাব। কিন্তু বেসরকারি খাতে, বিশেষ করে শিল্প ও সেবা খাতসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে একধরনের শ্লথগতি বিরাজমান। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ ও বেসরকারি বিনিয়োগের পরিসংখ্যান খুব একটা স্বস্তিদায়ক চিত্র দেখাচ্ছে না। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চলমান সংকটের কারণে একদিকে যেমন নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না, অপর দিকে বিদ্যমান কলকারখানা ও ব্যক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন বিঘ্নিত হচ্ছে। বেসরকারি খাতকে চাঙা করতে না পারলে শুধু কর্মসংস্থান কিংবা মজুরি ও বেতন নয়, টান পড়তে পারে রাজস্ব আদায়েও।.বেসরকারি খাতের সংস্কার কেন এখনই করতে হবে.বেসরকারি কর্মজীবীদের জন্য এবার আইন প্রণয়ন হবে কি.তাই নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে প্রণোদনা দেওয়া, ব্যবসা সহজীকরণের জন্য বাজেটে প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা, বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ জরুরি ভিত্তিতে নিশ্চিত করার মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে চাঙা করার কোনো বিকল্প নেই। এর পাশাপাশি মধ্য মেয়াদে, বেতন স্কেল বাস্তবায়নের একই সঙ্গে ন্যূনতম মজুরির ক্ষেত্র সম্প্রসারণের মাধ্যমে নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের মজুরির ক্ষেত্রে যাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, সে জন্য ব্যক্তি খাতকে উৎসাহিত করতে হবে।মনে রাখা জরুরি যে বেসরকারি খাত আমাদের দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তিই শুধু নয়, এর ওপর নির্ভর করে আছে অসংখ্য পরিবারের জীবনযাত্রা। তাই নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে সমগুরুত্ব দিয়ে ব্যক্তি খাতের বেতনকাঠামোয় প্রয়োজনীয় পরিমার্জনা করার সক্ষমতা তৈরি করা ধারাবাহিক মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত জরুরি।.সার্বিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে একদিকে যেমন সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন স্কেলের পরিমার্জনা সময়ের দাবি, অপর দিকে বেসরকারি খাতে নিয়োজিত বিপুলসংখ্যক কর্মীর বেতনের সঠিক সমন্বয়ও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি বেসরকারি অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শ্রমিকদের ওপর যাতে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি না হয় কিংবা অর্থনীতিতে অতিরিক্ত বৈষম্য সৃষ্টি না হয়, সেটির দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। দক্ষ রাজস্ব আহরণ, সুচিন্তিত ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও ব্যক্তি খাতের গতিশীলতার মাধ্যমেই এ ধরনের সমন্বয় সম্ভব।● সায়মা হক বিদিশা অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়* মতামত লেখকের নিজস্ব

Source: https://www.prothomalo.com/opinion/column/71f73zsuu4

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সকালেই পড়ুন আলোচিত ৫ খবর

১

আলভারেজ না পাজ—আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি কার

২

ছিনতাইকারীর কবলে এক রাত

৩

মা-বাবাকে নামাজের দাওয়াত যেভাবে দেবেন

৪

আরব দলগুলোর রেকর্ড সাফল্যের পর ‘ভোট চুরির’ অভিযোগ নেতানিয়াহুর দলের

৫

নির্যাতনের কথা জানাতে গভীর রাতে বাবাকে ভিডিও কল, সংযোগ বিচ্ছিন্ন, বাসায় গিয়ে পেলেন মৃত্যুর খবর

৬

নেতানিয়াহুকে সরাতে আরব দলগুলোর সঙ্গে ঐক্যের ডাক গোলানের

৭

বছরের শেষ নাগাদ পণ্যের দাম বাড়তে পারে ২৩ শতাংশ: বিশ্বব্যাংক

৮

পুলিশে সরাসরি এসআই নিয়োগ হবে ৪ হাজার, ৪০০-৫০০ এএসপি নিতে হবে বিশেষ বিসিএস

৯

ইরানে স্বর্ণপামজয়ী নির্মাতাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ

১০

নির্বাচনের আগের দিন বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

১১

চার জুটির চার রকম প্রেম, তিন নতুন মুখের অভিষেক

১২

বেশি বেতনে চীনে চাকরির প্রলোভন, পাচারের জন্য আটকে রেখে ১২ নারীকে নির্যাতন

১৩

ইসরায়েলে ভোট গণনা: নাটকীয়তা বাড়ছে

১৪

ইসির পরীক্ষা হবে আগামীকাল: ১১–দলীয় ঐক্য

১৫

দুই পা হারানো সাখাওয়াতের হাতে হুইলচেয়ার, ঘরে এক মাসের বাজার

১৬

গুলির শব্দ শুনে দৌড়ে গিয়ে দেখেন রক্তে বুক ভিজে যাচ্ছে স্বামীর, হাসপাতালে নিতে নিতে শেষ

১৭

বিজ্ঞান প্রাণহীন বিষয় নয়, বিজ্ঞান থেকে মানবিকতা বিচ্ছিন্ন করা যায় না

১৮

ধীরে এগোচ্ছে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’

১৯

ইসরায়েলে পার্লামেন্ট নির্বাচনে সরকার গঠনে অনিশ্চয়তা, কেউ পাচ্ছে না সংখ্যাগরিষ্ঠতা

২০