সন্ধ্যা ৭টার বিধিনিষেধ উপেক্ষা, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন রাইড ও শতাধিক স্টল চালু গভীর রাত পর্যন্ত; প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক | ফরিদপুর
দেশব্যাপী জ্বালানি তেলের সংকট মোকাবিলায় সরকার যখন কঠোর অবস্থানে, তখন মাঠপর্যায়ে সেই নির্দেশনার বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম বৈপরীত্য। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ রাখার কথা থাকলেও, ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজ প্রাঙ্গণে শুরু হওয়া শিল্প ও বাণিজ্য মেলায় যেন চলছে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে মেলায় বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের ভিড়, আর রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও জমে ওঠে আয়োজন। রঙিন আলোর ঝলকানি, উচ্চ শব্দে গান, আর একের পর এক বিদ্যুৎচালিত রাইড—সব মিলিয়ে পুরো এলাকা পরিণত হয় এক ব্যস্ত রাত্রিকালীন বিনোদন কেন্দ্রে। অথচ সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী এই সময়ে মেলার কার্যক্রম বন্ধ থাকার কথা।
মেলায় রয়েছে একাধিক উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ইলেকট্রনিক রাইড—নাগরদোলা, ব্রেক ড্যান্স, অক্টোপাস, ড্রাগন ট্রেনসহ বিভিন্ন আধুনিক বিনোদন যন্ত্র, যেগুলো চালাতে প্রয়োজন বিপুল বিদ্যুৎ। পাশাপাশি শতাধিক স্টলে চলছে পোশাক, কসমেটিকস, খেলনা, খাবারসহ নানা পণ্যের বেচাকেনা। অনেক স্টলে জেনারেটরের ব্যবহারও লক্ষ্য করা গেছে, যা সরাসরি জ্বালানি তেলের ব্যবহার বাড়াচ্ছে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“সরকার যখন জ্বালানি বাঁচাতে এত নির্দেশনা দিচ্ছে, তখন এই মেলায় প্রতিদিন রাত পর্যন্ত এত আলো আর বিদ্যুৎ অপচয় কীভাবে হচ্ছে? এটা তো স্পষ্ট নিয়মভঙ্গ।”
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মেলা কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবেই সময়সীমা লঙ্ঘন করছে। একাধিক স্টল মালিক জানিয়েছেন, রাত ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার জন্য তাদের মৌখিকভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, “রাতেই আসল ব্যবসা হয়”—এই যুক্তিতে বন্ধের সময় উপেক্ষা করা হচ্ছে।
এদিকে, মেলার ভেতরে প্রতিদিনই আয়োজন করা হচ্ছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সঙ্গীত পরিবেশনা ও বিভিন্ন বিনোদনমূলক কার্যক্রম, যা চলে রাত গভীর পর্যন্ত। এসব অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত সাউন্ড সিস্টেম ও লাইটিং সেটআপও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন, যা বিদ্যুৎ ব্যবহারের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনিক তদারকি নিয়ে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর করতে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। স্থানীয়দের দাবি, নিয়মিত নজরদারি ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান না থাকায় মেলা কর্তৃপক্ষ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
একজন সচেতন নাগরিক বলেন,
“আইন সবার জন্য সমান হওয়ার কথা। ছোট দোকানদারদের ওপর যদি অভিযান চালানো হয়, তাহলে এমন বড় আয়োজনের ক্ষেত্রে কেন ছাড় দেওয়া হচ্ছে?”
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি নির্দেশনা অমান্য করা স্পষ্টতই দণ্ডনীয় অপরাধ। এতে জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল এমনকি কারাদণ্ডের বিধানও থাকতে পারে। বিশেষ করে জাতীয় সংকটের সময় এমন অবহেলা আরও গুরুতর হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
জ্বালানি সংকটের এই প্রেক্ষাপটে রাজেন্দ্র কলেজ মেলার এই চিত্র শুধু একটি স্থানীয় অনিয়ম নয়, বরং সার্বিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার প্রতিফলন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের নিয়মভঙ্গ আরও বাড়তে পারে।
এখন প্রশ্ন একটাই—সরকারি নির্দেশনা কি শুধুই ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তবায়নে আসবে কার্যকর পদক্ষেপ? ফরিদপুরের এই আলো-ঝলমলে মেলা সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
মন্তব্য করুন