এস এম রিপন রুদ্র | সংবাদ বিডি
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত। সেই সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রিত রংপুর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের আওতাধীন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অনুষ্ঠিত একটি শিল্প ও বাণিজ্য মেলাকে ঘিরে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, মেলার আড়ালে অর্থের বিনিময়ে লটারির নামে ভাগ্য নির্ভর পুরস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিদিন মাইকিং করে টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে, আর রাত হলেই ইউটিউবে সরাসরি (লাইভ) সম্প্রচার করা হচ্ছে জুয়ার ড্র অনুষ্ঠান।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলার খোলাহাটী ক্যান্টনমেন্ট এলাকার হাসিনানগরে—যে এলাকার নাম আওয়ামী লীগ সরকারের সময় “হাসিনানগর” রাখা হয়েছিল—১৫ দিন হয়েছে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের উদ্যোগে শিল্প ও বাণিজ্য মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, মেলার মূল আকর্ষণ এখন শিল্প বা বাণিজ্য নয়; বরং লটারি নামক জুয়ার টিকিট বিক্রি এবং পুরস্কার ঘোষণা।
সরেজমিনে প্রতিবেদক শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত পাশ্ববর্তী জেলার পার্বতীপুর উপজেলা উপজেলা সহ রংপুর জেলার একাধিক উপজেলা ও মেট্রোপলিটন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে শিল্প মেলার নামে চটকদারি পুরষ্কারের ঘোষণা দিয়ে চলছে লটারির মাইকিং। লটারির প্রতিদিনের টিকিট মূল্য ২০ টাকা। যদিও প্রচার গাড়ির পিছনে লেখা আছে প্রবেশের টিকিটের উপর পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। দুই শতাধিক প্রচার গাড়ি এবং শতাধিক কাউন্টার বসিয়েছে চক্রটি।
সরেজমিনে অনুসন্ধানকালে কথা হয় সবজি বিক্রেতা আব্দুল কাদের মিয়ার সাথে বদরগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সবজি বিক্রি করে কোন মতে সংসার চালান আব্দুল কাদের মিয়ার টানাপোড়েনের সংসারে একটু ভালো থাকার আশায়। লটারিতে ভাগ্য বদলে যাওয়ার আশায় টানা ১১ দিন ধরে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫টি করে টিকিট কেটেও ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে পারেনি আব্দুল কাদের মিয়ার মতো অনেকে ভাগ্যের চাকা বদলানোর জন্য টিকিট কেটে নিঃস্ব হচ্ছে অনেকে।
এখন প্রশ্ন হলো যাদের হাতে দেশ রক্ষার দায়িত্ব তাদের হাতেই অপরাধের মশাল ?
ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড বলছে—মেলা তাদের আয়োজনে ?
বিষয়টি নিয়ে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের ক্যান্টনমেন্ট এক্সিকিউটিভ অফিসার নূরে তাসনিম-এর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,
“মেলাটি ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।”
তবে লটারি পরিচালনার অভিযোগ, এ কার্যক্রমের অনুমোদন বা আইনি ভিত্তি নিয়ে তিনি কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ইউএনও: উপজেলা প্রশাসনের কোনো অনুমতি নেই
অন্যদিকে বদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান, জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে কোন রকম অনুমতি নেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে লটারি বা এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনারও কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”
তবে অভিযোগের পরও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করেননি।
একদিকে ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড বলছে, মেলাটি তাদের আয়োজনে। অন্যদিকে উপজেলা প্রশাসন বলছে, তাদের কাছ থেকে কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি এবং লটারি পরিচালনারও অনুমতি দেওয়া হয়নি। তাহলে ঢাকঢোল পিটিয়ে লটারি নামক জুয়া খেলা কি ভাবে হচ্ছে ?
উপজেলা প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া মেলা পরিচালিত হচ্ছে কীভাবে ?
অভিযোগ অনুযায়ী পরিচালিত লটারি কার্যক্রমের অনুমোদন দিয়েছে কোন কর্তৃপক্ষ ?
প্রতিদিন ইউটিউবে যে লাইভ সম্প্রচার হচ্ছে, তার উদ্দেশ্য কী ?
অভিযোগের পরও দৃশ্যমান আইনগত পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণ কী?
স্থানীয়দের ভাষ্য, বিষয়টি কেবল একটি মেলার নয়; এটি আইন প্রয়োগ, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং জনস্বার্থের প্রশ্ন। তাদের দাবি, অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
মন্তব্য করুন