৮ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩২ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

১২ দিনে ১ হাজার ৮০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে শেষ হয় আমার শ্রীলঙ্কা অভিযান

একসঙ্গেই শুরু হয়েছিল এপি তালুকদার আর তহুরা সুলতানার সাইকেলে শ্রীলঙ্কা অভিযান। কিন্তু মাঝপথে আলাদা হয়ে যায় এই দুই বাংলাদেশি তরুণীর যাত্রা। এক হাজার কিলোমিটারের বেশি সাইকেল চালিয়ে দেশে ফিরেছেন একজন। অন্যজন সাইকেলে প্রদক্ষিণ করেছেন পুরো শ্রীলঙ্কা। এপি তালুকদার শোনালেন তাঁর অভিজ্ঞতা, শুনেছেন সজীব মিয়া.শ্রীলঙ্কায় সাইকেল চালানোর পরিকল্পনাটা আমার দুই বছরের। গত ডিসেম্বরে সব প্রস্তুতিও নিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু রওনা হওয়ার ঠিক আগে দেশটিতে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও ভয়াবহ ভূমিধস দেখা দিল। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের রেফারি হিসেবে কাজ করার সুবাদে শ্রীলঙ্কার একজন রেফারির সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। তিনি বার্তা পাঠিয়ে বললেন, ‘এখন আসবেন না, পরিস্থিতি ভালো নয়।’ পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতে হলো।আমি ঢাকার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করি। পুরো ডিসেম্বর ছুটি থাকলেও যাওয়া হলো না। তখনই ঠিক করি, জুলাই-আগস্টের সেশন ক্লোজিংয়ের ছুটিতে শ্রীলঙ্কা যাব। একদিন তহুরা সুলতানাকে বললাম, ‘চলো, শ্রীলঙ্কায় সাইকেল চালাই।’ আমাদের সংগঠন ‘অভিযাত্রী’র একটি অভিযানে অংশ নিতে একটি সাইকেল কিনেছিল ও। নেপালে ভ্রমণগাইড হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা আছে, তবে দীর্ঘ সাইকেল অভিযানের অভিজ্ঞতা ছিল না। তবু এককথায় রাজি হয়ে গেল।আমার নিজের সাইকেল চালানোর গল্পটাও একটু অদ্ভুত। ভালোভাবে সাইকেল চালানো শেখার আগেই একদিন ১১০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে ফরিদপুর চলে গিয়েছিলাম। এরপর ধীরে ধীরে সাইকেলে ঘুরেছি দেশের নানা প্রান্ত। তাই তহুরাকে নিয়ে খুব একটা দুশ্চিন্তা ছিল না। শুধু বলেছিলাম, যদি কোথাও মনে হয় আর এগোনো সম্ভব না, তাহলে সেখানেই পরিকল্পনা বদলে নেব।.১২ জুলাই ঢাকা থেকে ভারতের চেন্নাই হয়ে আমরা শ্রীলঙ্কার বন্দরনায়েক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামি। রাজধানী কলম্বো থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরত্বের শহর নিগম্বোতে এই বিমানবন্দর। পরদিন নিগম্বো থেকেই আমাদের যাত্রা শুরু। চার দিনে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে কাতুনায়াকা, পানাডুরা, উনাওয়াতুনা, ওয়ালাওয়া, আম্বালানতোতা হয়ে পৌঁছাই ওয়েললাওয়া। এই পথটুকুতে আমাদের সঙ্গে ছিলেন ভারতের একজন পরিচিত ভ্রমণকারী।এরপর হোটেলে সাইকেল রেখে বাসে রওনা দিই ২ হাজার ২৪৩ মিটার উচ্চতার অ্যাডামস পিকে। পরিকল্পনা ছিল নুয়ারা এলিয়া পর্যন্ত সাইকেলে গিয়ে সেখান থেকে বাসে পাহাড়ে উঠব। কিন্তু পাহাড়ি পথের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে পুরো পথই বাসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। গন্তব্যে পৌঁছাতে পাঁচটি বাস বদলাতে হয়েছিল।অ্যাডামস পিকের আশপাশে থাকার অনেক হোটেল আছে। কিন্তু আমি সব সময় স্থানীয় মানুষের বাড়িতে থাকার চেষ্টা করি। হোটেলে আরাম পাওয়া যায়, কিন্তু মানুষের বাড়িতে থাকলে গল্প পাওয়া যায়, মানুষকে কাছ থেকে চেনা যায়, তাদের জীবনকে অনুভব করা যায়।সেদিনও একটি পরিবারের কাছে থাকার অনুরোধ করলাম। প্রথমে তারা রাজি হচ্ছিল না। বললাম, চাইলে হোটেলে থাকতে পারি, কিন্তু আপনাদের সঙ্গেই থাকতে চাই। শেষ পর্যন্ত তারা রাজি হলো।রাতেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দারুণ সম্পর্ক হয়ে গেল। তাঁদের সন্তানেরা, এমনকি পুত্রবধূও ভিডিও কলে আমাদের সঙ্গে গল্প করলেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মনে হলো আমরা যেন বহুদিনের পরিচিত।.ভোরে পরিবারের ছোট ছেলেটি নিজেই বললেন, ‘আমাদের সঙ্গে অ্যাডামস পিকে যাবেন। পথে হঠাৎ নিজের দোকানে ঢুকে দুটি পানির বোতল আর দুটি ফান্টা এনে আমাদের হাতে দিলেন। অথচ আমরা নিজেদের জন্য পানি নিয়েই বের হয়েছিলাম। সম্পূর্ণ অচেনা একজন মানুষের এই আন্তরিকতা আমাকে গভীরভাবে ছুঁয়ে গিয়েছিল।’ট্রেকিং শেষে আবার সেই বাড়িতে ফিরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ওয়েললাওয়ার পথে ফিরলাম। সেখান থেকেই আমাদের পথ আলাদা হয়ে যায়। হারিয়ে যাওয়া লাগেজ সংগ্রহ করতে তহুরাকে কলম্বো যেতে হয়েছিল। আমি আবার ওয়েললাওয়া থেকেই একা সাইকেল চালানো শুরু করি। আর কলম্বো থেকে উত্তরের জাফনার দিকে নতুন করে যাত্রা শুরু করে তহুরা।আমার সামনে সময় কম ছিল। দেশে ফিরে স্কুলে যোগ দিতে হবে। তাই প্রতিদিনই চেষ্টা করেছি শত কিলোমিটারের বেশি পথ অতিক্রম করতে। কোমারি, এরাভুর, ত্রিনকোমালি, ভাভুনিয়া, পুনেওয়া ও পুত্তালাম হয়ে ২৪ জুলাই আবার নিগম্বো ফিরে আসি। ১২ দিনে প্রায় ১ হাজার ৮০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে শেষ হয় আমার এবারের শ্রীলঙ্কা অভিযান।২৬ জুলাই ঢাকায় ফিরে বারবার মনে হয়েছে, এই যাত্রার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি শুধু ১ হাজার কিলোমিটারের বেশি সাইকেল চালানো নয়। সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি পথের সেই মানুষগুলো, যারা বিনিময়ে কিছু না চেয়েও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, আপন করে নিয়েছে। ভ্রমণ শেষে তাই আমার বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে—মানুষই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।.ঢাকার রাস্তা পার হতে ভয় পাওয়া মেয়েটা সাইকেলে ঘুরছেন পুরো শ্রীলঙ্কা

Source: https://www.prothomalo.com/lifestyle/travel/12uppi528l

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

অস্ট্রেলিয়ার ভিসানীতিতে কড়াকড়ি: বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও অভিবাসীদের করণীয় কী

১

অস্ট্রেলিয়ার ভিসানীতিতে কড়াকড়ি: বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও অভিবাসীদের করণীয় কী

২

জুয়ার আসরে নিঃস্ব ওসমান মিয়া, হোমনা উপজেলায় আবারো জমজমাট ‘জুয়ার আসর’ ?

৩

দাম্পত্যে সন্দেহ থেকে মধ্যবিত্তের গল্প, আলোচনায় কোন পাঁচ নাটক

৪

দাম্পত্যে সন্দেহ থেকে মধ্যবিত্তের গল্প, আলোচনায় কোন পাঁচ নাটক

৫

প্রকৃতি ও পরম্পরার সেতুবন্ধ

৬

প্রকৃতি ও পরম্পরার সেতুবন্ধ

৭

মালয়েশিয়া ভ্রমণ: কালের যাত্রাধ্বনি-৫

৮

মালয়েশিয়া ভ্রমণ: কালের যাত্রাধ্বনি-৫

৯

ফ্রান্সের পর শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল বেলজিয়াম, আটক ১০৭

১০

‘সমকামী সাজিয়ে’ বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন, যুক্তরাজ্যে গ্রেপ্তার ৩

১১

ভোট লুটের অভিযোগ, কেঁদে রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা হুমায়ুন কবীরের

১২

ধর্ম, বর্ণ ও পরিচয় অধিকার ও সুযোগের ক্ষেত্রে বাধা হবে না: প্রধানমন্ত্রী

১৩

ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য কেনা হবে ১৪ লাখ টন ক্রুড অয়েল

১৪

এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০ উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করল বিমান

১৫

নিত্যপণ্যের যোগসাজশমূলক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ সংসদীয় কমিটির

১৬

আংটি পরানোর প্রথা কবে শুরু হলো

১৭

অণুর ডান–বাম রহস্য সমাধান করে রসায়নে নোবেল

১৮

আসামি মুঠোফোন ব্যবহার করতেন না, পাঁচ বছর পর যেভাবে পুলিশের জালে ধরা পড়লেন

১৯

২০৩৪ সালে আমরা কেমন অর্থনীতি চাই

২০