২৭ অক্টোবর ২০২৬, ৯:০২ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

প্রকৃতি ও পরম্পরার সেতুবন্ধ

রাজধানীর গুলশান ২-এ ১০৪ নম্বর রোডে নতুন প্রতিষ্ঠিত গ্যালারি হামিদুজ্জামানে ২ অক্টোবর শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী বাংলাদেশের শিল্পকলার বিভিন্ন প্রজন্ম, প্রবণতা ও সংবেদনের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে দেখার একটি উপলক্ষ। প্রত্যেকের কাজে ভিন্নতার মধ্যেও যেন প্রকৃতি ও পরম্পরার একটি সেতুবন্ধু লক্ষণীয়। প্রদর্শনীটি আগামী ১ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত দর্শকদের জন্য খোলা থাকবে।

কোথাও রং ও রেখার বিমূর্ত বিন্যাস, কোথাও প্রকৃতির নিবিড় উপস্থিতি, আবার কোথাও অবয়বের মধ্য দিয়ে অন্তর্লোকের অনুসন্ধান। এভাবেই প্রদর্শিত শিল্পকর্মগুলো নানা আঙ্গিক ও অভিব্যক্তিতে তুলে ধরেছে শিল্পের বহুমাত্রিক ভাষা, যা কেবল দৃশ্যমান বাস্তবতার অনুলিপি নয়, বরং শিল্পীর নিজস্ব অনুভব, উপলব্ধি ও অন্তর্দৃষ্টির সৃজনশীল প্রকাশ।

শিল্পী বীরেন সোমের ‘আমার মনের লাল রং’ এবং শাহানুর মামুনের ‘একাত্তরের চেতনা’র মধ্যে রং প্রয়োগের একটি লক্ষণীয় সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। দুই শিল্পীর প্রজন্মগত ব্যবধান থাকলেও ক্যানভাসে রং লেপনের স্বাধীনতা, পৃষ্ঠতলের সক্রিয়তা এবং দৃশ্য নির্মাণের প্রবণতায় কোথাও যেন মিল রয়েছে। বীরেন সোমের ক্যানভাসে লাল রং কেবল একটি বর্ণ নয়; তা হয়ে ওঠে মানসিক অনুভবের বিস্তার। অন্যদিকে শাহানুর মামুনের ল্যান্ডস্কেপধর্মী রঙের স্তর ও প্রয়োগ দৃশ্যমান প্রকৃতিকে অতিক্রম করে আবেগের নিজস্ব পরিসর তৈরি করে। এই সাদৃশ্যকে নিছক অনুসরণ বলা যায় না; বরং এর মধ্যে বাংলাদেশের শিল্পচর্চায় এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রবাহিত শৈল্পিক সংবেদনের আভাস মেলে।

বাংলাদেশের চিত্রকলায় প্রকৃতি বরাবরই এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। নদী, জল, আকাশ, মেঘ, দিগন্ত ও ঋতুবৈচিত্র্য এ দেশের শিল্পীদের মননে নানাভাবে ছাপ ফেলেছে। সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা বাংলার প্রকৃতি কখনো সরাসরি দৃশ্য হয়ে, কখনো রং ও রেখার বিমূর্ত ইশারায় ক্যানভাসে ফিরে আসে। এই প্রদর্শনীতেও প্রকৃতি কেবল চোখে দেখা কোনো ভূদৃশ্য নয়; শিল্পীর অন্তর্জগতের সঙ্গে তার এক নিবিড় সম্পর্ক অনুভব করা যায়।

শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের জলরঙের ল্যান্ডস্কেপে প্রকৃতির এই অন্তরঙ্গ রূপ বিশেষভাবে ধরা পড়ে। তাঁর রঙের সংযম, জলরঙের স্বচ্ছতা এবং দৃশ্য নির্মাণের মুনশিয়ানা প্রকৃতিকে নিছক অনুকরণে সীমাবদ্ধ রাখে না; বরং দৃশ্যের মধ্যে একধরনের নৈঃশব্দ্য ও অনুভবের গভীরতা তৈরি করে। শিল্পী মনিরুল ইসলামের জলরঙের বিমূর্তধর্মী কাজগুলোও স্বতন্ত্র শিল্প–সুষমায় উজ্জ্বল। সেখানে রং ও রেখা পরিচিত বস্তুর সীমা ছাড়িয়ে নিজস্ব অর্থ ও অনুভূতির জগৎ নির্মাণ করে।

রনজিৎ দাসের দিগন্তবিস্তৃত ল্যান্ডস্কেপে বাংলাদেশের নদীমাতৃক ভূপ্রকৃতির একটি সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ রূপ ধরা পড়ে। বিস্তৃত পরিসর, দূরত্বের অনুভব ও ভূদৃশ্যের বিন্যাস দর্শককে প্রকৃতির সঙ্গে একধরনের নীরব সংলাপে যুক্ত করে। শিল্পী আবদুল মান্নানের আকাশ, মেঘ ও জমিনের বিন্যাসেও বাংলার প্রকৃতির প্রতি এক নান্দনিক অনুরাগ লক্ষ করা যায়। শিল্পী রোকেয়া সুলতানা, কনক চাঁপা চাকমা ও আনিসুজ্জামান কাজেও প্রকৃতির নানা রূপ ও রঙের উপস্থিতি প্রদর্শনীর দৃশ্যভাষাকে বহুমাত্রিক করেছে।

তবে ‘বিয়ন্ড বাউন্ডারিজ’ শিরোনামের এই প্রদর্শনী কেবল প্রকৃতিনির্ভর শিল্পের প্রদর্শনী নয়। প্রকৃতির সঙ্গে এ অঞ্চলের আধ্যাত্মিকতা, প্রতীকী ভাষা ও প্রাচ্যশৈলীর যে দীর্ঘ সম্পর্ক, তারও পরিচয় মেলে কয়েকটি কাজে। শিল্পী আবদুস সাত্তারের ‘বুদ্ধ’ প্রতিকৃতিতে বুদ্ধের মুখাবয়ব, প্রশান্ত অভিব্যক্তি ও অলংকরণে ধ্যানমগ্নতার আবহ তৈরি হয়েছে। এখানে অবয়বের সৌন্দর্য শুধু দৃশ্যগত নয়, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অন্তরের প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক অনুভব। তাঁর শিল্পভাবনার দীক্ষা লাভ করা শিল্পী আফরোজা জামিল কঙ্কার ‘আমাসের কথা’ শীর্ষক কাজে দ্বিমাত্রিক রং লেপনে নারী মুখাবয়বে নিজস্ব প্রকাশ লক্ষণীয়। অন্যদিকে শওকাতুজ্জামানের মোরগের ছবিতে প্রাণীর অবয়বের মধ্য দিয়েই অভিব্যক্তির এক স্বতন্ত্র ভাষা তৈরি হয়েছে। চোখ, মুখ ও দেহভঙ্গি সেখানে নিছক জীবজগতের পরিচয় ছাড়িয়ে রূপক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি করে।

চিত্রকলার পাশাপাশি প্রদর্শনীতে ভাস্কর্যের উপস্থিতিও দর্শকের অভিজ্ঞতাকে প্রসারিত করেছে। কাওসার হাসান টগর ও আইভি জামানের ভাস্কর্যে দ্বিমাত্রিক ক্যানভাসের বাইরে ত্রিমাত্রিক রূপ, আয়তন ও পরিসরের আনন্দ অনুভব করা যায়। মাধ্যমের এই ভিন্নতা প্রদর্শনীর নামের তাৎপর্যকেও যেন আরও স্পষ্ট করে—শিল্পের প্রকাশ কোনো একটি মাধ্যম কিংবা নির্দিষ্ট রীতির মধ্যে আবদ্ধ নয়।

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের চিত্রকলার একটি উল্লেখযোগ্য প্রবণতা হলো বাস্তব দৃশ্যের আলোকচিত্রনির্ভর উপস্থাপনা এবং কারিগরি নিপুণতার প্রদর্শন। অবশ্য বাস্তবতার কাছাকাছি যাওয়া কিংবা প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন নিজে কোনো সীমাবদ্ধতা নয়। কিন্তু শিল্প যখন কেবল দৃশ্যের বিশ্বস্ত প্রতিরূপ নির্মাণে থেমে যায়, তখন তার অন্তর্লোক আবিষ্কারের সম্ভাবনা সংকুচিত হতে পারে। ‘বিয়ন্ড বাউন্ডারিজ’-এর নির্বাচিত কিছু কাজে রং, রেখা, রঙের স্বতঃস্ফূর্ততা ও বিমূর্ততার যে উপস্থিতি দেখা যায়, তা দর্শককে দৃশ্যের বাইরে অনুভবের জগতে প্রবেশের সুযোগ দেয়। যেমন শিল্পী বিপাশা হায়াত, কাজী সহিত ও কামাল উদ্দিনের শিল্পকর্মে বাস্তবধর্মী থাকলেও, উপস্থাপনার স্বাতন্ত্র্যে তা নিছক বাস্তবের প্রতিফলন না থেকে ভিন্নতর ভাবার্থ ও ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে।

রাজধানীর গুলশান ২-এ ১০৪ নম্বর রোডে নতুন প্রতিষ্ঠিত গ্যালারি হামিদুজ্জামানে ২ অক্টোবর শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী বাংলাদেশের শিল্পকলার বিভিন্ন প্রজন্ম, প্রবণতা ও সংবেদনের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে দেখার একটি উপলক্ষ বলা যায়। প্রত্যেকের কাজে ভিন্নতার মধ্যেও যেন প্রকৃতি ও পরম্পরার একটি সেতুবন্ধু লক্ষ্যণীয়। প্রদর্শনীটি আগামী ১ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত দর্শকদের জন্য খোলা থাকবে।

Source: https://www.prothomalo.com/onnoalo/arts/k054s1qjsm

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জুয়ার আসরে নিঃস্ব ওসমান মিয়া, হোমনা উপজেলায় আবারো জমজমাট ‘জুয়ার আসর’ ?

১

দাম্পত্যে সন্দেহ থেকে মধ্যবিত্তের গল্প, আলোচনায় কোন পাঁচ নাটক

২

দাম্পত্যে সন্দেহ থেকে মধ্যবিত্তের গল্প, আলোচনায় কোন পাঁচ নাটক

৩

প্রকৃতি ও পরম্পরার সেতুবন্ধ

৪

প্রকৃতি ও পরম্পরার সেতুবন্ধ

৫

মালয়েশিয়া ভ্রমণ: কালের যাত্রাধ্বনি-৫

৬

মালয়েশিয়া ভ্রমণ: কালের যাত্রাধ্বনি-৫

৭

ফ্রান্সের পর শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল বেলজিয়াম, আটক ১০৭

৮

‘সমকামী সাজিয়ে’ বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন, যুক্তরাজ্যে গ্রেপ্তার ৩

৯

ভোট লুটের অভিযোগ, কেঁদে রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা হুমায়ুন কবীরের

১০

ধর্ম, বর্ণ ও পরিচয় অধিকার ও সুযোগের ক্ষেত্রে বাধা হবে না: প্রধানমন্ত্রী

১১

ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য কেনা হবে ১৪ লাখ টন ক্রুড অয়েল

১২

এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০ উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করল বিমান

১৩

নিত্যপণ্যের যোগসাজশমূলক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ সংসদীয় কমিটির

১৪

আংটি পরানোর প্রথা কবে শুরু হলো

১৫

অণুর ডান–বাম রহস্য সমাধান করে রসায়নে নোবেল

১৬

আসামি মুঠোফোন ব্যবহার করতেন না, পাঁচ বছর পর যেভাবে পুলিশের জালে ধরা পড়লেন

১৭

২০৩৪ সালে আমরা কেমন অর্থনীতি চাই

১৮

‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ গান নিয়ে তাসরিফ খানের জিডি করার ঘোষণা

১৯

এক সেঞ্চুরিতে ১৮ ধাপ এগোলেন আইয়ার, বোলিংয়ে শীর্ষস্থান খোয়ালেন আবরার

২০