৫ অক্টোবর ২০২৬, ২:৩০ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

বাইরে শিলাবৃষ্টি, ভেতরে সনু নিগমের সুরের ঝড়

শনিবার বিকেল চারটার পর থেকেই সিডনিতে তুমুল শিলাবৃষ্টি ও বজ্রপাত। ঝড় এতটাই প্রবল ছিল যে গাড়ির সামনে কয়েক হাত দূরের কিছু দেখাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। সেই দুর্যোগ মাথায় নিয়েই আমরা গাড়ি চালিয়ে রওনা হলাম ডার্লিং হারবারের টিকটক এন্টারটেইনমেন্ট সেন্টারের দিকে। গন্তব্য—সনু নিগমের গান।

কেন্দ্রে পৌঁছে দেখা গেল সম্পূর্ণ বিপরীত এক দৃশ্য। বাইরে প্রকৃতির তাণ্ডব, ভেতরে মানুষের ঢল। প্রায় ৯ হাজার দর্শকে কানায় কানায় পূর্ণ বিশাল মিলনায়তন। হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য নির্ধারিত জায়গাগুলোতেও দর্শক। আক্ষরিক অর্থেই তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না।
এত মানুষের ভিড়েও ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা চোখে পড়েনি। দর্শকেরা যেমন সুশৃঙ্খলভাবে ভেতরে ঢুকেছেন, অনুষ্ঠান শেষে বেরিয়েছেন একইভাবে। কেন্দ্রটির ধারণক্ষমতাও প্রায় ৯ হাজার। সনু নিগমের ‘রেভোল্যুশন ট্যুর’-এর সিডনি পর্বটি আয়োজন করে সিনেস্টার ইভেন্টস।

এক দিন আগেই নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে কনসার্ট শেষ করে সিডনিতে এসেছিলেন সনু। সফরের কোনো ক্লান্তি তাঁর পরিবেশনায় ধরা পড়েনি। তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে গান, নাচ ও দর্শকদের সঙ্গে কথোপকথনে প্রাণবন্ত ছিলেন তিনি। সিডনির পর তাঁর অস্ট্রেলিয়া সফরের তালিকায় আছে মেলবোর্ন, ব্রিসবেন, অ্যাডিলেড ও পার্থ।
আমি কনসার্টে গিয়েছিলাম চিকিৎসক স্ত্রী বিলকিস আক্তার, মেয়ে জারা ও ছেলে জোহানকে নিয়ে। আয়োজকদের আমন্ত্রণ থাকলেও পরিবারের সবার জন্য টিকিট কেটেই অনুষ্ঠানটি দেখেছি। শিশুদের স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তার বিষয়টি সেখানে গুরুত্ব পেয়েছে। উচ্চ শব্দে কানের সমস্যা এড়াতে শিশুদের জন্য বিশেষ শব্দনিরোধক যন্ত্রের ব্যবস্থাও ছিল।
মঞ্চের শব্দ ও আলোর পরিকল্পনা গানের আবেগকে আরও গভীর করে তুলেছিল। কখনো উজ্জ্বল আলোয় ছড়িয়ে পড়েছে উচ্ছ্বাস, কখনো মৃদু আলো ও অন্ধকার তৈরি করেছে বিষণ্ন আবহ। ফলে গানগুলো শুধু শোনার নয়, দৃশ্যতও অনুভব করার অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছিল।

কখনো নীরবতা, কখনো উন্মাদনা
‘সন্দেসে আতে হ্যায়’ শুরু হতেই বদলে যায় মিলনায়তনের পরিবেশ। কিছুক্ষণ আগেও যাঁরা উচ্ছ্বাসে মেতে ছিলেন, মুহূর্তে নীরব হয়ে যান তাঁরা। পেছনের সারিতে বসা এক মধ্যবয়সী দর্শককে চোখ মুছতে দেখলাম। গানটি যেন প্রবাসজীবনের দূরত্ব, অপেক্ষা ও ফেলে আসা স্বজনদের স্মৃতি একসঙ্গে ফিরিয়ে আনছিল।
পরের মুহূর্তেই আবার ভিন্ন দৃশ্য। ‘ইয়ে দিল দিওয়ানা’ শুরু হতেই আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ান দর্শকেরা। শুরু হয় নাচ ও সম্মিলিত কণ্ঠে গান। একে একে আসে ‘সুরজ হুয়া মদ্ধম’, ‘তানহাই’ ও ‘পঞ্ছি নদিয়া পবন কে’।
‘অভি মুঝ মে কহিঁ’ গাইতে গিয়ে সনুর কণ্ঠ যখন উঁচু পর্দায় পৌঁছায়, পুরো মিলনায়তন যেন দম আটকে শুনছিল। শেষের দিকে তিনি ধরেন ‘কাল হো না হো’। ‘হার ঘড়ি বদল রহি হ্যায় রূপ জিন্দেগি’—পরিচিত এই পঙ্ক্তিতে তাঁর সঙ্গে গেয়ে ওঠেন ৯ হাজার দর্শক। মুঠোফোনের আলোয় পুরো মিলনায়তন তখন আলোর সমুদ্র।

কোটি টাকার বিশাল আয়োজন
কনসার্টটির অর্থনৈতিক পরিসরও ছিল চোখে পড়ার মতো। টিকিটের মূল্য ছিল ১০৯, ২০৯, ৩০৯ ও ৪৫০ অস্ট্রেলীয় ডলার। প্রায় ৯ হাজার আসন পূর্ণ হওয়ায় শুধু টিকিট বিক্রির অঙ্কই যে বিপুল, তা সহজেই অনুমেয়। তবে কোন শ্রেণির কতটি টিকিট বিক্রি হয়েছে, সেই বিস্তারিত হিসাব ছাড়া মোট আয় নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।
তারপরও উপমহাদেশের একজন শিল্পীকে ঘিরে অস্ট্রেলিয়ার একটি বড় মিলনায়তন পূর্ণ হওয়া, উচ্চ মূল্যের টিকিটেও এমন দর্শকসাড়া এবং পুরো আয়োজনের প্রযুক্তিগত ব্যাপ্তি—সব মিলিয়ে এটি ছিল বড় মাপের একটি সংগীতানুষ্ঠান।

ভাষা বুঝিনি, আবেগ বুঝেছি
দর্শকসারিই ছিল এই কনসার্টের সবচেয়ে বর্ণিল অংশ। সেখানে শুধু ভারতীয়রা ছিলেন না; এসেছিলেন বাংলাদেশি, পাকিস্তানি, নেপালি, ভুটানি, শ্রীলঙ্কান, মালদ্বীপীয় ও অস্ট্রেলীয় শ্রোতারাও।
কনসার্ট শেষে এক ভারতীয় দর্শক বললেন, ‘তাঁর গানে আমরা আমাদের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো ফিরে পাই। সনু নিগম আসলেই এক জাদুকর।’
এক অস্ট্রেলীয় দর্শকের অভিজ্ঞতা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বললেন, ‘আমি এই গানের ভাষা বুঝি না। কিন্তু শিল্পীর কণ্ঠের শক্তি ও আবেগ আমাকে প্রায় কাঁদিয়েছে। এটি দারুণ এক অভিজ্ঞতা।’
এক বাংলাদেশি দর্শক বললেন, ‘শ্রেয়া ঘোষাল হোক বা এ আর রহমান—বড় শিল্পীরা এলে বাংলাদেশিরা আসবেই। আজও দেখুন, কত চেনা মুখ। গানের তো কোনো সীমান্ত নেই।’
দেশে বসে রাজনীতি, কাঁটাতার ও পরিচয়ের নানা বিভাজন নিয়ে আমরা ব্যস্ত থাকি। অথচ প্রবাসে কোনো প্রিয় শিল্পীর গান সেই দেয়াল অনায়াসে সরিয়ে দেয়। বহু সংস্কৃতির দেশ অস্ট্রেলিয়ায় এ আর রহমান, শ্রেয়া ঘোষাল কিংবা সনু নিগমের মতো শিল্পীদের কনসার্ট হয়ে ওঠে নানা দেশের মানুষের মিলনস্থল।

সনু নিগম তাই সিডনিতে শুধু একটি কনসার্ট করেননি; কয়েক ঘণ্টার জন্য বহু দেশ ও প্রজন্মের মানুষকে একই আবেগে বেঁধেছিলেন। রাতের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটিও ছিল দর্শকসারিতে—ভারতীয়, বাংলাদেশি, পাকিস্তানি, নেপালি, ভুটানি, শ্রীলঙ্কান, মালদ্বীপীয় ও অস্ট্রেলীয় শ্রোতারা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে একই গান গাইছেন। বহু দেশ, বহু পরিচয়—সুরের ভেতর সবাই তখন এক।

Source: https://www.prothomalo.com/entertainment/song/pplkrdtiin

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

২০ বছর পর সার্জেন্ট পদে ৮৪ ও এসআই পদে ১৬২ জন যোগ দিচ্ছেন

১

বাল্যবিবাহ ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের সচেতন করলেন বন্ধুরা

২

বিদায়, জান্থি!

৩

জলবায়ু অর্থায়ন প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য

৪

বিধান পরিষদ নির্বাচন বিজেপি ও কংগ্রেসকে চিন্তায় ফেলে দিল

৫

সচিবালয় স্থানান্তরের প্রতিবাদে আগারগাঁওয়ে সড়ক অবরোধ শেকৃবির শিক্ষার্থীদের

৬

চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অধীনে চাকরি, পদ ১১

৭

দুর্বল হয়েছে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’, দেশের কিছু স্থানে বৃষ্টির সম্ভাবনা

৮

রাষ্ট্র যখন তার স্রষ্টাদের সম্মান জানাতে সংকটে পড়ে

৯

সকালেই পড়ুন আলোচিত ৫ খবর

১০

আলভারেজ না পাজ—আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি কার

১১

ছিনতাইকারীর কবলে এক রাত

১২

মা-বাবাকে নামাজের দাওয়াত যেভাবে দেবেন

১৩

আরব দলগুলোর রেকর্ড সাফল্যের পর ‘ভোট চুরির’ অভিযোগ নেতানিয়াহুর দলের

১৪

নির্যাতনের কথা জানাতে গভীর রাতে বাবাকে ভিডিও কল, সংযোগ বিচ্ছিন্ন, বাসায় গিয়ে পেলেন মৃত্যুর খবর

১৫

নেতানিয়াহুকে সরাতে আরব দলগুলোর সঙ্গে ঐক্যের ডাক গোলানের

১৬

বছরের শেষ নাগাদ পণ্যের দাম বাড়তে পারে ২৩ শতাংশ: বিশ্বব্যাংক

১৭

পুলিশে সরাসরি এসআই নিয়োগ হবে ৪ হাজার, ৪০০-৫০০ এএসপি নিতে হবে বিশেষ বিসিএস

১৮

ইরানে স্বর্ণপামজয়ী নির্মাতাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ

১৯

নির্বাচনের আগের দিন বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

২০