৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০০ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

আংটি পরানোর প্রথা কবে শুরু হলো

গ্রামের সাধারণ কোনো পরিবার হোক কিংবা শহরের শিল্পপতি কিংবা ধনকুবেরের বাড়ি—একটি বিষয় সবখানেই এক। এমনকি ধর্ম-বর্ণ, জাত-উপজাত এবং ধনী-গরিবসহ সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বের বহু স্থানে এই প্রথা চালু রয়েছে। এই প্রথার নাম আংটিবদল। বিয়ের সময় স্বামী তাঁর স্ত্রীকে এবং স্ত্রী তাঁর স্বামীকে আংটি পরানোর মাধ্যমে একটি পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হন।বিয়ের রীতিনীতি কিংবা ঐতিহ্যের অন্যতম একটি অংশ আংটিবদল। এই প্রথা প্রতিটি পরিবারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গেছে। তবে রীতির প্রচলন এমনি এমনি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস।.প্রাচীন রোমে নববধূকে আংটি পরানোনববধূকে আংটি পরানোর প্রথাটি প্রাচীন মিসরীয়দের হাত ধরে শুরু হয়েছিল বলে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন। অন্যদিকে বিয়ের আগে বাগদানের সময় আংটি পরানোর প্রথা প্রথম শুরু হয় প্রাচীন রোমানদের পারিবারিক ঐতিহ্য হিসেবে। রোমানরা আংটি পরানোকে নবদম্পতির মধ্যে সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে গণ্য করত। আর আইনি চুক্তি হিসেবে আংটি পরানোর রীতি চালু হয়েছিল, একজন নারী সদ্য বিবাহিত হয়েছেন তা বাহ্যিকভাবে প্রকাশ করার একটি উপায় হিসেবে।এই রীতি পালন তখনকার যুগে বর্তমান সময়ের মতো রোমান্টিকতা, প্রেম-ভালোবাসা প্রকাশ কিংবা জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না। তখন একজন নববধূকে লোহার তৈরি একটি আংটি পরিয়ে দেওয়া হতো। যা ছিল চুক্তি ও প্রতিশ্রুতির প্রতীক। এ ছাড়া রোমান যুগের কিছু ধনী পরিবারের নববধূরাও জনসমক্ষে সোনার আংটি পরতেন এবং পরে সোনার আংটির মধ্যে ‘ভালোবাসা’সূচক শব্দ খোদাই করে লিখে পরানো হতো।দ্বাদশ শতাব্দীতে রোমান ক্যাথলিক চার্চ তাদের ধর্মীয় রীতি হিসেবে বিয়েকে একটি পবিত্র রীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। সেই সঙ্গে বিয়ের সময় নববধূর আঙুলে আংটি পরানোর প্রথাকে রীতি হিসেবে গণ্য করা হয়। সে সময় বাগদানের আংটি এবং বিয়ের আংটি পৃথকভাবে দুবার করে পরানো হতো। প্রথম আংটি পরানো হতো বাগদানের সময়, যা বিয়ের প্রতিশ্রুতি হিসেবে ধরা হতো এবং দ্বিতীয়টি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বিয়ের সময় পরিয়ে দেওয়া হতো।.একই সময়ে ইহুদি ধর্মাবলম্বী পরিবারের বিয়ের অনুষ্ঠানেও আংটি পরানোটা প্রথা হয়ে ওঠে। পুরুষেরা নববধূর আঙুলে জমকালো নকশার আংটি পরিয়ে দিত এবং সেই আংটির মধ্যে খোদাই করা ছোট একটি ত্রিকোণাকৃতির নকশা থাকত, যা সাধারণত জেরুজালেমে অবস্থিত একটি ইহুদি মন্দিরের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। সেই আংটির স্থাপত্যশৈলীর কারণে অনুষ্ঠানের সাক্ষীরা এটি দেখতে পেত এবং এর মাধ্যমে বিয়েটি বৈধতা পেত। তবে এই দুর্লভ অলংকারটি সাধারণত অনুষ্ঠানের জন্যই ব্যবহৃত হতো বলে মনে করা হয় এবং নববধূর কাছে স্থায়ীভাবে রাখার অনুমতি ছিল না বলে ধারণা করা হয়। বিয়ের পরে এই আংটি পারিবারিক সম্পত্তির অংশ হয়ে যেত।বাগদানে হীরার আংটি কীভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেপঞ্চদশ শতাব্দীর দিকে বিভিন্ন ধরনের আংটির প্রচলন ছিল। যার মধ্যে ‘গিমেল রিং’ অন্যতম। এখানে সাধারণত দুই থেকে তিনটি পরস্পর সংযুক্ত ধাতু দিয়ে ব্যবহার করা হতো, আর প্রয়োজনবোধে সেগুলো আলাদা করা যেত। অন্যদিকে ‘পজি রিং’ নামক আংটির ওপরের অংশে ভালোবাসাপূর্ণ বিভিন্ন বাণী খোদাই করা থাকত।সেই সময় থেকে, বাগদানের আংটিতে হীরা যুক্ত করার প্রচলন ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। যদিও ১৪৭৭ সালে প্রথম নথিভুক্ত হীরার তৈরি বাগদানের আংটি ব্যবহৃত হয়েছিল। যা অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক ম্যাক্সিমিলিয়ানের সঙ্গে বার্গান্ডির ডাচেস মেরির বাগদানের জন্য তৈরি করা হয়েছিল এবং বলা হয়, সেটি নামের প্রথম অক্ষর ‘M’ আকৃতির ছোট ছোট হীরা দিয়ে সাজানো ছিল। যদিও ম্যাক্সিমিলিয়ান ডাচেস মেরিকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার আগেও হবু বধূকে হীরার বাগদানের আংটি উপহার দেওয়ার প্রথাটি অভিজাত পরিবারগুলোর মধ্যে ঐতিহ্য হিসেবে প্রচলন ছিল।.ম্যাক্সিমিলিয়ানের বাগদানের কয়েক শতাব্দী পরে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে বাগদানের জন্য হীরার আংটি উপহার দেওয়া স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। এর বিস্তার গড়ে ওঠার পেছনের কারণ ছিল, অষ্টাদশ শতাব্দীতে শিল্পবিপ্লবের সূচনা হওয়ার ফলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোতে সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যেও প্রসারিত হয়। আরেকটি কারণ, ১৮৬৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় হীরা আবিষ্কার হওয়ায় বৃহত্তর ও প্রভাবশালী জনগোষ্ঠীর কাছে এই অমূল্য রত্নটি সবার নাগালে চলে আসে। তবে বাগদানের হীরার আংটিকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে গিয়েছিল বিশ্বের বৃহত্তম হীরা উৎপাদনকারী ও পরিবেশক প্রতিষ্ঠান ডি বিয়ার্স। কোম্পানিটি ১৯৩৮ সাল থেকে বিজ্ঞাপন প্রচার অভিযান চালায় এবং ১৯৪৭ সালে অত্যন্ত সফলভাবে ‘হীরা চিরকালের জন্য’ (A Diamond is Forever) স্লোগানটি ব্যবহার করে। বলা হয়, এই স্লোগানে হীরার স্থায়িত্ব ও বিয়ের আজীবন প্রতিশ্রুতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।পুরুষেরা কেন এবং কখন থেকে আংটি পরা শুরু করলপুরুষেরা আংটি পরে বৈবাহিক জীবনের অবস্থা বোঝাতে। জার্মান লেখক গটহোল্ড এফ্রাইম লেসিং ১৭৬৭ সালে তাঁর কমেডি ‘মিন্না ফন বার্নহেম’-এর কাহিনির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে একজন পুরুষ ও একজন নারীকে হুবহু একই রকম দুটি আংটি পরে থাকতে দেখিয়েছেন। সেই সময়ের জন্য এটি ছিল বিরল দৃশ্য। কারণ, তখন পুরুষ ও নারীর একই রকম আংটি পরার রেওয়াজ সাধারণ ছিল না।.জাপানের স্বচ্ছ ছাতার আড়ালে হাজার বছরের কোন গল্প লুকিয়ে.১৯২০-এর দশকেও যুক্তরাষ্ট্রে পুরুষদের জন্য বিয়ের আংটি জনপ্রিয় অবস্থানে পৌঁছায়নি। অন্যদিকে ১৯০০-এর দশকের পরে চিলি, ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনার মতো দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি দেশে বিয়ের সময় পুরুষ ও নারী উভয়ের মধ্যে আংটি বিনিময়ের প্রচলন ছিল। অনেক ক্ষেত্রে বাগদানের সময় প্রত্যেকে তাঁদের ডান হাতের চতুর্থ আঙুলে একটি আংটি পরতেন এবং কোথাও কোথাও বিয়ের অনুষ্ঠানে সেই একই আংটিগুলো বাঁ হাতের চতুর্থ আঙুলে একে অপরকে পরিয়ে দিতেন।১৯২০-এর দশকের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের গয়না প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতারা পুরুষদের বিয়ের আংটিকে জনপ্রিয় করার জন্য একটি উদ্যোগ নেয়, কিন্তু তা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। পরে বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে পুরুষদের বিয়ের আংটি পরার প্রথাটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধরত সৈন্যদের বিয়ের আংটি পৌঁছে দেওয়া হতো। কারণ, এই আংটিগুলো সৈন্যদের দেশে থাকা স্ত্রী ও পরিবার-পরিজনদের কথা মনে করিয়ে দিত। ফলে পরিবারের কথা ভেবে তাঁরা মনোবল ধরে রাখতে পারতেন বলে মনে করা হতো।যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও এই প্রথাটি অব্যাহত ছিল। একটি হিসাব অনুযায়ী, ১৯৪০-এর দশকের শেষের দিকে প্রায় ৮০ শতাংশ বিয়েতে পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য আংটি বিনিময় করা হতো।বন্ধু, কক্সবাজার বন্ধুসভা এবং এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, গ্লোবাল অনবিক রিসার্চ হাবসূত্র: জেমোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট অব আমেরিকা, ব্রিটানিকা.সুতা নয়, মানুষের চুল দিয়ে তৈরি হয় শিল্প

Source: https://www.bondhushava.com/feature/0rz4majea7

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ঘরোয়াভাবে কাবিন হয়েছিল, বিয়ের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে, তার আগেই বর্ষার মৃত্যু

১

গবেষণার তথ্য: ফেসবুক ও মেসেঞ্জারে নারীর প্রতি সহিংসতা বেশি

২

পাকিস্তান সরকার ইমরান খানকে হত্যার চেষ্টা করছে: ছেলে সুলাইমানের অভিযোগ

৩

২০ বছর পর সার্জেন্ট পদে ৮৪ ও এসআই পদে ১৬২ জন যোগ দিচ্ছেন

৪

বাল্যবিবাহ ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের সচেতন করলেন বন্ধুরা

৫

বিদায়, জান্থি!

৬

জলবায়ু অর্থায়ন প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য

৭

বিধান পরিষদ নির্বাচন বিজেপি ও কংগ্রেসকে চিন্তায় ফেলে দিল

৮

সচিবালয় স্থানান্তরের প্রতিবাদে আগারগাঁওয়ে সড়ক অবরোধ শেকৃবির শিক্ষার্থীদের

৯

চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অধীনে চাকরি, পদ ১১

১০

দুর্বল হয়েছে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’, দেশের কিছু স্থানে বৃষ্টির সম্ভাবনা

১১

রাষ্ট্র যখন তার স্রষ্টাদের সম্মান জানাতে সংকটে পড়ে

১২

সকালেই পড়ুন আলোচিত ৫ খবর

১৩

আলভারেজ না পাজ—আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি কার

১৪

ছিনতাইকারীর কবলে এক রাত

১৫

মা-বাবাকে নামাজের দাওয়াত যেভাবে দেবেন

১৬

আরব দলগুলোর রেকর্ড সাফল্যের পর ‘ভোট চুরির’ অভিযোগ নেতানিয়াহুর দলের

১৭

নির্যাতনের কথা জানাতে গভীর রাতে বাবাকে ভিডিও কল, সংযোগ বিচ্ছিন্ন, বাসায় গিয়ে পেলেন মৃত্যুর খবর

১৮

নেতানিয়াহুকে সরাতে আরব দলগুলোর সঙ্গে ঐক্যের ডাক গোলানের

১৯

বছরের শেষ নাগাদ পণ্যের দাম বাড়তে পারে ২৩ শতাংশ: বিশ্বব্যাংক

২০