নাবিদ হোসাইনের সঙ্গে জুমরাতুন নেছা বর্ষার (২৪) প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে মা–বাবার আপত্তি ছিল। কিন্তু মেয়ে এই সম্পর্ক নিয়ে অনেক বেশি ‘সিরিয়াস’ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর নাবিদের সঙ্গে বর্ষার বিয়ের কাবিন হয়। এরপর এক বছরের সংসারজীবনে বেশ কয়েকবার নাবিদের নির্যাতনের শিকার হন বর্ষা, নাবিদ বারবার ব্যবসার অজুহাতে শ্বশুরবাড়ি থেকে টাকাও নিয়েছেন। তবু বর্ষা বারবার তাঁর কাছেই ফিরে যান। আগামী ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে তাঁদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এর আগেই বর্ষার মৃত্যু হলো। বর্ষার পরিবারের সদস্যরা জানান, গত মঙ্গলবার মধ্যরাতেও বর্ষাকে মারধর করছিলেন নাবিদ। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে রাত ১২টার দিকে বর্ষা তাঁর বাবা শেখ মনোয়ার হোসেনের ফোনে ভিডিও কল করে চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘বাবা, আমাকে বাঁচাইতে আসো।’ ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে মা–বাবা শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু সেখানে গেলে নাবিদের পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁদের বলা হয়, বর্ষা ‘আত্মহত্যা’ করেছেন। পরে বর্ষার মরদেহ রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।.বর্ষার পরিবার এ ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে মানতে রাজি নয়। তাঁর মা হাসিনা আক্তার আজ বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা আত্মহত্যা হতে পারে না। মেয়ের যদি আত্মহত্যা করারই হতো, তাহলে তো আমাদের ডাকত না। শেষ ভিডিও কলে মেয়ে চিৎকার করে বলছিল, বাবা আমাকে বাঁচাইতে আসো।’এ ঘটনায় তেজগাঁও থানায় হত্যা মামলা করেছেন বর্ষার বাবা শেখ মনোয়ার হোসেন। ঘটনার রাতে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকেই নাবিদকে পুলিশে ধরিয়ে দেয় বর্ষার পরিবার। এ বিষয়ে তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেছেন, যৌতুকের দাবিতে বিভিন্ন সময় বর্ষাকে মারধর করতেন তাঁর স্বামী নাবিদ হোসাইন। বর্ষার শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় বর্ষার বাবা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। পরে হাসপাতাল থেকে নাবিদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।.শেখ মনোয়ার হোসেন ও হাসিনা আক্তার দম্পতির তিন মেয়ে। তাঁদের মধ্যে বর্ষা ছিলেন দ্বিতীয়। উচ্চমাধ্যমিকের পড়াশোনা শেষে ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষে ঢাকার তেজগাঁও কলেজে স্নাতক প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছিলেন বর্ষা। কলেজে থাকতেই নাবিদ হোসাইনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। পরে বর্ষা এই সম্পর্কের বিষয়টি মা-বাবাকে জানান।বর্ষার মা হাসিনা আক্তার বলেন, ‘আমরা নাবিদের সঙ্গে বর্ষার বিয়ে দিতে চাইনি। আমরা মেয়েকে বুঝিয়েছি এই ছেলে ভালো নয়। কিন্তু মেয়ে ওকেই বিয়ে করতে অনড় ছিল। পরে দুই পরিবারের উপস্থিতিতে ঘরোয়াভাবে ওদের বিয়ে হয়। বিয়ের কিছুদিন আগে নাবিদ আমার মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ করে দিল। মানে, ও আর পড়াশোনা করুক, তা নাবিদ চায়নি।’নাবিদের পাশাপাশি তাঁর মায়েরও বর্ষাকে বউ করে নেওয়ার আগ্রহ ছিল বলে জানান হাসিনা আক্তার। তিনি বলেন, ‘নাবিদের মা নুরুন নাহার দুই দিন পরপরই ফোন করে বলতেন, কাবিনটা করিয়ে দেন। ছেলে–মেয়ে একসাথে ঘোরাফোরা করে, এটা তো খারাপ। কোনো অঘটন হইলে তো মুখ দেখানো যাবে না। কাবিন করায় রাখেন, অনুষ্ঠান পরে কইরেন। সে জন্যই ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর কাজি এনে ঘরোয়াভাবে নাবিদের মা-বাবা ও আমাদের উপস্থিতিতে বিয়ে দেওয়া হয়। পরে আর অনুষ্ঠান করা হয়নি। এবারের ডিসেম্বর–জানুয়ারিতে একটা অনুষ্ঠান কইরা ছেলেকে আংটি, ফার্নিচার ইত্যাদি দেওয়ার কথা ছিল।’.নাবিদ হোসাইন প্রায়ই বর্ষার ওপর নির্যাতন করতেন। পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছয়-সাত মাস আগে একবার বর্ষাকে মেরে মাথা ফাটিয়েছিলেন নাবিদ। বর্ষার মা হাসিনা আক্তার বলেন, ‘সে সময় বর্ষাকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে নিয়ে সেলাই-টেলাই করিয়ে নিয়ে আসছি। হাসপাতালে পুলিশ তথ্যও নিয়েছিল। কিন্তু হাসপাতাল থেকে বাসায় আনার পর বর্ষা বাবাকে বলেছিল “থাক, বাবা। ওকে কিছু বইল না।” মেয়ে নাবিদের বিরুদ্ধে কিচ্ছু করতে দেয়নি। পরে আমরা আর মামলা-মোকদ্দমায় যাইনি।’এই ঘটনা ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে নাবিদ বর্ষার গায়ে হাত তুলেছেন, এমন অভিযোগ পরিবারের। মা হাসিনা আক্তার বলেন, নাবিদ বর্ষাকে সন্দেহ করত। কারও সঙ্গে কথা বলতে দিতে চাইত না। অনেকবারই বর্ষা বাবাকে ফোন করে বলত, ‘আব্বু, এসে আমাকে নিয়ে যাও, আমি আর এখানে থাকব না।’ দুদিন না যেতেই নাবিদ ফোন করলে সে আবার ফিরে যেত।বর্ষার মা বলেন, ‘মেয়ে আমাদের সবটা বলত না। আমাদের চোখে পড়লে মেয়েকে বোঝাতাম যে এটা কোনো জীবন না, মানুষের দুইটা বিয়ে হয়। তুমি ওকে বাদ দিয়ে দাও। কিন্তু মেয়ে বলত, নাবিদ ভালো হয়ে যাবে, আমরা ভালোই আছি ইত্যাদি। ওর মনের ভেতর কী ছিল, সেটা আমরা বলতে পারি না। মেয়েকে বাড়ি এনে আটকে রাখলেও ওর কাছে ছুটে চলে যেত। মেয়ে ওর জন্য পাগল ছিল।’.বর্ষার বাবা শেখ মনোয়ার হোসেন জমি কেনাবেচার ব্যবসা করেন। তাঁরা লালবাগে থাকেন। সেখানে নিজেদের মালিকানাধীন দুটি ফ্ল্যাট থেকে ভাড়াও পান। বর্ষার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কিছুদিন পর থেকেই নাবিদ হোসাইন ব্যবসার অজুহাতে বর্ষার বাবার কাছে টাকা চাইতে শুরু করেন বলে জানান স্বজনেরা।বর্ষার মা হাসিনা বলেছেন, ‘বিয়ের কিছুদিন পর থেকে নাবিদ টাকা চাইতে শুরু করে। বর্ষাকে বলত, আমি ব্যবসা করব, তোমার বাবাকে বলো এক লাখ টাকা দিতে। অসুস্থতার কারণে আমার স্বামীর আয় আগের মতো নেই। তারপরও নাবিদ এ রকম করে অনেকবার টাকা নিয়েছে। আর আমার মেয়ের সঙ্গে ওর বাবার সম্পর্ক অনেক গভীর ছিল। মেয়ে যখন যা চাইত, বাবা দিয়ে দিত। আমি অনেক সময় রাগ করতাম। সে জন্য আমাকে এ বিষয়ে বলতও না।’.নির্যাতনের কথা জানাতে গভীর রাতে বাবাকে ভিডিও কল, সংযোগ বিচ্ছিন্ন, বাসায় গিয়ে পেলেন মৃত্যুর খবর.বর্ষার মা জানান, নাবিদের বাবা–মায়ের আর্থিক অবস্থাও ভালো। নাবিদ তাঁদের কাছ থেকেও টাকা নিতেন। হাসিনা আক্তারের বক্তব্য, ‘তাঁর কোনো বাজে অভ্যাস আছে হয়তো। নাবিদ যেভাবে আমার মেয়েকে মারত, সেটা নেশাখোর না হলে সম্ভব নয়। নাবিদ নিজের মা-বাবার সঙ্গেও রাগারাগি করত। তাই তাঁরাও তাঁকে কিছু করতে পারত না। বর্ষাকে মারধরের পরপর তাঁর রাগ করে বাড়িতে চলে এলে শাশুড়ি বলতেন, বর্ষাকে দিয়ে যান, রিস্ক (ঝুঁকি) আমাদের।’বর্ষার পরিবারের অভিযোগের বিষয়ে জানতে নাবিদ হোসাইনের বাবা মঞ্জুর হোসেন ও মা নুরুন নাহারের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে প্রথম আলো। একাধিকবার কল করা হলেও তাঁরা সাড়া দেননি। পরে পরিচয় দিয়ে তাঁদের খুদে বার্তা পাঠান এই প্রতিবেদক। এরপর তাঁরা মুঠোফোন বন্ধ করে দেন।
Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/crime/1gqy3dhtg0
মন্তব্য করুন