প্রচলিত বিশ্বাস, এদিন সন্ধ্যায় ১৪টি প্রদীপ জ্বালানোর পাশাপাশি খেতে হয় ১৪ রকম শাক। কিন্তু কেন খাওয়া হয় ১৪ শাক? আর কোন কোন শাক থাকে এই তালিকায়?
, কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথি। বাঙালি হিন্দু পরিবারে দিনটি পরিচিত ভূত চতুর্দশী নামে। প্রচলিত বিশ্বাস, এদিন সন্ধ্যায় ১৪টি প্রদীপ জ্বালানোর পাশাপাশি খেতে হয় ১৪ রকম শাক। লোকাচার ও ধর্মীয় বিশ্বাসের এই রীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রকৃতি, ঋতু পরিবর্তন এবং প্রাচীন ভেষজচর্চার নানা গল্প। কিন্তু কেন খাওয়া হয় ১৪ শাক? আর কোন কোন শাক থাকে এই তালিকায়?
১৪ শাক খাওয়ার রীতি কেন?
ভূত চতুর্দশীতে ১৪ শাক খাওয়ার রীতি বহু পুরোনো। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এদিন ১৪ শাক খেলে অশুভ শক্তির প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। তবে এর পেছনে রয়েছে ঋতুভিত্তিক খাদ্যাভ্যাসের একটি দিকও। শীতের আগমনে আবহাওয়া ও পরিবেশের পরিবর্তন ঘটে। এ সময় নানা ধরনের দেশি শাক খাওয়ার মধ্য দিয়ে শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
, কোন কোন শাক থাকে তালিকায়? কী তাদের গুণ?
অঞ্চলভেদে ১৪ শাকের নাম ও তালিকায় কিছু পার্থক্য দেখা যায়। প্রচলিত তালিকায় রয়েছে ওল, বেতো, সর্ষে, নিম, গুলঞ্চ, শুষনি, হেলেঞ্চা, জয়ন্তী, শাঞ্চে, কালকাসুন্দে, পলতা, ভাটপাতা, কেঁউ ও শৌলফ। চলুন এবারে এই শাকগুলোর গুণাগুণ জেনে নিই।
১. ওল শাক
ওল আমাদের পরিচিত কন্দজাতীয় খাবার। এর কচি পাতা ও কন্দ খাওয়া হয়। আয়ুর্বেদে ওলের কন্দ হজমের বিভিন্ন সমস্যা ও অর্শের চিকিৎসায় ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে।
, ৩. সর্ষেশাক
এই শাক ভিটামিন কে, সি ও ই-এর পাশাপাশি ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম ও আয়রনের উৎস।
, ৫. শুষনি শাক
এই শাক বেশ পরিচিত ভেষজ উদ্ভিদ। লোকজ ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় ঘুমের সমস্যা, মানসিক চাপ ও মাথাব্যথায় এর ব্যবহারের কথা বলা হয়। হেলেঞ্চা শাক জলজ উদ্ভিদ। এতে রয়েছে বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান। জয়ন্তী, কেঁউ, কালকাসুন্দে ও পলতাও ঐতিহ্যগত ভেষজচর্চায় ব্যবহৃত হয়।
, ৭. শৌলফ শাক
এটি মূলত ‘ডিল লিভস’ (Dill leaves) বা মৌরি গোত্রের একটি সুগন্ধি শাক। এর পাতাগুলো খুব চিকন ও সুতোর মতো হয়। হজমশক্তি বাড়াতে এবং পেটের সমস্যা দূর করতে এটি বেশ উপকারী।
, ৯. কলকাসুন্দা পাতা
এটি একটি ঔষধি গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। পাতা অ্যালার্জি, কোষ্ঠবদ্ধতা, কফ, জ্বর ও ক্ষত সারাতে ব্যবহৃত হয়। মূলের ক্বাথ ঋতুস্রাবের যন্ত্রণা উপশমে কাজে লাগে।
, ১১. কেঁউ শাক
এটি মূলত রসালো ও ভেষজ গুণসম্পন্ন একটি উদ্ভিদ যা সাধারণত ভূত চতুর্দশী বা কালীপূজার আগের দিন ১৪ শাকের অন্যতম হিসেবে খাওয়া হয়। এটি হজম শক্তি বৃদ্ধি করে। বাতের ব্যথা (আর্থ্রাইটিস) ও নানা ধরনের চর্মরোগ প্রতিরোধে এই শাকের রস উপকারী বলে ভেষজ শাস্ত্রে উল্লেখ আছে।
, ১৩. জয়ন্তী পাতা
জয়ন্তী গাছের কচি পাতা শাক হিসেবে বা ভেষজ কাজে ব্যবহৃত হয়। দুর্গাপূজার নবপত্রিকাতেও এর ব্যবহার রয়েছে। বাত ও শূলের ব্যথা কমাতে জয়ন্তী পাতার প্রলেপ বা ব্যবহার প্রচলিত আছে। ডায়াবেটিস বা মধুমেহ রোগের প্রাথমিক অবস্থায় এবং শ্বেতী রোগের চিকিৎসায় প্রাচীনকাল থেকেই এর ব্যবহার হয়ে আসছে।
, খাওয়ার আগে সতর্কতা
১৪ শাকের প্রতিটিরই রয়েছে আলাদা স্বাদ ও পুষ্টিগুণ। তবে আয়ুর্বেদে কোনো উদ্ভিদের ঔষধি ব্যবহারের উল্লেখ থাকলেই সেটি সব রোগের চিকিৎসা, এমনটা ভাবার কারণ নেই। এসব শাক খেলে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ে বা নির্দিষ্ট রোগ সেরে যায়, এমন দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণও নেই। বিশেষ করে বুনো শাক সংগ্রহের ক্ষেত্রে সঠিক উদ্ভিদ চেনা জরুরি। বিষাক্ত উদ্ভিদের সঙ্গে দেখতে মিল থাকলে বিপদ হতে পারে। তাই পরিচিত ও নিরাপদ উৎস থেকে শাক সংগ্রহ করে ভালোভাবে ধুয়ে রান্না করে খাওয়াই ভালো। ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকজ ঐতিহ্য আর প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক—সব মিলিয়েই ১৪ শাক খাওয়ার এই প্রথা। উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি দেশি শাকের বৈচিত্র্য ও পুষ্টিগুণের সঙ্গে পরিচিত হওয়ারও এটি একটি সুন্দর উপলক্ষ।
সূত্র : উইকিপিডিয়া, মা-মাসি কিচেন, দ্য লোকাল ফুড ক্লাব
ছবি : উইকিপিডিয়া, ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রাম
Source: https://www.haal.fashion/food/rlbcgyvrf7
মন্তব্য করুন