৪ নভেম্বর ২০২৬, ৫:০০ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

তৃতীয় ভাষা চালুর আগে প্রস্তুতি কতটুকু

সরকার নতুন শিক্ষাক্রমে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আরেকটি বিদেশি ভাষা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উদ্যোগটি ভালো। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা আছে। আগে ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল। স্কুলপর্যায়ে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে এই ভাষা চালুর ভাবনাও রয়েছে। আটটি ভাষার মধ্যে আছে আরবি, চীনা, জাপানি, কোরীয়, ফরাসি, জার্মান, স্প্যানিশ ও ইতালীয়। এসব ভাষা জানলে উচ্চশিক্ষা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানের নতুন পথ খুলতে পারে। তবে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি কতটা, সেটিই বিবেচনার বিষয়।বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন আর দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাজার হাজার স্কুলে বিদেশি ভাষা শেখানোর ব্যবস্থা করা এক বিষয় নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলা তুলনামূলকভাবে সহজ। সেখানে অবকাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে। কিন্তু প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে একই সুযোগ তৈরি করা অনেক জটিল। প্রয়োজনীয় শিক্ষক কোথায় পাওয়া যাবে, এটি বড় প্রশ্ন। স্কুলপর্যায়ে তৃতীয় ভাষা পড়ানোর জন্য অনেক শিক্ষক লাগবে। বিপুলসংখ্যক দক্ষ শিক্ষক রাতারাতি তৈরি করা সম্ভব নয়। .‘রেমিট্যান্সের ভাষা’ আরবি, তবু প্রশিক্ষণে এত অবহেলা কেন.আরবি, চীনা, জাপানি, কোরীয় বা ইতালীয় ভাষা পড়ানোর জন্য শুধু ভাষাজ্ঞান থাকলেই হয় না; দরকার শিক্ষাদানের প্রশিক্ষণ, শিক্ষার্থীদের বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী পাঠদানপদ্ধতি এবং নিয়মিত মূল্যায়নের দক্ষতা। কোন ভাষার জন্য কতজন শিক্ষক দরকার, কোথা থেকে তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হবে, বেতন-ভাতা ও পেশাগত উন্নয়ন কীভাবে হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা এখনো দেখা যায় না। শিক্ষকদের যথাযথ সম্মানী ও প্রশিক্ষণ না থাকলে এ উদ্যোগ কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা আছে।প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও বিবেচনায় নিতে হবে। শহরের অভিজাত স্কুল হয়তো বাড়তি ফি নিয়ে বিদেশি শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারবে। কিন্তু গ্রামের স্কুলগুলোর কী হবে। যেখানে এখনো পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই, মৌলিক অবকাঠামো নেই, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের সুবিধা সীমিত। এখানে সুযোগের বৈষম্য তৈরি হলে শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভাষাগত ও ডিজিটাল ব্যবধান আরও বাড়বে। ফলে একটি ভালো উদ্যোগ নতুন বৈষম্যের কারণ হয়ে উঠতে পারে।.আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি বাস্তবতা হলো অনেক শিক্ষার্থী এখনো বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মৌলিক দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে আছে। বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে ২০২৩ সালে ৫ থেকে ১৬ বছর বয়সী দেড় হাজারের বেশি শিশুর ওপর এক জরিপ চালানো হয়। ওই জরিপের তথ্য বলছে, বাংলায় গল্প পড়তে পারেনি প্রায় ৬২ শতাংশ ছেলে ও ৫৩ শতাংশ মেয়ে। আর ইংরেজিতে গল্প পড়তে পারেনি প্রায় ৮৫ শতাংশ ছেলে ও প্রায় ৮৩ শতাংশ মেয়ে। অর্থাৎ অনেক শিক্ষার্থী মৌলিক পাঠদক্ষতাই অর্জন করতে পারছে না (প্রথম আলো, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬)।প্রাথমিক স্তরে ভিত্তি দুর্বল থাকলে নতুন আরেকটি ভাষা যুক্ত করা তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। তাই নতুন ভাষা চালুর আগে মাতৃভাষা ও ইংরেজিতে ভিত্তি মজবুত করা কতটা জরুরি, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।সব শিক্ষার্থীর লক্ষ্য এক নয়। কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, কেউ কারিগরি শিক্ষা নেবে, কেউ দেশে কাজ করবে, কেউ বিদেশে যাবে। তাই সবার ওপর একই ভাষা বাধ্যতামূলক করা ঠিক হবে না। শিক্ষার্থীর আগ্রহ, ভবিষ্যৎ পেশা ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কেউ মধ্যপ্রাচ্যে স্বাস্থ্যসেবা বা আতিথেয়তা খাতে কাজ করতে চাইলে তার জন্য আরবি ভাষা কাজে দেবে। কেউ প্রযুক্তি বা শিল্পে কাজ করতে চাইলে জাপানি বা কোরীয় ভাষা সহায়ক হবে। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ছে, তাই ম্যান্ডারিন শেখার আলাদা গুরুত্ব আছে।.ছোট ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর জন্য বড় ভাষা মডেল.তবে শুধু ভাষা জানলেই বিদেশে ভালো চাকরি নিশ্চিত হয় না। এর সঙ্গে কারিগরি দক্ষতা, পেশাগত যোগ্যতা ও কাজের অভিজ্ঞতাও দরকার। তাই ভাষা নির্বাচনকে শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা উচিত।সরকারের এ উদ্যোগ সফল করতে হলে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ভাষানীতি ও কর্মপরিকল্পনা দরকার। প্রথমে শিক্ষক জরিপ ও চাহিদা নিরূপণ করতে হবে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভাষা শিক্ষকের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ও ডিপ্লোমা কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের সহযোগিতা নেওয়ার পাশাপাশি দেশীয় শিক্ষক তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষক–সংকট মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত অনলাইন শিক্ষক, আঞ্চলিক ভাষা শিক্ষাকেন্দ্র ও ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণের সমন্বিত ব্যবহার ভাবা যেতে পারে। তবে প্রযুক্তি কখনোই দক্ষ শিক্ষকের বিকল্প নয়। বাস্তবায়নে ধাপে ধাপে এগোনোই যুক্তিযুক্ত।.ভারতে নতুন ফাঁদে ‘বাংলা ভাষা’, মুক্তির পথ কী?.প্রথমে নির্বাচিত কিছু স্কুলে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালু করে শিক্ষক–সংকট, শিক্ষার্থীদের আগ্রহ, পাঠ্যক্রমের উপযোগিতা ও শেখার অগ্রগতি মূল্যায়ন করা যেতে পারে। এরপর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অন্য স্কুলে সম্প্রসারণ করা উচিত। প্রাথমিক পর্যায়ে ভাষা শেখার পরিবেশ তৈরি করা, মাধ্যমিক পর্যায়ে মৌলিক যোগাযোগ দক্ষতা গড়ে তোলা এবং উচ্চমাধ্যমিক ও কারিগরি পর্যায়ে পেশাভিত্তিক ভাষা শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।তৃতীয় ভাষা শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এটি তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু শুধু ঘোষণা বা পাঠ্যবইয়ে নতুন বিষয় যুক্ত করলেই ভাষা শেখা সম্ভব নয়। ভাষা শিক্ষা দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এর জন্য দরকার দক্ষ শিক্ষক, নিয়মিত অনুশীলন, উপযুক্ত পরিবেশ ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন। সরকারের উচিত শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো, অর্থায়ন ও গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রকাশ করা। ● ড. মো. সাহাবুল হক অধ্যাপক, পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেটমতামত লেখকের নিজস্ব

Source: https://www.prothomalo.com/opinion/column/a0qzj6axru

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ডেসকোর যেই নম্বরের প্রিপেইড মিটার রিচার্জ বন্ধ থাকবে ২৪ ঘণ্টা

১

ভিডিওতে ৮ পিস্তল নিয়ে হুমকি, ‘সময় থাকতে পালিয়ে যাও, আমি তুফান’

২

তৃতীয় ভাষা চালুর আগে প্রস্তুতি কতটুকু

৩

হল্টারনেক স্টেটমেন্ট ব্লাউজে দেওয়ালি লুকে আলিয়া

৪

কোয়ান্টাম জগৎ: মহাবিশ্ব কীসের তৈরি, কণা নাকি তরঙ্গ

৫

ফতুল্লায় শ্রমিক-পুলিশ পাল্টা–পাল্টি ধাওয়া, টিয়ার শেল নিক্ষেপ

৬

নিজের সেঞ্চুরির চেয়ে দলের জয়ই মুখ্য

৭

‘সখী, ভালোবাসা কারে কয়!’

৮

৯ বছর পদোন্নতি বঞ্চিত বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার প্রভাষকেরা, প্রধানন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা

৯

হোমনায় বসতবাড়ির আড়ালে জুয়ার আসরের অভিযোগ !

১০

কালীগঙ্গার পাড়ে কাকের কলতানে সন্ধ্যার ঘণ্টাধ্বনি

১১

বিক্ষোভে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে আশুলিয়ায় তিন শ্রমিক নেতাকে আটক

১২

মিরপুরের হতাশা ভুলে সিলেটে কি ভাগ্য ফিরবে বাংলাদেশের

১৩

পুতিন যে কৌশলে ট্রাম্পকে কাজে লাগিয়েছেন

১৪

৫২তম বিসিএসও কি বিশেষ হতে যাচ্ছে: সংশয় আর কৌতূহল চাকরিপ্রার্থীদের

১৫

গণতন্ত্র ও বাংলাদেশে বিরোধী রাজনীতি

১৬

জ্বালানি তেলের দাম বিশ্ব বাজারে কমলেও দেশে কেন বাড়াতে হল

১৭

ইউরোপের সাতটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে বোমা হামলার হুমকি

১৮

টেস্টে প্রথম ইনিংসে ৪০০ রানের গুরুত্ব

১৯

তারেক-সির সমঝোতা বাস্তবায়নে ঢাকায় চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মন্ত্রী

২০