৬ নভেম্বর ২০২৬, ৭:৩০ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

গরুর দুধ: উপকার কতটা, ঝুঁকিই-বা কোথায়?

গরুর দুধ পুষ্টিকর খাবার হিসেবে পরিচিত। তবে এটি কি সবার জন্য সমান উপকারী? হাড়ের স্বাস্থ্য থেকে ক্যানসারের ঝুঁকি—দুধ পানের উপকারিতা ও সম্ভাব্য ক্ষতি নিয়ে নানা গবেষণা ও বিতর্ক রয়েছে।

, গরুর দুধ একসময় ‘আদর্শ খাবার’ বা ‘সম্পূর্ণ খাবার’ হিসেবে পরিচিত ছিল। কারণ, এতে রয়েছে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন বি১২, রিবোফ্লাভিন, ফসফরাস ও পটাশিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। শিশুদের বৃদ্ধি, হাড়ের স্বাস্থ্য এবং পুষ্টির ঘাটতি পূরণে দীর্ঘদিন ধরে দুধ পানের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে দুধকে সবার জন্য সম্পূর্ণ আদর্শ বা সম্পূর্ণ ক্ষতিকর—কোনোটিই বলা যায় না। এটি নির্ভর করে ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা, জিনগত বৈশিষ্ট্য ও খাদ্যাভ্যাসের ওপর।

কারও ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স বা দুধের প্রোটিনে অ্যালার্জি থাকতে পারে। আবার কারও জন্য দুধ হতে পারে পুষ্টির ভালো উৎস। গবেষণায় দুধ পানের সঙ্গে হাড় ভাঙার ঝুঁকির সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে সুইডেনের একটি বড় গবেষণায় এমন যোগসূত্র পাওয়া গিয়েছিল। তবে এটি কারণ ও ফলাফলের সম্পর্ক প্রমাণ করে না। বিষয়টি বুঝতে দুধের উপকারিতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি—দুই দিকই বিবেচনা করা প্রয়োজন।

, দুধে উচ্চমানের প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান থাকায় একে দীর্ঘদিন ‘সম্পূর্ণ খাবার’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের বৃদ্ধি ও হাড়ের গঠনে দুধের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

, বিভিন্ন গবেষণার পর্যালোচনায় দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারের কিছু সম্ভাব্য উপকারের কথা উঠে এসেছে।
• হাড় ও ক্যালসিয়াম: দুধে থাকা ক্যালসিয়াম ও প্রোটিন হাড়ের গঠন ও স্বাভাবিক রক্ষণাবেক্ষণে সাহায্য করে। তবে বেশি দুধ খেলেই হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমবে, এমন শক্ত প্রমাণ নেই।
• কোলোরেক্টাল ক্যানসার: দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণের সঙ্গে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকি কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিশেষ করে দুধে থাকা ক্যালসিয়াম এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
• হৃদরোগ ও স্ট্রোক: গবেষণায় দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণের সঙ্গে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ার ধারাবাহিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দই ও পনিরের মতো গাঁজন করা দুগ্ধজাত খাবারের ক্ষেত্রে কিছু সম্ভাব্য উপকারও দেখা গেছে।
• টাইপ ২ ডায়াবেটিস: কিছু গবেষণায় দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, বিশেষ করে দইয়ের সঙ্গে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন।
• ওজন নিয়ন্ত্রণ: দুধের প্রোটিন পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। তবে শুধু দুধ পান করলেই ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকবে, এমন নয়।

, দুধ সবার শরীরে একইভাবে সহনীয় নয়। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এটি শারীরিক অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। আবার কিছু রোগের সঙ্গে দুধ পানের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়েও গবেষণা চলছে।
• ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স: দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার অনেক মানুষের শরীরে ল্যাকটেজ এনজাইমের কার্যকারিতা বয়স বাড়ার সঙ্গে কমে যায়। ফলে দুধের ল্যাকটোজ বা প্রাকৃতিক শর্করা হজমে সমস্যা হয়। পেটে গ্যাস, ফাঁপা ভাব, ব্যথা ও ডায়রিয়া দেখা দিতে পারে।
• দুধের প্রোটিনে অ্যালার্জি: বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে গরুর দুধের প্রোটিনে অ্যালার্জি দেখা যায়। এটি ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স থেকে আলাদা একটি সমস্যা।

, দুধ পানের পরিমাণ নির্ধারণে সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। তবে কিছু বিষয় মাথায় রাখা যেতে পারে।
• যাঁদের ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স বা দুধের প্রোটিনে অ্যালার্জি নেই, তাঁরা সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে পরিমিত পরিমাণে দুধ পান করতে পারেন।
• শিশু ও কিশোরদের জন্য দুধ ক্যালসিয়াম, প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ভালো উৎস হতে পারে। তবে বয়স অনুযায়ী পরিমাণ নির্ধারণ করা জরুরি।

, ২০১৪ সালে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী বিএমজেতে সুইডিশ গবেষক কার্ল মিকায়েলসন ও তাঁর দলের একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। এতে দুধ পানের সঙ্গে মৃত্যুহার ও হাড় ভাঙার ঝুঁকির সম্পর্ক পরীক্ষা করা হয়েছিল।
গবেষণায় ৬১ হাজারের বেশি নারী ও ৪৫ হাজারের বেশি পুরুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে তাঁদের খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যগত অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল।
গবেষণায় দেখা যায়:
• যেসব নারী প্রতিদিন তিন গ্লাস বা তার বেশি দুধ পান করতেন, তাঁদের মৃত্যুহার দিনে এক গ্লাসের কম দুধ পান করা নারীদের তুলনায় বেশি ছিল। তাঁদের হাড় ভাঙার, বিশেষ করে হিপ ফ্র্যাকচারের ঝুঁকিও বেশি দেখা যায়।
• পুরুষদের ক্ষেত্রেও বেশি দুধ পানের সঙ্গে মৃত্যুহার বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে হাড় ভাঙার ঝুঁকির সঙ্গে তেমন শক্ত সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
• দুধের বিপরীতে দই ও অন্যান্য গাঁজন করা দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণের সঙ্গে মৃত্যুহার ও হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমার সম্পর্ক দেখা গিয়েছিল।
তবে গবেষকেরা নিজেরাই সতর্ক করে বলেছেন, এটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা। তাই দুধ পানই মৃত্যুহার বা হাড় ভাঙার ঝুঁকি বাড়িয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অন্য খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যগত বিষয়ও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

, সুইডিশ গবেষকেরা দুধ পানের সঙ্গে পাওয়া এই যোগসূত্রের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে ডি-গ্যালাকটোজের কথা উল্লেখ করেছেন।

দুধে থাকা ল্যাকটোজ বা দুধের শর্করা হজমের সময় ভেঙে গ্লুকোজ ও গ্যালাকটোজ তৈরি হয়। এক গ্লাস দুধে থাকা ল্যাকটোজ থেকে প্রায় ৫ গ্রাম গ্যালাকটোজ পাওয়া যেতে পারে।

প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন বেশি মাত্রায় ডি-গ্যালাকটোজ প্রয়োগ করলে শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ বাড়তে পারে। এসব পরিবর্তন প্রাণীর শরীরে বার্ধক্যজনিত কিছু লক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত।

গবেষকদের ধারণা, দুধ থেকে পাওয়া গ্যালাকটোজের সঙ্গে মানুষের শরীরেও এ ধরনের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে প্রাণীর ওপর পাওয়া ফলাফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় না। মানুষের শরীরে দুধের গ্যালাকটোজ একইভাবে বার্ধক্য, হাড় ক্ষয় বা মৃত্যুহার বাড়ায়—এমন প্রমাণ এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

অন্যদিকে, দই ও পনিরের মতো গাঁজন করা দুগ্ধজাত খাবারে ল্যাকটোজের পরিমাণ সাধারণত কম থাকে। গাঁজন প্রক্রিয়ায় ব্যাকটেরিয়া ল্যাকটোজের একটি অংশ ভেঙে ফেলে। এ কারণে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স থাকা অনেক মানুষ দুধের তুলনায় দই বা কিছু ধরনের পনির সহজে হজম করতে পারেন।

, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারের প্রধান শর্করা হলো ল্যাকটোজ। এটি হজম করার জন্য ল্যাকটেজ নামের একটি এনজাইম প্রয়োজন। ক্ষুদ্রান্ত্রের কোষে তৈরি এই এনজাইম ল্যাকটোজকে ভেঙে গ্লুকোজ ও গ্যালাকটোজে পরিণত করে। পরে শরীর এই সরল শর্করা শোষণ করতে পারে।

কিন্তু যাঁদের শরীরে পর্যাপ্ত ল্যাকটেজ তৈরি হয় না, তাঁদের ক্ষেত্রে ল্যাকটোজ পুরোপুরি হজম হয় না। অপাচ্য ল্যাকটোজ বৃহদান্ত্রে পৌঁছালে সেখানকার ব্যাকটেরিয়া তা গাঁজন করে। এর ফলে গ্যাস তৈরি হয় এবং পেট ফাঁপা, ব্যথা ও ডায়রিয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের প্রধান কারণ জিনগত। অনেক মানুষের ক্ষেত্রে শৈশবের পর স্বাভাবিকভাবেই ল্যাকটেজ এনজাইমের উৎপাদন কমে যায়। এটি নিজে কোনো রোগ নয়, বরং মানুষের স্বাভাবিক জৈবিক বৈশিষ্ট্যের একটি ধরন। তবে অন্ত্রের কিছু রোগ বা সংক্রমণের কারণেও সাময়িকভাবে ল্যাকটেজের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।

ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স থাকলেই সব ধরনের দুগ্ধজাত খাবার বাদ দিতে হবে, এমন নয়। ব্যক্তিভেদে সহনীয় পরিমাণ আলাদা হতে পারে। ল্যাকটোজমুক্ত দুধ, দই ও কিছু ধরনের পনির খাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ অন্যান্য খাবার থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি।

লেখক: খাদ্য ও পথ্য বিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র

ছবি: পেকেজেলসডটকম

Source: https://www.haal.fashion/lifestyle/well-being/tua9eyru8j

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চুটকি বাজিয়ে ব্যাটসম্যানকে আউট করানো সেই ক্রিকেটার নিষিদ্ধ, শাস্তি পেল ক্লাবও

১

আওয়ামী লীগ ও সহযোগীদের উসকানিতে পোশাকশিল্পে অস্থিরতা: রিজভী

২

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ধ্বংস হয়ে গেল নাসার সুইফট স্পেস টেলিস্কোপ

৩

ফায়ার সার্ভিস এসেও গাছ থেকে নামাতে পারেনি যুবককে, উঠেছিলেন ডাব চুরি করতে

৪

সৌরজগতে নতুন বামন গ্রহের সন্ধান

৫

জাতীয় চার নেতার নামের জাহাজের নাম বদল

৬

একঝলক (৬ নভেম্বর ২০২৬)

৭

স্কুলের ভর্তি তথ্য: আদমজী ক্যান্টনমেন্ট ও ঢাকা বিএএফ শাহীন কলেজ

৮

রায়েরবাজারে কুরিয়ার সার্ভিসের গাড়িতে বিস্ফোরণ–আগুন, বারবার হামলার অভিযোগ

৯

সামান্তার পদত্যাগ নিয়ে মাহফুজ-জারার প্রতিক্রিয়া

১০

তিন দিন পর সোনার দাম কমল ভরিতে ২,৭৪১ টাকা

১১

বিদ্যালয়ের সামনের দেয়ালে লেখা ‘জয় বাংলা’, ৫ শিক্ষার্থীকে ডেকেছে কর্তৃপক্ষ

১২

নির্বাচনে ভরাডুবির পর হেগসেথ-রুবিওর পদ ছাড়ার গুঞ্জন, হোয়াইট হাউসের নাকচ

১৩

সুইয়ে সুতা, হাতে সংসারের হিসাব

১৪

আড্ডা থেকে নাম, সেই প্রেমতলা বদলে গেছে, আছে শুধু নামের গল্প

১৫

আশাশুনির আশা তামান্নারা

১৬

গরুর দুধ: উপকার কতটা, ঝুঁকিই-বা কোথায়?

১৭

এখনো এক টাকা জরিমানা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, জমা দিতে যেতে হয় ব্যাংকে

১৮

ব্যাংকের দেউলিয়া হওয়া নিয়ে বিতর্ক, পদত্যাগ করলেন প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট

১৯

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের অসহায় মানুষের সহায়তায় ১ লাখ ১ হাজার ডলার অনুদান

২০