নিজস্ব প্রতিবেদক | সংবাদ বিডি
পুরান ঢাকার রাত যত গভীর হয়, ততই ঘনীভূত হয় মাদকের কথিত নেটওয়ার্কের রহস্য। গেন্ডারিয়া থেকে ওয়ারী, সূত্রাপুর হয়ে দয়াগঞ্জ রেলওয়ে এলাকা—একাধিক স্পট ঘিরে স্থানীয়দের অভিযোগ, নেপথ্যে রয়েছে একটি প্রভাবশালী চক্র।
মনিরুজ্জামান মঈন মাদক ব্যবসায়ীদের ‘গডফাদার’ হিসেবে বেশ পরিচিত ?
স্থানীয়দের দাবি, তিন থানা এলাকার মাদক কারবারিদের ওপর মঈনের প্রভাব রয়েছে। দয়াগঞ্জ রেলওয়ে এলাকার একটি কথিত মাদক স্পট পরিচালনার সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। শুধু বড় ভাই নন, পরিবারের আরও চার ভাইয়ের বিরুদ্ধেও মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
রাতের আঁধারে কারা সরবরাহ করে মাদক? কারা নিয়ন্ত্রণ করে মাঠপর্যায়ের কারবার? কোথায় যায় কোটি টাকার লেনদেন? আর এত অভিযোগের পরও নেপথ্যের কারিগররা কি থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই শুরু হয়েছে সংবাদ বিডি টুয়েন্টিফোর ডটকমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য ।
জানা যায়, রাজধানীর গেন্ডারিয়া থানাধীন ধুপখোলা এলাকার এক পরিবারের সকল সদস্য মাদক ব্যবসায়ীদের নেটওয়ার্ক’। পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ অলিগলি। দিনের ব্যস্ততা কমতেই কোথাও নেমে আসে নীরবতা, আবার কোথাও শুরু হয় অন্যরকম আনাগোনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, গেন্ডারিয়া, ওয়ারী, সূত্রাপুর ও দয়াগঞ্জের কয়েকটি এলাকায় সন্ধ্যার পর সক্রিয় হয়ে ওঠে কথিত মাদক নেটওয়ার্ক। আর এর নেপথ্যে একই পরিবারের পাঁচ ভাইয়ের নাম ঘুরে ফিরেই আসছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন পরিবারের বড় ভাই মনিরুজ্জামান মঈন। স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, গেন্ডারিয়া–ওয়ারী–সূত্রাপুর এলাকার খুচরা মাদক বিক্রেতাদের একটি অংশের কাছে মঈন প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত। দয়াগঞ্জ রেলওয়ে এলাকার একটি কথিত মাদক স্পটও তার নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মঈনের পাশাপাশি তার ভাই মান্নান, কাওসার, সাব্বির ও কবিরের নামও স্থানীয়দের অভিযোগে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে মাদক কারবারে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি স্থানীয় সূত্রগুলোর।
ধূপখোলা বাজার সংলগ্ন কথিত ইয়াবা স্পট ?
অনুসন্ধানে গেন্ডারিয়া থানার ধূপখোলা বাজারসংলগ্ন রিয়াজুল জান্নাহ মসজিদ গলির মাঝামাঝি একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের নিচতলায় কথিত ইয়াবা স্পটের তথ্য পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জাবেদ নামের একজন ওই স্পট পরিচালনা করেন। তাকে মঈন সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য বলেও দাবি করছেন তারা। স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য, ওই জায়গায় নিয়মিত মাদক কেনাবেচা চলে এবং প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের টাকা লেনদেন হয়। কেউ কেউ দৈনিক ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার ইয়াবা বিক্রির দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের ।
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, রিয়াজুল জান্নাহ মসজিদ গলির শাহিন নামের একজন ওই এলাকার কথিত জাবেদ এর মাদক স্পটের এলাকা-ভিত্তিক নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখেন।
ক্রেতাদের যাতায়াত, আশপাশের পরিস্থিতি নজরে রাখা এবং কোনো ধরনের ঝুঁকি তৈরি হলে তা সামাল দেওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট কাঠামো কাজ করে—এমন অভিযোগও রয়েছে।
দয়াগঞ্জে রহিমার স্পট নিয়েও অভিযোগ ?
শীর্ষ মাদক সম্রাজ্ঞী রহিমার দয়াগঞ্জ রেলওয়ে এলাকার মাদক স্পট মঈন সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি কথিত মাদক স্পটের নিয়ন্ত্রণ যদি এক ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য একটি গোষ্ঠীর হাতে যায়, তাহলে এর পেছনে কারা রয়েছে এবং কীভাবে তারা কার্যক্রম পরিচালনা করছে?
পাঁচ ভাইয়ের নেটওয়ার্ক কতটা বিস্তৃত?
স্থানীয় সূত্রগুলোর অভিযোগ অনুযায়ী, পাঁচ ভাইকে ঘিরে থাকা কথিত নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি শুধু একটি বা দুটি স্পটে সীমাবদ্ধ নয়।
গেন্ডারিয়া, ওয়ারী, সূত্রাপুর ও দয়াগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সঙ্গে একই ব্যক্তিদের নাম বারবার উঠে আসায় স্থানীয়দের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
তবে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র জানতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত এবং নথিভিত্তি খোঁজ নিয়ে জানা যায় মনিরুজ্জামান মঈন এর রয়েছে একাধিক মাদকের মামলা এছাড়াও তার চার ভাইয়ের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মাদকের মামলা এক কথায় মাদকের ফ্যামিলি বললেই চলে।
সাবেক এমপির পিএস ছিলেন মঈন—স্থানীয়দের দাবি
স্থানীয় সূত্রের দাবি, মঈন সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য মরহুম মিজানুর রহমান খান দিপুর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এই রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে এলাকায় তার প্রভাব তৈরি হয়েছিল বলেও দাবি স্থানীয়দের।
তবে রাজনৈতিক পরিচয় বা সাবেক কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে কাজ করার তথ্যের সঙ্গে মাদক ব্যবসার অভিযোগের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে নেই।
তরুণদের নিয়ে উদ্বেগ ?
এলাকাবাসীর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ কিশোর ও তরুণদের নিয়ে।
তাদের অভিযোগ, কয়েকটি এলাকায় মাদক সহজলভ্য হয়ে পড়ায় স্কুল-কলেজপড়ুয়া তরুণদের একটি অংশ ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। সন্ধ্যার পর সন্তানদের বাইরে বের হওয়া নিয়েও অনেক অভিভাবক উদ্বিগ্ন।
এক স্থানীয় বাসিন্দার ভাষায়, ‘মাদকের কারণে শুধু একজন তরুণ নষ্ট হচ্ছে না, একটি পরিবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।’
পুলিশের নজরদারি কোথায়?
স্থানীয়দের প্রশ্ন—কথিতভাবে যদি প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার মাদক কেনাবেচা হয়, তাহলে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরের বাইরে থাকে কীভাবে?
নাকি অপরাধীরা কৌশল বদলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিচ্ছে?
আর যদি নির্দিষ্ট কোনো স্পট সম্পর্কে তথ্য থাকার পরও ব্যবস্থা না নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তার কারণ কী—এ প্রশ্নের উত্তরও জরুরি।
‘খতিয়ে দেখা হবে’
বিষয়টি নিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের এক যুগ্ম কমিশনারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মাদক ব্যবসায়ীরা কিছুটা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে। গেন্ডারিয়া থানা পুলিশের সহায়তায় বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন বলেও জানান তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে গেন্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।মঈন ও তার চার ভাইয়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সত্য কি না, কথিত মাদক স্পটগুলোর সঙ্গে তাদের আদৌ কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক রয়েছে কি না এবং অভিযোগের পেছনে আরও বড় কোনো নেটওয়ার্ক কাজ করছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগগুলো যদি তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে শুধু খুচরা বিক্রেতা নয়, মাদক সরবরাহের নেপথ্যের নিয়ন্ত্রক, অর্থদাতা ও সহযোগীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।
পুরান ঢাকার অলিগলিতে মাদকের কথিত এই নেটওয়ার্কের শেষ কোথায়—সেই উত্তর এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের অপেক্ষায়।
বিস্তারিত আগামী প্রতিবেদনে……
অনুসন্ধান চলছে …..
মন্তব্য করুন