৩০ আগস্ট ২০২৬, ৮:০০ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

মগডালে উল্লুকের সংসার

ভোরেই বৃষ্টি থেমে গেল। খুব সকালে শুকনা খাবার নিয়ে ঢুকে পড়লাম লাউয়াছড়া বনে। বনের ভেতর তিন ঘণ্টা হাঁটার প্রস্তুতি ছিল। সেভাবেই বড় একটি দল নিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। শুরুতেই একটি উল্লুকের দলের দেখা পেলাম। মা-বাবার সঙ্গে একটি বাচ্চাও ছিল। লম্বা গাছের একদম মগডালে ছিল উল্লুকগুলো। ভালো ছবি পাব না বিধায় এই দলের সঙ্গে খুব বেশি সময় দিলাম না। বনের ট্রেইল ধরে হাঁটতে থাকলাম। বর্ষা মৌসুম হওয়ায় পুরো বন জঙ্গলে ভরা। যতই গহিনে যাচ্ছি, ঝোপঝাড়ও বাড়ছে। স্যাঁতসেঁতে মাটিতে জোঁকের প্রাদুর্ভাব বেশি। দিনটি ছিল এ মাসের ১৩ তারিখ। প্রায় দেড় ঘণ্টা হাঁটার পর একটি পাহাড়ি ঝিরি বা ছড়া পেলাম। পানি অল্প হওয়ায় সে পথেই হাঁটা শুরু করলাম। বনের ট্রেইল ছেড়ে এই পথে হাঁটতে বেশ আরাম লাগছিল। বেশ কয়েক প্রজাতির ব্যাঙ ও প্রজাপতির দেখা পেলাম। তিন-চারটি ধনেশ পাখির ডাক শুনে ভালো লাগল। ফেরার পথে আরও একটি উল্লুক পরিবারের সঙ্গে দেখা হলো। এ দলে বাচ্চাসহ চারটি উল্লুক চোখে পড়ল। খাবার সংগ্রহে বেশ ব্যস্ত ছিল ওরা। আমাদের দেখে তারা মোটেও পাত্তা দিল না। নিজের মনে এক ডাল থেকে আরেক ডালে লাফিয়ে চলে গেল।.সামান্য বিশ্রাম নিয়ে লাউয়াছড়ার আরেক অংশ জানকীছড়ায় ঢুকে পড়লাম। এই বনে ঢোকার মুখেও দুটি উল্লুক দেখলাম। তারপর বৃষ্টি নামায় বনের ভেতর থেকে বের হয়ে আসতে হলো।.লাউয়াছড়া বনে উল্লুকের সংখ্যা কিছুটা বাড়ছে বলে বনকর্মী ও স্থানীয় মানুষ বলছেন। গবেষক বন্ধু তারিক কবিরও একই রকম কথা বললেন। এ বনে ১৫-২০টি উল্লুকের দল বনের বিভিন্ন এলাকায় বাস করে। আর সংখ্যায় ৭০-৮০ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। প্রতি দলে ৩-৪টি করে উল্লুক আছে। লাউয়াছড়া বনটি উল্লুকের জন্য বেশ সহায়ক। তবে এই বনে পর্যটকের সংখ্যা অনেক। উল্লুকের দেখা পেলেই অনেকে তাদের বিরক্ত করে।প্রায় চার ঘণ্টা বনের ভেতর তিনটি উল্লুকের দলের দেখা পেলাম। একসঙ্গে এতগুলো উল্লুকের দল লাউয়াছড়ায় আগে কখনো দেখিনি। এরপর রেস্টহাউসে ফিরে এলাম দুপুরের খাবারের জন্য। সামান্য বিশ্রাম নিয়ে লাউয়াছড়ার আরেক অংশ জানকীছড়ায় ঢুকে পড়লাম। এই বনে ঢোকার মুখেও দুটি উল্লুক দেখলাম। তারপর বৃষ্টি নামায় বনের ভেতর থেকে বের হয়ে আসতে হলো।.লাউয়াছড়ায় উল্লুক কিছুটা বাড়লেও অন্যান্য বনে এদের অবস্থা বেশ খারাপ। এখনো অবৈধভাবে উল্লুক শিকারের খবর পাওয়া যায়, যা নিয়ন্ত্রণ করাও খুব জরুরি। এবারের উল্লুক দেখার কাজটি করতে গিয়েছিলাম মূলত বাংলাদেশের প্রাণীর লাল তালিকা হালনাগাদের অংশ হিসেবে।.সিলেট বিভাগের প্রায় প্রতিটি বনেই উল্লুকের বসবাস। সাতছড়িতে ১০-১২টির বেশি উল্লুক আছে। তবে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় রাজকান্দি এলাকার করমা বিটে। এখানে প্রায় ৩৬টি দলে প্রায় ১০০টি উল্লুক আছে বলে ধারণা করা হয়।আদমপুর বনেও ১০-১২ দলে প্রায় ৪০টি উল্লুক আছে বলে শুনেছি। ১৪ আগস্ট গেলাম আদমপুর বনে। প্রায় এক ঘণ্টা হাঁটার পর একটি চমৎকার ছড়ার দেখা পেলাম। এই ছড়ায় এসেছি মূলত একটি মাছরাঙা দেখতে। পাখিটির দেখা না পেয়ে ফেরার পথে উল্লুকের ডাক শুনে সেদিকে এগোলাম। দেখাও পেলাম। সেখানেও ৫টি উল্লুকের দেখা পেলাম। আমাদের দেখে হরেক রকমের অঙ্গভঙ্গি করল।আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএনের লাল তালিকা অনুযায়ী, বাংলাদেশে উল্লুক মহাবিপন্ন প্রাণী। উল্লুক গবেষক তারিক কবিরের সম্প্রতি এক গবেষণাপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, সারা দেশের ৪৬টি বনভূমিতে ২৫৪টি দলে প্রায় ৮১৬টি উল্লুক আছে। সত্তরের দশকে এই সংখ্যা প্রায় তিন হাজার ছিল বলে ধারণা করা হয়। তবে ২০০০ সালে ও তার কাছাকাছি সময়ে বেশ কয়েকজন গবেষক বলেছেন, উল্লুকের সংখ্যা ২৮০–এর কাছাকাছি। বিভিন্ন সময় ভিন্ন পদ্ধতিতে এবং বিক্ষিপ্তভাবে জরিপ হওয়ায় এসব সংখ্যার তুলনা করা কঠিন।.উল্লুকেরা সাধারণত মাটিতে নেমে চলাফেরা করে না। সিলেটের কিছু বনে যদি ক্যানোপি সেতু তৈরি করা যায়, তাহলে উল্লুকসহ অন্যান্য প্রাণীর চলাচলে বেশ সুবিধা হবে।.লাউয়াছড়ায় উল্লুক কিছুটা বাড়লেও অন্যান্য বনে এদের অবস্থা বেশ খারাপ। এখনো অবৈধভাবে উল্লুক শিকারের খবর পাওয়া যায়, যা নিয়ন্ত্রণ করাও খুব জরুরি। এবারের উল্লুক দেখার কাজটি করতে গিয়েছিলাম মূলত বাংলাদেশের প্রাণীর লাল তালিকা হালনাগাদের অংশ হিসেবে।উল্লুকের জন্য প্রয়োজন বড় বড় ফলদ গাছ। প্রাকৃতিক বনে এ রকম গাছের সংখ্যা কমছে। এ ছাড়া বনের ভেতর রেললাইন আর রাস্তার সংখ্যাও বাড়ছে। ফলে এক বন থেকে অন্য বনে যাওয়ার জন্য প্রাণীগুলোর কোনো কোনো পথ বন্ধ হয়ে গেছে। উল্লুকেরা সাধারণত মাটিতে নেমে চলাফেরা করে না। সিলেটের কিছু বনে যদি ক্যানোপি সেতু তৈরি করা যায়, তাহলে উল্লুকসহ অন্যান্য প্রাণীর চলাচলে বেশ সুবিধা হবে।

Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/environment/mkitacs5gy

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাজবাড়ীতে পুলিশের সামনে নারী ব্যবসায়ীকে লাঞ্ছিতের অভিযোগ, ভিডিও ছড়াল ফেসবুকে

মাগুরায় শিশুধর্ষণ–হত্যায় বোনের শ্বশুর হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল

লাউয়াছড়ার রামবাসক

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িংয়ের আরও উড়োজাহাজ কিনবে বাংলাদেশ

সর্পকন্যা আর সাধুর বউয়ের ইমেজ ভেঙে টিল শাড়ির ইভনিং লুকে আবেদন ছড়ালেন সুন্দরী অভিনেত্রী

র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পেলেন বাংলাদেশের রুনা খান

সকালেই পড়ুন আলোচিত ৫ খবর

যেভাবে মাপা হলো পৃথিবীর বয়স

৪০ বছর পুরোনো চরিত্রে ফিরছেন টম ক্রুজ, সঙ্গী কে

জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার দাবি ইরানের

১০

বড় মাথার যন্ত্রণায় ছটফট করে শিশুটি

১১

নেপাল–তিব্বতে নিহত বেড়ে ৭৯৭, আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি কমেনি

১২

লারাক দ্বীপে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি ইরানের

১৩

মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের প্রথম বৈঠক সোমবার

১৪

ফেসবুকে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস, নিরাপত্তা চেয়ে ঢাবি শিক্ষক শেহরীনের জিডি

১৫

মশা নিধনে ব্যবহৃত ওষুধের কার্যকারিতা বাড়াতে গবেষণা জোরদার করা হচ্ছে: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী

১৬

‘বাড়িতে গিয়ে দেখি উঠানে স্বামীর লাশ, বুকে দুটি গুলি’

১৭

ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে ১১–দলীয় ঐক্যের প্রার্থী দেলাওয়ার

১৮

চট্টগ্রামে দক্ষিণ জেলা যুবলীগের ব্যানারে মিছিলের প্রস্তুতি, ১৫ জন গ্রেপ্তার, ৮ কিশোর হেফাজতে

১৯

ওয়ালটন-প্রথম আলো বিশ্বকাপ ফুটবল কুইজের পুরস্কার বিতরণ

২০