বিশেষ অনুসন্ধান | সংবাদ বিডি
কুমিল্লা প্রতিনিধি
একসময় ছিল নিজের মুদি দোকান। সেই দোকানের আয়েই চলত সংসার, ছিল স্বাভাবিক জীবনে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন। কিন্তু আজ সেই দোকান নেই, নেই আর্থিক স্বস্তিও। মাথার ওপর প্রায় ১০ লাখ টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে চরম সংকটে দিন কাটছে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুর এলাকার বাসিন্দা ওসমান মিয়ার। অভিযোগ, জুয়ার আসরে অর্থ হারাতে হারাতে একপর্যায়ে তাঁর মুদি দোকানটিও হারিয়ে যায়।
ওসমান মিয়ার আর্থিক বিপর্যয়ের পেছনে জুয়ার আসরে অর্থ হারানোর বিষয়টি সামনে এসেছে। জানা গেছে, আর্থিক ক্ষতি সামাল দিতে তিনি বিভিন্ন এনজিও থেকে প্রায় ৪ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। বাকি অর্থ ধার করেছেন আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে। সব মিলিয়ে তাঁর ঋণের পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ টাকা বলে জানা গেছে।
একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর এমন পরিণতি শুধু ব্যক্তিগত আর্থিক সংকটের চিত্র নয়; এটি জুয়ার সম্ভাব্য সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করে। আর সেই সূত্র ধরেই অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কুমিল্লার হোমনা উপজেলার বাহেরখোলা এলাকার কবরস্থান রোডের শেষ প্রান্তে দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত ‘আন্দার বাহার’ নামের জুয়ার আসরের তথ্য।
কবরস্থান রোডের পাশে জুয়ার আসর, পরিচালনায় নসু সিন্ডিকেট!
কুমিল্লার হোমনা উপজেলার বাহেরখোলা এলাকার কবরস্থান রোডের শেষ প্রান্তে কয়েকটি ঘরে দীর্ঘদিন ধরে ‘আন্দার বাহার’ নামে জুয়ার আসর পরিচালিত হয়ে আসছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, জুয়ার আসরটি পরিচালনার করে আসছে নসু ও তাঁর সহযোগীরা ।
কবরস্থানের পাশের এই স্থানটিতে বছরের পর বছর ধরে জুয়ার কার্যক্রম চলার বিষয়টি স্থানীয়ভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
একদিকে জুয়ার আসর পরিচালনার তথ্য, অন্যদিকে ওসমান মিয়ার মতো ব্যক্তির আর্থিক বিপর্যয়ের ঘটনা—দুটি বিষয়ই জুয়ার সামাজিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
জুয়ার আসরে বিষয়ে প্রতিবাদ করলে ভয়ভীতি ও হামলা?
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জুয়ার আসরের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে নসু সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য দ্বারা বিভিন্ন ভয়ভীতি ও হামলার মুখে পড়তে হয়। এ কারণে অনেকেই প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না এবং প্রতিবেদককে প্রকাশ্যে নিজেদের বক্তব্য দিতে অনাগ্রহী স্থানীয় বাসিন্দাদারা ।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, বক্তব্য পাওয়া যায়নি ওসির !
বাহেরখোলায় দীর্ঘদিন ধরে জুয়ার আসর পরিচালিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় পুলিশের টহল থাকলেও কথিত জুয়ার আসরের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান দেখা যায়নি।
কেউ কেউ দাবি করেছেন, অভিযান পরিচালনার আগেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সতর্ক হয়ে যান।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে হোমনা থানার অফিসার ইনচার্জের (ওসি) সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
মানবাধিকার সংস্থার দাবি: অভিযোগের পর সেনাবাহিনীর অভিযান
হিউম্যান রাইটস হেলথ ফাউন্ডেশনের আইনজীবী শাহীন আলম জানান, হোমনার জুয়ার আসর সম্পর্কে কয়েক মাস আগে তাঁদের সংস্থার কাছে তথ্য আসে। বিষয়টি যাচাইয়ের পর স্থানীয় থানাকে একাধিকবার অবহিত করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
শাহীন আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় থানায় যোগাযোগের পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাঁদের মনে হওয়ায় তাঁরা সেনাবাহিনীর কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। এরপর সেনাবাহিনী অভিযান পরিচালনা করে বলে জানান তিনি।
তাঁর দাবি, অভিযানের পর কিছুদিন জুয়ার কার্যক্রম বন্ধ ছিল বলে মনে হয়েছিল। তবে সম্প্রতি আবারও বাহেরখোলায় জুয়ার আসর পরিচালিত হওয়ার তথ্য পেয়েছেন তাঁরা।
শাহীন আলম বলেন, এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। তাঁর মতে, অভিযোগের যথাযথ তদন্ত, দায়ীদের শনাক্তকরণ এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
নসুর সঙ্গে ফোনালাপ, প্রতিবেদককে চায়ের দাওয়াত?
জুয়ার আসর পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে নসুর বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন প্রতিবেদক। এ সময় তিনি প্রতিবেদককে চায়ের দাওয়াত দেন।
ফোনালাপে নসু বলেন, “ভাই, থানা পুলিশ সবাইকে তো দেই। আপনি আসেন, চায়ের দাওয়াত রইল। আপনার বিষয়টিও দেখাবো।”
এসকল বিষয়ে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন-:
বাংলাদেশে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী জুয়া-সংক্রান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট স্থানে কী ধরনের কার্যক্রম চলছে, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং কার কী ভূমিকা—এসব বিষয় প্রমাণ ও তদন্তের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা জরুরি।
বাহেরখোলার কবরস্থান রোডে দীর্ঘদিন ধরে জুয়ার আসর পরিচালিত হওয়ার তথ্য এবং এর সঙ্গে নসু ও তাঁর সহযোগীদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে আসায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ কি নিবে ?
এখন প্রশ্ন, জুয়ার আসরটির অর্থের উৎস ও লেনদেন কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে? এর সঙ্গে আর কারা জড়িত? পূর্ববর্তী অভিযানের পরও যদি কার্যক্রম চালু থাকে, তাহলে তা বন্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
শুধু একজন ওসমান মিয়ার ঋণের বোঝা মানুষের আর্থিক বিপর্যয়ের গল্প নয়; এটি জুয়ার সামাজিক ক্ষতি ও জবাবদিহি নিয়ে ওঠা গুরুতর প্রশ্নেরও প্রতিচ্ছবি। হোমনা উপজেলার বাহেরখোলার ‘আন্দার বাহার’ জুয়ার আসর পরিচালনার সঙ্গে জড়িতদের ভূমিকা, স্থানীয়দের অভিযোগ এবং প্রশাসনের কার্যক্রম—সবকিছুরই প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত।
জুয়ার আসর বন্ধ হবে, নাকি অভিযোগ আর আশঙ্কার মধ্যেই চলতে থাকবে—উত্তর এখন প্রশাসনের পদক্ষেপে।
মন্তব্য করুন