রক্তে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা মেপে কি সবার ক্ষেত্রে সবসময় নিশ্চিতভাবে বলা যায়, একজন মানুষ নারী না পুরুষ? প্রশ্নটি শুনতে সহজ মনে হলেও এর উত্তর এতটা সরল নয়। এর সঙ্গে প্রয়োজন আরও কিছু আনুষঙ্গিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
, সাধারণভাবে পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা নারীর তুলনায় বেশি। তবে মানুষের শরীর একটি নির্দিষ্ট ছকে চলে না। ব্যক্তিভেদে হরমোনের মাত্রায় স্বাভাবিক পার্থক্য থাকতে পারে। নারী ও পুরুষের টেস্টোস্টেরনের মাত্রার মধ্যেও কিছুটা ওভারল্যাপ বা মিল থাকতে পারে। বয়স, শারীরিক অবস্থা, ওষুধ ও হরমোন ব্যবহারের মতো নানা কারণেও এই মাত্রা পরিবর্তিত হতে পারে। তাই কারও লিঙ্গ নিয়ে প্রশ্ন বা অভিযোগ উঠলে শুধু টেস্টোস্টেরনের একটি পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কতটা বৈজ্ঞানিকভাবে যুক্তিসংগত—সেটিই এখন আলোচনার বিষয়।
কী ঘটেছে বাংলাদেশের দুই অ্যাথলেটের ক্ষেত্রে?
সাম্প্রতিক এক সংবাদে জানা গেছে, বাংলাদেশের ১৯ বছর বয়সী স্প্রিন্টার কবিতা এবং ২৮ বছর বয়সী থ্রোয়ার জান্নাতকে বিভিন্ন সময়ে ওঠা অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তের পর বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের কমিটি পুরুষ হিসেবে বিবেচনা করেছে। তাঁদের সব পদক বাতিলের পাশাপাশি আজীবন নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হয়েছে।
এর আগে লিঙ্গসংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তা চেয়েছিল অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ড গঠন করে। গত ১১ মে বোর্ডের কার্যক্রম শেষ হয়। ১৬ মে মেডিকেল বোর্ড তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন ফেডারেশনের কাছে জমা দেয়।
, নারীর শরীরে টেস্টোস্টেরন কতটা থাকে?
টেস্টোস্টেরন শুধু পুরুষের হরমোন নয়। নারীর শরীরেও স্বাভাবিকভাবেই এই হরমোন তৈরি হয়। সাধারণত নারীর শরীরে এর পরিমাণ পুরুষের তুলনায় অনেক কম।
প্রাপ্তবয়স্ক নারীর রক্তে মোট টেস্টোস্টেরনের মাত্রা অনেক ক্ষেত্রে প্রায় ০ দশমিক ৫২ থেকে ২ দশমিক ৪৩ ন্যানোমোল/ লিটারের মধ্যে থাকতে পারে। তবে এটিকে সবার জন্য একই ‘স্বাভাবিক’ মাত্রা হিসেবে ধরা যায় না। কোন পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হচ্ছে, কী পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা হচ্ছে, বয়স ও শারীরিক অবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ফলাফল নির্ভর করতে পারে। অর্থাৎ, কারও টেস্টোস্টেরনের মাত্রা এই পরিসরের বাইরে গেলেই তিনি ‘পুরুষ’—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সঠিক নয়।
, খেলাধুলায় কেন টেস্টোস্টেরন এত গুরুত্বপূর্ণ?
আন্তর্জাতিক খেলাধুলায় নারী বিভাগে প্রতিযোগিতার যোগ্যতা নিয়ে আলোচনায় টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বহু বছর ধরেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর একটি কারণ হলো, বয়ঃসন্ধির পর টেস্টোস্টেরন পেশি, হাড়, লোহিত রক্তকণিকা ও শারীরিক শক্তি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গড়ে পুরুষদের শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা নারীদের তুলনায় অনেক বেশি। বয়ঃসন্ধির পর দীর্ঘ সময় উচ্চ টেস্টোস্টেরনের প্রভাবে শরীরে যে পরিবর্তনগুলো ঘটে, সেগুলোর কিছু ক্রীড়া পারফরম্যান্সে সুবিধা দিতে পারে—বিশেষ করে শক্তি, গতি ও পেশিশক্তিনির্ভর খেলায়।
, তাহলে বিষয়টি এত বিতর্কিত কেন?
ক্রীড়াক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরন-ভিত্তিক যোগ্যতার নিয়ম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের যুক্তি হলো, শুধু একটি হরমোনের মাত্রা দিয়ে একজন অ্যাথলেটের শরীরের জটিল জৈবিক বৈশিষ্ট্য বা সম্ভাব্য ক্রীড়া-সুবিধা পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। মানুষের শরীরে হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকভাবেই ব্যক্তি ও পরিস্থিতিভেদে পরিবর্তিত হয়। অন্যদিকে, নীতিমালার সমর্থকদের যুক্তি হলো, নারী বিভাগের প্রতিযোগিতায় ন্যায্যতা বজায় রাখতে বয়ঃসন্ধির পর টেস্টোস্টেরনের প্রভাব বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। এই বিতর্কের কারণেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থা সময়ের সঙ্গে তাদের নীতিমালায় পরিবর্তন এনেছে। কোন খেলায় কী ধরনের নিয়ম প্রযোজ্য হবে, সেটিও সব ক্ষেত্রে এক নয়।
টেস্টোস্টেরন পরীক্ষা আসলে কী বলে?
সহজ করে বললে, টেস্টোস্টেরন পরীক্ষা বলে দেয় রক্তে এই হরমোনের মাত্রা কত। শুধুমাত্র এই একটি টেস্ট বলে দিতে পারে না একজন মানুষ নারী না পুরুষ। কারও জৈবিক বৈশিষ্ট্য মূল্যায়নের বিষয়টি অনেক বেশি জটিল। প্রয়োজনে চিকিৎসকেরা শারীরিক বৈশিষ্ট্য, চিকিৎসার ইতিহাস, হরমোন, ক্রোমোজোম এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য বিবেচনা করতে পারেন। তাই একটি রক্ত পরীক্ষার ফল দিয়ে কোনো ব্যক্তির জৈবিক লিঙ্গ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এবং সেই সিদ্ধান্তকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সর্বজনীন সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।
Source: https://www.haal.fashion/lifestyle/x2eu439zz2
মন্তব্য করুন