ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন (১)
নিজস্ব প্রতিবেদক | বিশেষ অনুসন্ধান
রাত তখন গভীর। রাজধানীর মিরপুর বেড়িবাঁধে একের পর এক মিনিট্রাক, ড্রামট্রাক ও কাভার্ডভ্যান ঢুকছে শহরে। কোথাও নির্মাণসামগ্রী, কোথাও কাঁচামাল, কোথাও আবার বাজারের পণ্য। কিন্তু মালামালের পাশাপাশি আরেকটি জিনিসও যেন বাধ্যতামূলকভাবে বহন করতে হয় চালকদের—“মাসিক চাঁদা”।
আর এই চাঁদাবাজির অদৃশ্য সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি নাম—সালাউদ্দিন।
অভিযোগ উঠেছে, বাংলাদেশ আন্তঃজেলা ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও মিনিট্রাক চালক শ্রমিক ইউনিয়নের মিরপুর বালুঘাট শাখার সভাপতির পদকে ব্যবহার করে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তুলেছেন ভয়ংকর এক চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট। স্থানীয়দের ভাষায়—“বেড়িবাঁধে ট্রাক চলবে, আর সালাউদ্দিনের লাইন থাকবে না—এটা কল্পনাও করা যায় না।”
“মাসিক চাঁদা দিলেই মিলছে মামলা মুক্তির ‘সবুজ সংকেত’!”
সংবাদ বিডি অনুসন্ধানী ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্বে বেড় হয়ে এসেছে ভয়ঙ্কর সব তথ্য। অভিযোগ রয়েছে, মিরপুর বেড়িবাঁধ, বালুঘাট, গাবতলী, আমিনবাজার ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ রুটে চলাচলকারী হাজার হাজার মিনিট্রাক, ড্রামট্রাক ও কাভার্ডভ্যানকে একটি অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে, প্রতিটি গাড়িকে মাসিক ভিত্তিতে ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। গাড়ির আকার, রুট, মালামাল ও চলাচলের সময় অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয় টাকার অঙ্ক।
চালকদের ভাষায়,
> “এটা কোনো শ্রমিক সংগঠন না, এটা এখন চাঁদাবাজির কর অফিস।”
একজন মিনিট্রাক মালিক ক্ষোভ নিয়ে বলেন—
> “গাড়ির ফিটনেস ঠিক, কাগজ ঠিক, লাইসেন্স ঠিক—সব ঠিক থাকার পরও যদি মাসিক না দেই, তাহলে রাস্তায় নামলেই মামলা।”
>ট্রাফিক আইনের ওপর ‘অদৃশ্য চাঁদাবাজি< !
অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীর ট্রাফিক বিভাগের কিছু অসাধু সদস্যকে “ম্যানেজ” করেই পুরো সিন্ডিকেট পরিচালনা করা হয়। আর এই ‘ম্যানেজ’ শব্দটিই এখন চালকদের কাছে আতঙ্কের নাম।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সালাউদ্দিনের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সদস্য বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে গাড়ির তালিকা তৈরি করে। কোন গাড়ি “লাইন” দিয়েছে আর কোনটি দেয়নি—সেটির আলাদা রেজিস্টার পর্যন্ত রয়েছে।
যেসব গাড়ি নিয়মিত মাসিক চাঁদা দেয়, সেগুলো ট্রাফিক আইন অমান্য করলেও অনেক সময় পার পেয়ে যায় বলে অভিযোগ। আর যারা চাঁদা দিতে রাজি নয়, তাদের জন্য অপেক্ষা করে মামলা, গাড়ি আটক, কাগজ জব্দ কিংবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা হয়রানি।
একজন কাভার্ডভ্যান চালক বলেন—
> “মনে হয় রাস্তায় পুলিশ না, সালাউদ্দিনের লোকজনই আইন চালায়।”
গভীর রাত বাড়লেই সালাউদ্দিন সিন্ডিকেটের শুরু হয় “অপারেশন মাসিক”
স্থানীয়দের দাবি, রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়িবাঁধ এলাকায় সক্রিয় হয়ে ওঠে সিন্ডিকেটের সদস্যরা। বিভিন্ন মোড়ে দাঁড়িয়ে গাড়ির নম্বর মিলিয়ে দেখা হয়—কারা মাসিক চাঁদার আওতায়ভুক্ত, আর কারা নেই, সেই সকল গাড়ি কতিপয় কিছু অসাধু ট্রাফিক পুলিশ সদস্য দ্বারা অপরাধ না করলেও মামলা দায়ের করেন।
একাধিক সূত্র জানায়, কোনো গাড়ি “লাইন” ছাড়া চললে তাৎক্ষণিকভাবে ফোন যায় সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক পয়েন্টে। এরপর শুরু হয় ওই গাড়ি রাস্তায় বেড় হলেই মামলা।
কখনো কাগজপত্রে খুঁত ধরা, কখনো অকারণে মামলা, আবার কখনো গাড়ি সাইডে রেখে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা—এভাবেই চাপ সৃষ্টি করা হয়।
একজন চালক বলেন—
“টাকা দিলে ভাই, সব ঠিক। আর টাকা না দিলে আপনি অপরাধী—এটাই এখন নিয়ম।” প্রতি মাসে কোটি টাকার চাঁদাবাজি!
পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন কয়েক হাজার পণ্যবাহী গাড়ি এই রুট ব্যবহার করে। যদি প্রতিটি গাড়ি থেকে মাসিক চাঁদা আদায় করা হয়, তাহলে সালাউদ্দিনের পুরো সিন্ডিকেটের মাসিক লেনদেন দাঁড়ায় কোটি টাকায়।
প্রশ্ন উঠেছে—এই বিপুল পরিমাণ টাকা কোথায় যায়? কারা রয়েছে এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যে? আর কোন শক্তির কারণে এত বড় চাঁদাবাজি প্রকাশ্যে চললেও প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো অভিযান দেখা যায় না?
শ্রমিক সংগঠনের আড়ালে ভয়ংকর সিন্ডিকেট?
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, শ্রমিক সংগঠনের নাম ব্যবহার করে এক ধরনের সমান্তরাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। যেখানে শ্রমিকদের অধিকার নয়, বরং চাঁদাবাজিই প্রধান ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।
একজন পরিবহন ব্যবসায়ী বলেন—
> “এখন সংগঠনের পদ মানেই প্রভাব, আর সেই প্রভাব ব্যবহার করেই চলছে ভয়ংকর বাণিজ্য।”
সালাউদ্দিন আতঙ্কে মুখ খুলতে চান না কেউ ?
অনেক চালক ও মালিক অভিযোগ করলেও প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি নন। কারণ, প্রতিবাদ করলেই শুরু হয় চাপ, হুমকি ও রাস্তায় চলাচলে বাধা।
একজন ড্রামট্রাক চালক কাঁপা কণ্ঠে বলেন—
“আমরা তো রাস্তায় রুটি-রুজির জন্য নামি। কিন্তু এখন মনে হয়, আগে চাঁদা দাও, তারপর জীবিকা চালাও।”
>প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন< ?
এলাকাবাসীর প্রশ্ন—রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বছরের পর বছর ধরে এমন প্রকাশ্য চাঁদাবাজি কীভাবে চলে? কার ছত্রচ্ছায়ায় এত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এই সিন্ডিকেট? কেন এখনো নেওয়া হয়নি কার্যকর ব্যবস্থা?
সচেতন মহলের দাবি, বিষয়টি দ্রুত দুদক, গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে তদন্ত করা হোক। একই সঙ্গে শ্রমিক সংগঠনের আড়ালে গড়ে ওঠা চাঁদাবাজি নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে জরুরি অভিযান পরিচালনারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
কারণ, এখন মিরপুর বেড়িবাঁধে শুধু গাড়ি চলে না—চলে চাঁদাবাজির অদৃশ্য সাম্রাজ্যও।
এবিষয়ে মুঠো ফোনে সালাউদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততা বলে মুঠো ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন ।
বিস্তারিত জানতে চোখ রাখুন আগামী প্রতিবেদনে …..…….
আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া যে কোনো তথ্য আমাদের জানাতে পারেন”
ই-মেইল: info@sangbadbd24.com
মুঠোফোন: +880 1955 62 5353
মন্তব্য করুন